সম্পাদকীয়

শিয়ালদহ স্টেশনের শৌচাগার থেকে বেরোতে গিয়েই বাধা পেলেন অমূল্যবাবু। দু টাকা দিতে হবে। তিনি নিত্যযাত্রী সারাজীবন রেলের শৌচাগার ব্যবহার করেছেন কিন্তু ছোট কাজের জন্য কখনও টাকা দিতে হয়নি। বড় কাজের জন্য কিছু টাকা দিতে হত বটে। এখন থেকে শিয়ালদহ স্টেশনে শৌচাগারে প্রবেশ করলেই টাকা দিতে হবে। শুধু শিয়ালদহ নয়, প্রায় সব স্টেশনেই এখন সামান্য প্রস্বাবের জন্যও টাকা নেওয়া হয়, যেটা এতদিন বিনা মূল্যেই ছিল। রেল থেকে সেটা স্পষ্ট করে লিখেও দেওয়া হত শৌচাগারের বাইরে। কিন্তু এখন তা আর হচ্ছে না। অমূল্যবাবুর মত অনেকেই অভিযোগ করেছেন, এত দিন যে পরিষেবা তারা পেয়ে আসছিলেন, তা হঠাৎ এমন করে বন্ধ করে দিল রেল। এর আগেও এমন সমস্যা কিছু কিছু ক্ষেত্রে হয়েছে। কিন্তু সেটা যারা ওই শৌচাগারের দায়িত্ব নেয় সেই বেসরকারি ঠিকাদার সংস্থা বেআইনি ভাবেই ছোট বাইরেতে গেলেও টাকা নিয়েছে কখনও কখনও। রেলের আধিকারিকদের কাছে অভিযোগ জানালে তারা কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে পদক্ষেপ করেছেন। সাময়িক বন্ধও হয়েছে সেই টাকা নেওয়া। কিন্তু এখন রেল দুহাত তুলে দিয়েছে। তাই আপনাকে রেলের শৌচাগার ব্যবহার করতে গেলে গ্যাটের কড়ি খরচ করতেই হবে। খুব স্বাভাবিক ভাবেই এতে ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষ। অনেকেই বলতে পারেন মাত্র দুটাকা, সেটা দিলেই তো হয়, পরিস্কার করবার জন্য তো টাকা লাগে। কিন্তু তাদের জ্ঞাতার্থে জানাই শৌচাগার পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্ব রেলের, সে জন্য তারা আমাদের কাছ থেকে দাম নেয়, যে টিকিট আমরা কাটি তার একটা অংশ প্ল্যাটফর্মের পরিচ্ছন্নতা এবং সাধারণ পরিষেবার জন্যও থাকে। সর্বোপরি রেলের এই শৌচাগার ব্যবহার করেন প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ। তাদের কাছ থেকে মাত্র দুটাকা করে নিলেও রেলের কত রোজগার হয় তা সহজেই অনুমেয়। সাধারণ মানুষের জিজ্ঞাসা এত দিন ধরে তাহলে কিভাবে পরিষেবা দিচ্ছিল রেল? এতটাই আর্থিক ক্ষতি যে এই সামান্য কারণে সামান্যটুকু টাকাও নিতে হবে সাধারণ মানুষের কাছ থেকেই?
শুধু শৌচাগারকেই দামী করা হয়েছে তাইই নয়। রেলের রিটায়ারিং রুমের যে পরিষেবা ছিল সেটাও গোটাটাই বেসরকারি করে দামী করে দেওয়া হয়েছে। আগে সঙ্গে টিকিট থাকলে দূরপাল্লার যাত্রীদের সেই টিকিটের নিরিখে বা কোন ক্লাসে যাত্রা করছেন তার নিরিখে যাত্রীদের জন্য বিশ্রাম নেওয়ার ব্যবস্থা থাকত। সঙ্গে টিকিট থাকলে সেটা দেখিয়েই বসা যেত এই রিটায়ারিং রুমে। কিন্তু এখন বড়, মেজো বা সেজো কোনও স্টেশনেই শুধু টিকিট দেখিয়ে রিটায়ারিং রুমে বসা যায় না। বিশেষ করে উচ্চ শ্রেণী বা এসির যাত্রীদের জন্য সব রিটায়ারিং রুম বেসরকারি করে দেওয়া হয়েছে। যেখানে বৈধ রেল টিকিট থাকা স্বত্বেও ঘন্টা পিছু টাকা দিয়ে আপনাকে বসতে হবে। অর্থাৎ যে পরিষেবা এত দিন সাধারণ মানুষ পেয়ে এসেছেন বিনামূল্যে, সেটাই এখন অর্থের বিনিময়ে কিনতে হচ্ছে। বহু মানুষ মুখ বুজে দিয়েও দিচ্ছেন, চোখ তুলে প্রশ্নও করছেন না, কেন এতদিনের এই পরিষেবা হঠাৎ দামী করে দেওয়া হল। তাই তো মানুষের নিস্পৃহতা দেখে বেপরোয়া রেলও।
ক্রমশ দামী হচ্ছে রেলের ছোটখাটো পরিষেবা। বিজেপি কেন্দ্রে ক্ষমতায় এসেই দাম বাড়িয়েছিল প্ল্যাটফর্ম টিকিটের। কোনও কোনও জায়গাতে ভিড় এড়ানোর অজুহাত দেখিয়ে প্ল্যাটফর্ম টিকিট পঞ্চাশ টাকা করা হয়েছে। অর্থাৎ যেনতেন প্রকারেণ সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্থ আদায় মূল লক্ষ্য। রেলের এই সব ছোটখাটো পরিষেবা দামী হলেও, রেল চলাচলের মান ক্রমশ তালানীতে ঠেকছে। বন্দেভারতের প্রতি নজর রেল কর্তৃপক্ষের, তাই সেই ট্রেনগুলি ছাড়া অন্য ট্রেনের অবস্থা এখন ছাগলের তৃতীয় সন্তানের মত। বিশেষ করে দক্ষিন পূর্ব রেলের অবস্থা তো সাংঘাতিক। শহরতলীর লোকাল ট্রেনই হোক বা দূরপাল্লার এক্সপ্রেস, কারোর সময়ের কোনও ঠিক ঠিকানা নেই। একের পর এক বন্দেভারত চালু হচ্ছে, অপরদিকে দীর্ঘদিন ধরে চলা ট্রেনগুলি এখন ধুঁকছে। লেগেই আছে একের পর এক দুর্ঘটনাও। সম্প্রতি সংসদীয় কমিটি বিভিন ট্রেনের নিয়মানুবর্তিতা, গতি, পরিষেবা ইত্যাদি নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করায় আটটি ট্রেনের সুপার ফাস্ট তকমা কমিয়ে সাধারণ এক্সপ্রেসকরে দেওয়া হয়েছে। এদের মধ্যে কালকা মেল, দুন এক্সপ্রেসের মত নামকরা এবং দীর্ঘদিন ধরা চলা ট্রেনও আছে। সব মিলিয়ে রেল যখন তার প্রধান পরিষেবা যাত্রী পরিবহণে রীতিমত হিমসিম খাচ্ছে, ঠিক তখনই তারা একের পর এক অন্য পরিষেবা দামী করে দিচ্ছে সাধারণ মানুষের জন্য। একেই তো বলে আচ্ছে দিনের আচ্ছে সরকার।
পলাশ মুখোপাধ্যায়
প্রধান সম্পাদক, অবেক্ষণ
