বিসর্জনের বিষাদেই শিয়াখালার জাগ্রত উত্তরবাহিনী বিশালাক্ষ্মীর আরাধনা
শুভজিৎ দত্ত
পুজো শেষ। চারদিকে বিসর্জনের বিষাদ। খালি মণ্ডপ, নিঃশব্দ দুর্গাদালান—সবকিছুর মধ্যেই যেন এক অদ্ভুত শূন্যতা বিরাজ করছে। ঢাকের বাদ্যি থেমেছে, নহবতের সানাইয়ে আর আগমনী সুর বাজছে না। উমা কৈলাসেও ফিরে গিয়েছেন। পড়ে রয়েছে তাঁর আগমনের স্মৃতি, আর বুকের ভিতর আগামী বছরের অপেক্ষা।
কিন্তু এই বিষাদের দিনেও বাংলার মাটিতে এমন কিছু পীঠস্থান রয়েছে, যেখানে মায়ের আরাধনা নতুন করে প্রাণ পায়। শিয়াখালার উত্তরবাহিনী বিশালাক্ষ্মী দেবীর মন্দির তেমনই এক পবিত্র স্থান। বিজয়া দশমীর পরের দিন, আশ্বিন মাসের শুক্লা একাদশীতে, এখানে পালিত হয় দেবীর ঐতিহ্যবাহী ‘জাত উৎসব’।
মন্দিরের পশ্চিমমুখী প্রবেশপথ দিয়ে ভিতরে ঢুকলে সামনে বিশাল নাটমন্দির, তার পিছনে উত্তরমুখী মায়ের মন্দির। স্থাপত্যে চোখধাঁধানো কারুকার্য না থাকলেও গোটা প্রাঙ্গণজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে প্রাচীনত্বের এক গভীর আবহ। মনে হয়, কত শতাব্দীর বিশ্বাস, কত মানুষের প্রার্থনা আর কত অজানা ইতিহাস এই মন্দিরের দেওয়াল ও প্রাঙ্গণ নীরবে বয়ে চলেছে!
মন্দিরের পুরোহিত দীপেন চৌধুরীর সঙ্গে আলাপচারিতায় উঠে এল মন্দিরের সুপ্রাচীন ইতিহাস, দেবীর প্রতিষ্ঠা এবং তাঁকে ঘিরে প্রচলিত নানা লোককথা।
শিয়াখালার প্রাচীন নাম ছিল ‘শিবক্ষেত্র’—এমনটাই প্রচলিত। হুগলি জেলার এই জনপদে অধিষ্ঠিত উত্তরবাহিনী বিশালাক্ষ্মী কেবল একটি দেবীমূর্তি নন, তিনি বহু মানুষের বিশ্বাস, আবেগ ও পারিবারিক ঐতিহ্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা এক লৌকিক দেবী। বাংলার গ্রামাঞ্চলে এমন বহু দেবী রয়েছেন, যাঁদের মাহাত্ম্য শাস্ত্রের পাতার পাশাপাশি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা লোককথায় বেঁচে রয়েছে।শিয়াখালার উত্তরবাহিনীও তেমনই এক ব্যতিক্রমী দেবী। তাঁর নামের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে পাণ্ডিত্য অর্জনের কাহিনি, নদীর গতিপথ পরিবর্তনের কিংবদন্তি এবং কয়েক শতাব্দী ধরে চলে আসা পূজার পরম্পরা।

কিভাবে_প্রতিষ্ঠিত_হলেন_উত্তরবাহিনী_মা?
সময়টা আজ থেকে আনুমানিক পাঁচশো বছর আগের। তখন শিয়াখালা ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চল ছিল অনেকটাই অরণ্যবেষ্টিত। এই অঞ্চলের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হত কৌশিকী নদী। আজ সেই নদীর পুরোনো প্রবাহ আর আগের মতো দৃশ্যমান নয়; তার স্মৃতি রয়ে গিয়েছে স্থানীয় জনশ্রুতি ও কিছু জলাশয়ের মধ্যে।
প্রচলিত ঐতিহাসিক বিবরণ অনুসারে, বাংলার সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের আমলে গোপীনাথ বসু, যিনি পুরন্দর খাঁ নামেও পরিচিত, এই অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত হন। কথিত আছে, শিয়াখালার বিস্তীর্ণ এলাকা তাঁর অধীনে আসে এবং পরবর্তী সময়ে এই জনপদে বসতি ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বিকাশ ঘটে। উত্তরবাহিনী দেবীর মন্দিরের প্রাচীনত্বের সঙ্গে এই ইতিহাসের যোগসূত্র রয়েছে বলে স্থানীয়ভাবে মনে করা হয়।তবে দেবীর প্রতিষ্ঠা নিয়ে আরও একটি বহুল প্রচলিত কাহিনি রয়েছে, যা বিশেষভাবে মানুষের মনে জায়গা করে নিয়েছে।
কথিত আছে, পণ্ডিত কৃষ্ণানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায় তর্কপঞ্চাননের বংশধর রাজেন্দ্রনাথ পড়াশোনায় তেমন মনোযোগী ছিলেন না। বিদ্যাচর্চায় অনাগ্রহের কারণে তাঁকে প্রায়ই পিতার কাছে তিরস্কৃত হতে হত। একদিন পিতার নির্দেশে তাঁর পাতের ভাতের পরিবর্তে ছাই দেওয়া হয়। অপমানিত রাজেন্দ্রনাথ অভিমানে কৌশিকী নদীতে আত্মবিসর্জন দিতে ঝাঁপ দেন।
কিন্তু ভাগ্যে অন্য কিছু লেখা ছিল। নদীর জলে ডুব দিতে গিয়ে তাঁর হাতে ঠেকে একটি পাথর। সেই সময় তিনি দৈববাণী শুনতে পান—
দেবী তাঁকে নির্দেশ দেন, নদীগর্ভ থেকে তাঁকে তুলে এনে প্রতিষ্ঠা করতে। বিনিময়ে তাঁর দুঃখ দূর হবে, বিদ্যা-বুদ্ধি ও পাণ্ডিত্য লাভ হবে এবং অভাবও ঘুচবে।
রাজেন্দ্রনাথ সেই পাথর তুলে এনে নদীর তীরেই দেবীকে প্রতিষ্ঠা করেন। আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় গাছের ডালপালা ও পাতা দিয়ে ছোট্ট একটি কুটির তৈরি করে সেখানেই দেবীর পূজা শুরু করেন। চিনির বাতাসা কেনার সামর্থ্যটুকুও ছিল না তাঁর; জঙ্গলের ফলমূল আর বেলপাতা দিয়েই চলত দেবীর সেবা। সেই ফলমূল খেয়ে দিন কাটাতেন তিনি।ক্রমে গ্রামবাসীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে দেবীর মাহাত্ম্যের কথা। মানুষের সহযোগিতায় সেখানে গড়ে ওঠে আটচালা চণ্ডীমণ্ডপ। লোকবিশ্বাস অনুসারে, দেবীর কৃপায় রাজেন্দ্রনাথ পরবর্তীকালে অসাধারণ পাণ্ডিত্য অর্জন করেন এবং ‘পণ্ডিত সার্বভৌম’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।

দেবী_কেন_উত্তরবাহিনী?
মন্দিরে এসে আমার মনে যে প্রশ্নটি বারবার জেগেছিল, তা হল—দেবী উত্তরবাহিনী কেন? তাঁর নামের মধ্যেই তো রয়েছে এক বিশেষ পরিচয়।
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে সামনে আসে একাধিক লোককথা। বিভিন্ন বিবরণে কাহিনির চরিত্র ও ঘটনাপ্রবাহে কিছু পার্থক্য থাকলেও, সব কাহিনির কেন্দ্রে রয়েছে কৌশিকী নদী এবং দেবীর উত্তরমুখী হয়ে যাওয়ার অলৌকিক ঘটনা।
লোককথা অনুসারে, এক দাম্ভিক ও অত্যাচারী জমিদার এক ব্রাহ্মণ যুবককে তাঁর টোল খোলার জন্য সাহায্য করতে অস্বীকার করেন এবং অপমান করে তাড়িয়ে দেন। সেই যুবকই পরে কৌশিকী নদীতে আত্মহত্যা করতে গিয়ে দেবীর সন্ধান পান।
আরও একটি প্রচলিত কাহিনিতে রয়েছে, একদিন সেই জমিদার তাঁর বজরায় নাচ-গান করতে করতে কৌশিকী নদী দিয়ে যাচ্ছিলেন। দেবী বালিকার বেশে তাঁকে নৌকা থামিয়ে গান শোনাতে বলেন। কিন্তু অহংকারী জমিদার তাঁর কথায় কর্ণপাত না করে এগিয়ে যান। তখন দেবী ক্রুদ্ধ হয়ে মুখ ঘুরিয়ে উত্তরদিকে তাকান। সঙ্গে সঙ্গে নদীর স্রোত উত্তরমুখী হয়ে যায় এবং জমিদারের বজরা ডুবে যায় বলে জনশ্রুতি।
আবার স্থানীয়ভাবে প্রচলিত অন্য একটি কাহিনিতে এক মাঝির কথা শোনা যায়। নদীতে নৌকা বাইতে বাইতে মাঝির গান শুনে দেবী মুগ্ধ হন এবং তাঁকে আবার গান গাইতে বলেন। মাঝির উত্তর—“সাধ থাকে তো ফিরে চা।” লোককথা অনুসারে, দেবী তখন উত্তরদিকে মুখ ফেরান।
কাহিনিগুলির মধ্যে পার্থক্য থাকলেও তাদের মূল সুর এক—দেবীর উত্তরমুখী রূপকে ঘিরে মানুষের কল্পনা, বিশ্বাস ও ভক্তি বহু শতাব্দী ধরে প্রবাহিত হয়েছে। ইতিহাসের প্রামাণ্য তথ্যের বাইরে এই লোককথাগুলিও শিয়াখালার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

এক_বিরল_দেবীমূর্তি
উত্তরবাহিনী বিশালাক্ষ্মী দেবীর বিগ্রহের বৈশিষ্ট্য তাঁকে বাংলার অন্যান্য দেবীমূর্তি থেকে স্বতন্ত্র পরিচয় দিয়েছে। স্থানীয় বিবরণ ও প্রকাশিত লেখায় জানা যায়, বর্তমান প্রস্তরনির্মিত মূর্তিটি কাশীর শিল্পীদের দ্বারা নির্মিত হয়েছিল এবং ১৩৪০ বঙ্গাব্দের ১৬ আষাঢ় মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত হয়। সেই প্রতিষ্ঠাদিবস স্মরণে প্রতিবছর আষাঢ় মাসের ১৬ তারিখে বিশেষ উৎসব পালিত হয়।
প্রায় সাত ফুট উচ্চতার এই দ্বিভুজা, ত্রিনয়নী দেবীর রূপ অত্যন্ত বলিষ্ঠ ও ব্যতিক্রমী। মাথায় মুকুট, গলায় মুণ্ডমালা ও নানা অলংকার, পরনে ঐতিহ্যবাহী শাড়ি। ডান হাতে খড়্গ, বাম হাতে রুধিরপাত্র। দেবীর একটি পা শায়িত মহাকালরূপী শিবের বুকে, অন্য পা বটুক ভৈরবের মস্তকে স্থাপিত।এই রূপে রয়েছে শক্তির প্রকাশ, রয়েছে দেবীর উগ্রতা ও মহিমা। আবার ভক্তের চোখে তিনি একই সঙ্গে জাগ্রত জননী, যাঁর কাছে মানুষ দুঃখ, অভাব ও মনের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে ছুটে আসে।
কথিত আছে, প্রথমদিকে নদী থেকে পাওয়া ছোট্ট পাথরখণ্ডটিকেই দেবীরূপে পূজা করা হত। পরবর্তী সময়ে মাটির মূর্তি নির্মিত হয় এবং বিভিন্ন পর্যায়ে তার পরিবর্তন ঘটে। বর্তমান প্রস্তরমূর্তিটি সেই দীর্ঘ পূজার ইতিহাসেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে দেবীর মূর্তির রূপ ও উপকরণে পরিবর্তন এলেও তাঁর স্বতন্ত্র পরিচয় অক্ষুণ্ণ রয়েছে। শিয়াখালার এই দেবীকে ঘিরে যে বিশ্বাস ও ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে, তা কেবল একটি মন্দিরের ইতিহাস নয়, বাংলার লৌকিক ধর্মসংস্কৃতিরও এক মূল্যবান নিদর্শন।

জাত_উৎসব_ঐতিহ্যের_ধারাবাহিকতা
উত্তরবাহিনী মন্দিরের প্রধান উৎসবগুলির মধ্যে আশ্বিন মাসের শুক্লা একাদশীর জাত উৎসব বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। দুর্গাপুজোর বিজয়ার পরের দিন এই উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। যখন বাংলার অধিকাংশ মণ্ডপে বিসর্জনের বিষাদ, তখন শিয়াখালায় দেবীর নতুন ঘট প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করে শুরু হয় অন্য এক উৎসবের আবহ।
‘জাত’ কথাটি এখানে দেবীর জন্ম বা আবির্ভাবের স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত বলে স্থানীয়ভাবে ব্যাখ্যা করা হয়। প্রাচীন রীতি অনুসারে, এই দিনে পুরোনো ঘট বিসর্জন দিয়ে নতুন ঘট স্থাপন করা হয়। প্রচলিত পরম্পরা অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠাতা বংশের উত্তরপুরুষদের মধ্য থেকেই নির্দিষ্ট সদস্য এই ঘট পরিবর্তনের আচার সম্পন্ন করেন।
প্রায় চারশো বছরেরও বেশি সময় ধরে এই রীতি চলে আসছে বলে স্থানীয় বিশ্বাস। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে একটি পরিবার ও সমগ্র জনপদ যে নিষ্ঠার সঙ্গে এই ঐতিহ্য বহন করে চলেছে, তা সত্যিই বিস্ময়কর।
এ ছাড়াও বৈশাখ মাসে দেশমালা উৎসব এবং আষাঢ় মাসের ১৬ তারিখে বর্তমান প্রস্তরমূর্তির প্রতিষ্ঠা উৎসব পালিত হয়। মূল পূজার বিশেষ দিনগুলি ছাড়াও সারা বছরই মন্দিরে দেবীর আরাধনা চলে। জাত উৎসবের দিন মন্দির চত্বরকে কেন্দ্র করে বসে মেলা; অতীতে রামযাত্রা, পালাগান ও যাত্রাপালারও আয়োজন হত বলে জানা যায়।
আজও দূরদূরান্ত থেকে ভক্ত ও দর্শনার্থীরা এই বিশেষ দিনে মায়ের দর্শন করতে আসেন। তাঁদের কাছে এটি কেবল পূজা নয়, বহুদিনের পারিবারিক ও সামাজিক বিশ্বাসের সঙ্গে পুনরায় যুক্ত হওয়ার এক উপলক্ষ।
মন্দিরের বর্তমান পরিচালনা ও সমাজসেবামূলক কাজের সঙ্গেও এই জনসম্পৃক্ততার যোগ রয়েছে। বিনামূল্যে চিকিৎসা, বস্ত্র বিতরণ এবং ভক্তদের মধ্যে ভোগপ্রসাদ বিতরণের মতো উদ্যোগ মন্দিরকে কেবল ধর্মীয় স্থান হিসেবে নয়, স্থানীয় সমাজজীবনের অংশ হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করেছে।
বিষাদের_দিনে_অন্য_এক_অনুভূতি
মায়ের দর্শন সেরে যখন মন্দির চত্বর থেকে যখন বেরিয়ে আসছিলাম, তখন বিকেলের পরিবেশে অন্যরকম এক মায়া ছড়িয়ে পড়েছে। বিশাল নাটমন্দিরের ভিতর পায়রার বকমবকম ডাক, কোথাও টিয়াপাখির কিচিরমিচির—সব মিলিয়ে যেন শহুরে কোলাহল থেকে বহু দূরের এক শান্ত, নিবিড় জগৎ।
বাইরে তখনও বিসর্জনের বিষাদ। চারপাশে মায়ের বিদায়ের মনখারাপ। অথচ এখানে এসে মনে হল, মা যেন অন্য এক রূপে, অন্য এক আবহে আজও বিরাজমান। তাঁর কাছে ভক্তের আসা-যাওয়া আছে, উৎসবের দিন আছে, আবার রয়েছে প্রতিদিনের নীরব আরাধনা।
ইতিহাসের পাতা থেকে লোককথা, নদীগর্ভ থেকে দেবীর আবির্ভাবের বিশ্বাস, পাণ্ডিত্য অর্জনের অলৌকিক কাহিনি থেকে আজকের জাত উৎসব—সবকিছু মিলিয়ে শিয়াখালার উত্তরবাহিনী বিশালাক্ষ্মী এক অনন্য ঐতিহ্যের ধারক। এখানে এসে বোঝা যায়, বাংলার গ্রামাঞ্চলে দেবদেবীর আরাধনা কেবল ধর্মীয় আচার নয়; তা মানুষের জীবন, স্মৃতি, সংস্কৃতি ও আবেগের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে।
