রাবড়ির কড়াইতেই জ্বাল হয় জীবনের সুখ দুঃখ; গাংপুরের ইতিকথা

লেখা ও ছবি: শুভজিৎ দত্ত

বাঙালির সঙ্গে মিষ্টির সম্পর্ক বহু প্রাচীন। জন্মদিন, বিয়েবাড়ি, পুজো-পার্বণ কিংবা অতিথি আপ্যায়ন—মিষ্টি ছাড়া যেন বাঙালির কোনও আনন্দ-অনুষ্ঠানই সম্পূর্ণ হয় না। আর উৎসবের মরশুমে তো কথাই নেই! মিষ্টির দোকানগুলোতে উপচে পড়ে ভিড়। দোকানের কাচের শোকেসে সাজানো রকমারি মিষ্টির দিকে তাকালে আমরা তার রং, রূপ আর স্বাদেই মুগ্ধ হই। কিন্তু সেই মিষ্টি তৈরির পিছনে যে মানুষগুলোর ঘাম, শ্রম আর নিরলস প্রচেষ্টা জড়িয়ে থাকে, তাঁদের জীবনকথা আমাদের অনেকেরই অজানা থেকে যায়। বাংলার মিষ্টির ইতিহাসের সন্ধান করলে হুগলি জেলার নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়। গুপ্তিপাড়ার গুপো সন্দেশ, জনাইয়ের মনোহরা কিংবা নিখুঁতি—হুগলির মিষ্টি-ঐতিহ্য যথেষ্ট সমৃদ্ধ। এই জেলারই আরও দুটি গ্রামের নাম উঠে আসে একটি বিশেষ মিষ্টির প্রসঙ্গে—আইয়া ও গাংপুর। এই অঞ্চলের রাবড়ি বহুদিন ধরেই মিষ্টিপ্রেমীদের কাছে পরিচিত।

পৌঁছে গিয়েছিলাম রাবড়ি গ্রাম হিসেবেই খ্যাত আইয়ার পাশের গাংপুর গ্রামে। পথের সন্ধান করতে গিয়ে মূল রাস্তার ধারে পরিচয় হয় গ্রামেরই কলেজপড়ুয়া রিক্তা বালতির সঙ্গে। তাঁর পথনির্দেশ অনুসরণ করে ধানখেতের বুক চিরে গ্রামের ভিতরে ঢুকতেই চোখে পড়ল এক অন্য জগৎ। আশপাশের প্রায় কুড়ি-তিরিশটি বাড়িতে তখন চলছে রাবড়ি তৈরির কর্মযজ্ঞ। কোথাও বড় কড়াইয়ে দুধ জ্বাল দেওয়া হচ্ছে, কোথাও কড়াইয়ের গায়ে জমে ওঠা সর তুলে নেওয়া হচ্ছে, আবার কোথাও চলছে তৈরি রাবড়ির সরের স্তর কাটার কাজ। মনে হলো, গোটা গ্রামটাই যেন এক একটি মিষ্টির কারখানা। তবে এই কারখানায় নেই কোনও বড়সড় যন্ত্রপাতি, নেই ঝাঁ চকচকে পরিকাঠামো। রয়েছে বড় বড় কড়াই, উনুন, কিছু চিরাচরিত সরঞ্জাম আর মানুষের অভিজ্ঞ হাত। কয়েকজন গ্রামবাসীর সঙ্গে কথা বলে শুধু রাবড়ি তৈরির পদ্ধতিই নয়, এই এলাকার মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সঙ্গেও কিছুটা পরিচিত হওয়ার সুযোগ পেলাম। তাঁদের কর্মব্যস্ততার ছবিটা কাছ থেকে দেখার চেষ্টা করলাম।

শুরুর কথা

রাবড়ি তৈরির মূল উপাদান দুধ। তাই প্রতিদিনের কর্মযজ্ঞ শুরু হয় দুধ সংগ্রহের মধ্য দিয়ে। সকালবেলা গোয়ালাদের কাছ থেকে আসে টাটকা দুধ। দোকানের অর্ডার ও চাহিদা অনুযায়ী কোনও কোনও বাড়িতে প্রতিদিন প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ লিটার দুধ আসে। এরপর সেই দুধ নির্দিষ্ট মাপে বালতিতে ভাগ করে রাখা হয়। সাধারণত প্রতিটি বালতিতে থাকে সাত লিটার করে দুধ। পরিমাপ করা দুধ ঢেলে দেওয়া হয় বড় বড় কড়াইয়ে। কোথাও গ্যাসের উনুন, আবার কোথাও এখনও দেখা মেলে চিরাচরিত মাটির উনুনের। শুরু হয় দুধ জ্বাল দেওয়ার পালা। সাত লিটার দুধ দীর্ঘক্ষণ ধরে জ্বাল দিতে দিতে নামিয়ে আনা হয় প্রায় দুই লিটারে। দুধের জলীয় অংশ বাষ্প হয়ে উড়ে যায়, আর অবশিষ্ট দুধ ক্রমশ ঘন হয়ে ওঠে। এই পর্যায়ে কারিগরদের বিশেষ সতর্ক থাকতে হয়। দুধ যাতে কড়াইয়ের তলায় লেগে না যায়, সেদিকে রাখতে হয় কড়া নজর। আগুনের তাপ নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে দুধের ঘনত্ব বোঝা—সবটাই নির্ভর করে তাঁদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার উপর। বাইরে থেকে দেখলে কাজটি খুব সাধারণ মনে হলেও এর পিছনে রয়েছে বহু বছরের অনুশীলন।

সরের স্তরেই লুকিয়ে রাবড়ির আসল সৌন্দর্য

রাবড়ি তৈরির সবচেয়ে আকর্ষণীয় এবং গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় সর সংগ্রহের কাজটি। দুধ জ্বাল দেওয়ার সময় তার উপরে ক্রমশ সরের আস্তরণ জমতে শুরু করে। সর জমলে হাতপাখার বাতাসে তাকে ঠান্ডা হতে সাহায্য করা হয়। তারপর একটি সরু কাঠির সাহায্যে অত্যন্ত দক্ষ হাতে কড়াইয়ের গা ঘেঁষে সেই সর তুলে রাখা হয়। একবার নয়, বারবার একই প্রক্রিয়া চলতে থাকে। দুধ জ্বাল দেওয়া হয়, সর জমে, আবার সেই সর তুলে রাখা হয়। এভাবেই স্তরে স্তরে জমতে থাকে রাবড়ির মূল উপাদান।

কাজটি দেখতে যতটা সহজ, বাস্তবে ততটাই দক্ষতার প্রয়োজন। সরের স্তর যাতে ভেঙে না যায়, আবার কড়াই থেকে ঠিকভাবে উঠে আসে, তার জন্য প্রয়োজন অভিজ্ঞ হাত ও যথেষ্ট ধৈর্য। প্রতিটি স্তর যত্ন করে তুলে রাখার মধ্যে রয়েছে এক ধরনের নিপুণতা, যা কোনও যন্ত্রের সাহায্যে তৈরি করা সম্ভব নয়।

সরের স্তর তুলে নেওয়ার পর কড়াইয়ে যে ঘন দুধ অবশিষ্ট থাকে, তাতে মেশানো হয় চিনি। আর শীতকালে নলেন গুড়ের মরশুমে দুধ কিছুটা ঠান্ডা হলে তাতে মেশানো হয় ঝোলা নলেন গুড়। এভাবেই তৈরি হয় চিনির রাবড়ি এবং নলেন গুড়ের রাবড়ির মূল মিশ্রণ। এরপর শুরু হয় গ্রামের মহিলাদের নিপুণ হাতের কাজ। আগে থেকে তুলে রাখা সরের স্তরগুলো ছুরি দিয়ে নির্দিষ্ট মাপে কেটে নেওয়া হয়। তারপর সেই সরের টুকরোগুলো অবশিষ্ট ঘন দুধের মধ্যে যত্ন করে সাজিয়ে ভিজিয়ে রাখা হয়। কড়াইয়ের মধ্যে সরের প্রতিটি টুকরোকে সুন্দরভাবে সাজিয়ে দেওয়ার কাজটি সত্যিই দেখার মতো। তাঁদের হাতের দ্রুততা ও দক্ষতা দেখে মনে হয়, এ যেন এক ধরনের শিল্পকর্ম। সবশেষে রাবড়িকে ঠান্ডা হতে দেওয়া হয়। সরের স্তরগুলো যাতে ঘন দুধের মধ্যে সুন্দরভাবে থাকে এবং রাবড়ির স্বাদ ও গঠন বজায় থাকে, সেদিকে বিশেষ নজর রাখা হয়। তারপর দোকানের অর্ডার অনুযায়ী শুরু হয় প্যাকেজিংয়ের কাজ।

