ইশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর

বটু কৃষ্ণ হালদার, কলকাতা ##

উনিশ শতকের বাংলা তথা ভারত বর্ষের নব জাগরণের অন্যতম পথিকৃত ছিলেন বিদ্যাসাগর মহাশয়। বাংলা থেকে কুসংস্কারাছন্ন সমাজ ব্যবস্থার মুক্তি ঘটাতে তার অবদান আমাদের আজও ভুলে যাবার নয়। এই বাংলার মাটিতে শেষ পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থেকে যদি কেউ কখনো কোনো সফল আন্দোলন বা বিপ্লব করে থাকেন তবে তার নাম অবশ্যই ইশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর। তিনি জন্ম গ্রহণ করেন অবিভক্ত বাংলার মেদিনীপুর জেলার বীরসিংহ নামক গ্রামে। পিতা ঠাকুর দাস বন্দ্যোপাধ্যায়, মাতা ভগবতী দেবী ছিলেন অত্যন্ত মহীয়সী ও দয়ালু মহিলা। অপরের দুঃখে নিজে কুল ভাসাতেন, মায়ের এই অপার গুণটি তার মধ্যে পরিলক্ষিত হয়, তাই তো তিনি দয়ার সাগর নামে পরিচিত সবার কাছে। পিতা ঠাকুর দাস বন্দ্যোপাধ্যায় অত্যন্ত দারিদ্রের মধ্যে জীবন শুরু করেন। গ্রামের চরকায় সুতো কেটে দিন অতিবাহিত করতেন। মাত্র চোদ্দ বছর বয়েসে কলকাতায় আসেন জীবিকার উদ্দেশ্যে। শেখেন ইংরেজি, শুরু করেন দুই টাকা মাইনের চাকরি দিয়ে। তেইশ বছর বয়েসে যখন তার বিয়ের বয়স সে সময়ে বেড়ে হয়েছিল ছয় টাকা। ছোট বেলায় বিদ্যাসাগর এর শখের খেলা ছিল কাপাটি (কাবাডি) আর লাঠি খেলা। স্বাস্থ্য তেমন ভালো না থাকলে ও তিনি ছিলেন ভিষণ জেদি আর একগুয়ে। তবে ছিলেন অসাধারণ গুণের অধিকারী ও মেধাবী। তাঁর এই বিশেষ গুণের জন্য সে সময়ে তিনি বৃত্তি লাভ করতেন। তখন সমাজ ব্যবস্থা ছিল কুসংস্কারে আচ্ছন্ন। বাল্য বিবাহ, সতীদাহ প্রথা, গঙ্গা সাগরে সন্তান বিসর্জন, বিধবাদের  একাদশী পালন, ধর্মীয় গোঁড়ামী, জাত, পাত ভেদাভেদ, ইত্যাদি। একের পর এক সমাজ সংস্কারকরা নিজেদের মতো করে সংস্কার এর কাজে আন্দোলন শুরু করেন, ঠিক তেমনি বিদ্যাসাগর মহাশয় বিধবাদের পুনরায় বিবাহের জন্যে আন্দোলন শুরু করেন। স্বামী বিবেকানন্দ, রাজা রামমোহন রায়, ভিভিয়ান ডিরোজিও, সিস্টার নিবেদিতা, সহ প্রমুখ বিদ্বজনেরা।

মাত্র চোদ্দ বছর বয়সের তার এক বাল্য  সঙ্গিনী বিধবা হয়েছিলেন, একাদশীর দিন তিনি তার বাড়িতে গিয়ে দেখেছিলেন সেই বিধান পালনের দশা, সারা দিন অভুক্ত থেকে তাকে ইশ্বরের পায়ে নিবেদন করতে হতো। সমাজের নিয়মের গণ্ডি শিখরে কিভাবে বিধবাদের জীবনকে বেঁধে দেওয়া হতো তা সত্যই ভাববার বিষয়। সেই একাদশী বিধানের প্রতি একরোকা তিনি। সেই দিন তাঁর  মনে বিদ্রোহের আগুন জ্বলে উঠেছিল। তা নেভেনি জীবদ্দশায়। শুরু করেন বিধবাদের পুনরায় বিবাহের জন্য আন্দোলন। নিজের প্রচেষ্টায় হিন্দু বিধান, রীতি নীতিকে উপেক্ষা করে একের পর এক বিধবাদের বিবাহ দিতে শুরু করেন। এমন কি নিজের সন্তানকেও বিধবার সহিত বিয়ে দিতে কুণ্ঠা বোধ করেন নি। ক্রমেই তিনি হয়ে ওঠেন সমাজের চক্ষুশুল।  পরিবেশ এমন হিংসাত্মক হয়ে ওঠে, পিতা ঠাকুরদাস পুত্রের জীবন সুরক্ষায় গ্রাম থেকে লেঠেল পাঠিয়েছিলেন। অবশেষে ১৮৫৬ সালের ২৬ শে জুলাই লর্ড ক্যর্নিং এর সহায়তায় বিধবা বিবাহ আইন পাশ করানো হয়। জাতীয় উৎসবের মতই বিপুল উদ্দীপনার সঙ্গে বিধবা বিবাহ অনুষ্ঠিত হতে থাকে। তখন কাগজে কলমে, পণ্ডিতদের সভায়, মহিলা মহলে, দাশু রায়ের পাঁচালিতে এমন কি চাষির ধান ক্ষেতে একটাই আলোচনা পথে পথে ছড়া কেটে চলেছে

“বেঁচে থাকুক বিদ্যাসাগর চিরজীবি হয়ে।

সদরে করেছে রিপোর্ট বিধবার হবে বিয়ে”

শান্তিপুরের তাঁতিরা কাপড়ে লিখেছে “বেঁচে থাকুন বিদ্যাসাগর” আর নারীরা সেই মন্ত্র লেখা শাড়ি পড়েছেন। তবে সত্যই কি দয়ার সাগর তার বিধবা বিবাহ আন্দোলন এবং আইন প্রণয়ন সর্বপরি মেনে নিতে পেরেছিলেন হিন্দু বাঙালি নারীরা? সর্বত্র ভাবে এই আন্দোলন সফল হয়েছিল কি? এ বিষয়ে ড: শর্মিলা সেন তার বাংলা সাহিত্য “বিধবা চিত্র” গ্রন্থে লিখেছেন “কথিত নারীর দুর্জয় রিপু বর্গের প্রাবাল্যর ধারণা ব্যর্থ হতে বাধ্য। তাই দেখা যায় সাহিত্য নামক উপন্যাসেই এই দুর্জয় রিপুতে বশীভূত নারীর কথা বলা হয়েছে। খুব শ্রদ্ধা ভাবে বলা হয় নি যে আন্দোলনের প্রচেষ্টা আর বিদ্যাসাগরের যুগান্তকারী মন্তব্য (বিধবা হইলেই নারীর দেহ পাষানময় হইয়া যায় না)। মৌচাক এ ঢিল মারার মতো বাংলা সাহিত্যের জগতে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিল ঠিকই, পঞ্চতন্ত্র তাদের সকল লালিত নারীর সতীত্ব ও পতিব্রতা ধারণাকে আর এক বার ভেঙেচুরে সাজিয়ে গুছিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু তাদের কথিত মধ্যযুগীয় আদর্শের কোনো ব্যত্যয় সেখানে ঘটেনি।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *