কবি ও সম্পাদক: কালি ও কলম

মোনালিসা পাহাড়ী, দাঁতন, পশ্চিম মেদিনীপুর

##

কবি ও সম্পাদক একে অপরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী ভাবে যুক্ত। একজন সম্পাদককে যেমন একটা পত্রিকা প্রকাশ করার জন্যে কবিদের উপর নির্ভর করতে হয় ঠিক তেমনি কবিরা ও কিন্তু সম্পাদকদের উপর নির্ভরশীল।কারণ সম্পাদক রা উদ্যোগ নিয়ে পত্রিকা প্রকাশ করেন বলেই কিন্তু কবি দের লেখা গুলো প্রকাশিত হওয়ার সুযোগ পায়। বস্তুত পক্ষে কোনো কবি ই প্রথমেই প্রথম শ্রেণির সাহিত্য পত্রিকা গুলিতে কিংবা ব্যবসায়িক ভিত্তিক প্রকাশিত ম্যাগাজিন গুলোতে লেখার সুযোগ পান না। অধিকাংশ কবিকেই প্রথম প্রথম লিটল ম্যাগাজিন গুলোর

উপর ভরসা করতে হয়। এবং আমাদের সারা রাজ্যে অসংখ্য লিটল ম্যাগাজিন বছরে নিয়মিত ভাবে বেরোয়। কবিরা সেসব পত্রিকাতে লেখা ও পাঠান। বর্তমান দিনে একটা বিশেষ অসুবিধে হচ্ছে যে এত বেশি পরিমাণে কবির সংখ্যা বেড়ে গেছে যে কোনো পত্রিকা যদি লেখা আহ্বান করেন তবে এত বেশি পরিমাণে লেখা জমা পড়ে যে সম্পাদক মন্ডলী হিমসিম খান লেখা নির্বাচন করতে। এর থেকেও বড়ো সমস্যা হলো কবির সংখ্যা দিনদিন যতই বাড়ছে, পাঠকের সংখ্যা দিনদিন ততই কমছে। ফলে সম্পাদকরা ও পত্রিকা বিক্রির জন্যে নানা রকম ফন্দি ফিকির খোঁজেন।

যেমন কয়েকদিন আগে কোনো একটি পত্রিকার জন্য ফেসবুক এ লেখা আহ্বান করলেন সম্পাদক । স্বাভাবিক ভাবেই প্রচুর কবিরা তাতে লেখা পাঠাতে উৎসাহ দেখালেন। এবং প্রত্যেকেই ইমেইল আইডি চাইলেন। তখন পত্রিকার তরফ থেকে জানানো হলো যে ইমেইল আইডি পত্রিকাটিতে আছে। সেখান থেকে নিয়ে নিতে বলা হলো। তাতে অনেকেরই উদ্যম তলানিতে ঠেকলো। কারণ একটা লেখা পাঠানোর জন্যে নির্দিষ্ট পত্রিকাটি কিনে, পড়ে, ইমেইল আইডি সংগ্রহ করার মতো মানসিকতা অনেকেরই ছিলনা। একজন তো স্পষ্ট ভাবে জানিয়েই দিলেন যে, পত্রিকা বিক্রী করার জন্যে এটা একটা ফাঁদ পাতা হয়েছে। সর্বসমক্ষে এই অভিযোগ শুনে সম্পাদক ও রীতিমত ক্রুদ্ধ। তিনি তখন একটা পত্রিকা প্রকাশের সমস্ত খরচ নিখুঁত ভাবে দিয়ে দেখিয়ে দিলেন যে কিভাবে লিটল ম্যাগাজিন এর সম্পাদক ম উইন্ডলী নিজেদের অর্থ ও সময় অপচয় করে সাহিত্যের সেবা করে চলেছেন। এবং আমার মনে হয় তিনি খুব একটা ভুল বলেননি।