রাত পেরিয়ে ভোর—চলতে থাকে রাবড়ির কর্মযজ্ঞ

রাবড়ি তৈরি হয়ে গেলেই কিন্তু কারিগরদের কাজ শেষ হয় না। বরং শুরু হয় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব। কোনও দোকানের আট কেজি, কোনও দোকানের দশ কেজি—অর্ডার অনুযায়ী নির্দিষ্ট পরিমাণ রাবড়ি ভরা হয় ক্যান কিংবা জারে। একটি বাড়িতে সারাদিনে তৈরি হতে পারে পনেরো, কুড়ি, এমনকী ত্রিশ কড়াই রাবড়ি। ফলে প্যাকেজিংয়ের কাজও চলে অনেক রাত পর্যন্ত। তারপর ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই বাড়ির কোনও পুরুষ সদস্য রাবড়ির ক্যান নিয়ে রওনা দেন কলকাতা কিংবা অন্যান্য নির্দিষ্ট গন্তব্যের উদ্দেশে। দোকানে দোকানে পৌঁছে দেন আগের দিনের তৈরি রাবড়ি। সেই রাবড়ি পৌঁছে দিতে দিতে কখনও সকাল, কখনও বেলা গড়িয়ে যায়। কিন্তু ততক্ষণে বাড়িতে আবার শুরু হয়ে গেছে পরের দিনের রাবড়ি তৈরির প্রস্তুতি। দুধ আসছে, কড়াই বসছে, উনুনে আগুন জ্বলছে। অর্থাৎ একটি দিনের কাজ শেষ হওয়ার আগেই শুরু হয়ে যাচ্ছে আরেকটি দিনের কর্মযজ্ঞ।

মিষ্টির আড়ালে একদল পরিশ্রমী মানুষের জীবন

গাংপুরের বাড়িগুলো ঘুরে রাবড়ি তৈরির পুরো প্রক্রিয়াটি দেখার পর একটা বিষয় বিশেষভাবে উপলব্ধি করলাম—এই কাজের সঙ্গে শুধু পুরুষেরাই যুক্ত নন, গ্রামের মহিলাদের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুধ জ্বাল দেওয়া থেকে সর তোলা, সর কাটা থেকে রাবড়ি সাজানো—প্রতিটি ধাপেই রয়েছে তাঁদের দক্ষ হাতের ছাপ। একটি বাড়িতে প্রতিদিন ১০০ থেকে ১৫০ লিটার দুধ সামলানো, সারাদিন ধরে একের পর এক কড়াইয়ে রাবড়ি তৈরি, রাত পর্যন্ত প্যাকেজিং এবং ভোরবেলা সেই রাবড়ি পৌঁছে দেওয়া—সব মিলিয়ে তাঁদের জীবন যেন এক নিরন্তর কর্মপ্রবাহ। এই কাজের কোনও নির্দিষ্ট ছুটির দিন নেই। উৎসবের মরশুমে চাহিদা বাড়লে কাজের চাপও বাড়ে। অথচ এই নিরলস পরিশ্রমের আড়ালে থাকা মানুষগুলোর কথা আমরা কতটুকুই বা জানি!

আমরা যখন কোনও মিষ্টির দোকানে দাঁড়িয়ে এক বাটি ঠান্ডা রাবড়ি হাতে তুলে নিই, তখন হয়তো তার স্বাদ আর মিষ্টত্বেই ডুবে থাকি। কিন্তু সেই এক বাটি রাবড়ির পিছনে কত মানুষের ঘাম, কত রাতজাগা পরিশ্রম, কতটা নিপুণতা আর কতখানি জীবন জড়িয়ে আছে, তার খবর আমাদের অনেকেরই অজানা থেকে যায়। একবার ভাবুন তো, যে মানুষটি সারারাত কড়াইয়ের পাশে দাঁড়িয়ে দুধ জ্বাল দিলেন, যে মহিলা ধৈর্য ধরে সরের স্তর কেটে রাবড়ি সাজালেন, কিংবা যে মানুষটি ভোরের আলো ফোটার আগেই ক্যানভর্তি রাবড়ি নিয়ে শহরের উদ্দেশে রওনা দিলেন—তাঁদের প্রত্যেকের শ্রমের ফলেই আমাদের মিষ্টিমুখের আয়োজন সম্পূর্ণ হয়।

ঐতিহ্য বাঁচুক, বাঁচুক কারিগরদের জীবনও

একটি গ্রামের পরিচিতি, একটি অঞ্চলের ঐতিহ্য এবং বহু মানুষের জীবিকা—সবকিছু মিলিয়েই গড়ে উঠেছে হুগলির এই রাবড়ি তৈরির জগৎ। এর মধ্যে রয়েছে পারিবারিক অভিজ্ঞতা, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে চলা কারিগরি দক্ষতা এবং জীবিকার তাগিদে প্রতিদিনের নিরলস লড়াই। আমাদের বাংলার এমন কত ছোট ছোট গ্রাম, কত অচেনা জনপদ নিজেদের বিশেষ কোনও শিল্প, খাদ্যসংস্কৃতি কিংবা কারিগরি ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরে আজও বেঁচে রয়েছে। অথচ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর জীবন ও সংগ্রাম অনেক সময় আড়ালেই থেকে যায়।

সেদিন গাংপুরের ধানখেত পেরিয়ে বাড়ি ফেরার পথে বারবার মনে হচ্ছিল, মিষ্টি শুধু চিনি, দুধ কিংবা গুড় দিয়ে তৈরি হয় না। তার সঙ্গে মিশে থাকে মানুষের ধৈর্য, শ্রম, অভিজ্ঞতা আর জীবনের অসংখ্য না-বলা গল্প।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

12 − seven =