আমি বেশ কয়েকজন সম্পাদকের সাথে কথা বলে দেখেছি , এবং বুঝেছি যে ঘরের খেয়ে পরের মোষ তাড়ানোর মতো মানসিকতা না থাকলে কিন্তু কেউ লিটল ম্যাগাজিনের সম্পাদক হতে আসবেন না।আমি সম্পাদকদের অপমান করার  জন্য একথা বলছি না।আমি শুধু সম্পাদকদের ভেতরে যে সাহিত্য পাগল মানুষ টা আছে তাকে বোঝাতে চাইছি।নিজের ব‍্যাক্তিগত  জীবনকে  অবহেলা করে, অর্জিত অর্থ অপচয় করে, মূল্যবান সময় নষ্ট করে একজন সম্পাদক একটা পত্রিকা প্রকাশ করেন। প্রকাশ করার পরেও কিন্তু কবিদের কাছ থেকে অনেক সময় ভালো খারাপ অনেক কথাই শুনতে হয়। তার ওপরে যদি পত্রিকা বিক্রী না হয় তাহলে তো ষোলো কলা পূর্ণ। পুরোটাই তাঁর নিজের হাত থেকে গেল। সম্পাদকরা অনেক ক্ষেত্রেই পত্রিকা কেনার শর্তে পত্রিকায় লেখা প্রকাশ করতে চান।

এখানেই হচ্ছে কবিদের সমস্যা। একজন কবি অনেক সময়, মেধা, বুদ্ধি, শ্রম খরচ করে একটা সৃষ্টি কে তুলে ধরেন। নতুন কিছু বা মৌলিক কিছু সৃষ্টি করা কিন্তু খুব একটা সহজ কথা নয়। তারপর  তাঁকে সম্পাদকের কাছে লেখা টি পাঠিয়ে দিতে হয়। ডাকযোগে পাঠালে যথেষ্ট অর্থ ও ব্যয় করতে হয়। ইমেইল এ পাঠালে টাইপ করার জন্যে অনেক টা সময় ও লাগে। এরপর যদি সম্পাদক বলেন যে লেখা প্রকাশ করার আগেই পত্রিকা বুক করতে হবে বা কিনতে হবে তাহলে কবিদের ও নিজেদেরকে  খুব ছোট মনে হয়। তাঁরা ভাবেন তাঁদের সৃষ্টির যেন কোনো দাম ই নেই। আবার একজন কবি তো আর শুধুমাত্র একটি পত্রিকাতে লেখা পাঠান না। অনেক পত্রিকাতে লেখা পাঠান। সেক্ষেত্রে সব পত্রিকার ব্যয় বহন করা তাঁর পক্ষে ও দুঃসাধ্য হয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে আবার কবিরা লেখা প্রকাশিত হওয়ার পর পত্রিকার সৌজন্য কপি না পেলে খুবই কষ্ট পান। কারণ তাঁর সৃষ্টিকে ছাপার কালিতে দেখার মতো সুযোগ না পেলে খুবই ব্যথিত হন। এবং অনেক সময় তাঁরা সৌজন্য সংখ্যা না দিতে পারলে লেখা না চাওয়ার অনুরোধ ও করেন।

তবে খুব খারাপ লাগে তখনই তখন সম্পাদক রা কবিদের ইচ্ছাকৃত ভাবে অপমান করেন। যেমন একটি বিশেষ পত্রিকায় লেখা আহ্বান করা হলো। সঙ্গে একথা ও বলা হলো কেউ চাইলেই টাকার বিনিময়ে পত্রিকার অভিভাবক হতে পারেন। স্বাভাবিক ভাবেই লেখা পাঠানোর জন্যে অনেকেই ইন্টারেস্টেড হলেন। কিন্তু বেশিরভাগ জন পত্রিকার অভিভাবক হতে চাইলেন না।তখন সম্পাদক অত্যন্ত দৃষ্টিকটু ভাবে মন্তব্য করলেন ‘লেখা পাঠানোর সময় আমি আছি, আমি আছি, আর সাহায্যের বেলায় কেউ নেই।’ সম্পাদকদের কাছ থেকে এ ধরনের ব্যবহার কিন্তু কাম্য নয়।

যাইহোক, পরিশেষে বলব, কবি ও সম্পাদক হলেন কালি ও কলমের মতো। একে অপরের প্রতি নির্ভরশীল। তাই দুজনের ই দুজনকে সমবেদনা ও সহানুভূতির সঙ্গে দেখা উচিত। আর এভাবেই বাংলা সাহিত্যের সঞ্জীবনী ধারা অব্যাহত থাকুক বিশ্বের সাহিত্য শালায়।

 

 

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *