কম নয়, মেপে খান ডায়াবেটিসে

খাবার নিয়ে দুশ্চিন্তার অন্ত নেই ডায়াবেটিস আক্রান্তদের। কি খাবেন আর কি খাবেন না তা নিয়েই তাদের গবেষণার শেষ নেই। অনেকে ডায়াবেটিসের ডায়েট তৈরি করে নেন। তবে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন ডায়াবেটিসের নির্দিষ্ট কোন ডায়েট নেই। স্বাভাবিক সময়ের মতই খাবার খেতে হবে তবে এক্ষেত্রে পরিমাণ ঠিক রাখতে হবে এবং অনিয়ম করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার পর অনেকে করোলার রস, মেথি ভেজানো জল, কাঁচা হলুদসহ বিভিন্ন সুপার ফুডের ওপর ভরসা রাখেন। তবে চিকিৎসকরা ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রেও স্বাভাবিক খাবার খাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো বাধা নেই বলে জানিয়েছেন। কিন্তু খেতে হবে পরিমাণ মত।

ডায়াবেটিস হলেও বিজ্ঞানীরা সাধারণ সুষম খাবার খেতে বলেন, যা এমনিই আমাদের খাওয়ার কথা, যাতে কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, ফ্যাট আছে মাপমতো, যে খাবারে নিষিদ্ধ কিছুই নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে স্বাভাবিক অবস্থায় যেমন ঘন ঘন অনিয়ম করলেও খুব ক্ষতি নেই, এ ক্ষেত্রে ততটা করা যায় না। বলাই বাহুল্য, কেউ যদি আলু খেতে চান, তাতে আপত্তি নেই।

তাদের মতে ‘চাল–গমের মতো আলুও তো স্টার্চ। তাহলে ডায়াবেটিস হলে যদি ভাত–রুটি ব্রাত্য না হয়, আলু হবে কেন? বিশেষ করে যেখানে ১০০ গ্রাম চাল–গমে আছে ৩৪০ ক্যালোরি আর আলুতে ১০০ ক্যালোরি। এছাড়া আলুতে আছে ক্লোরোজেনিক অ্যাসিড, যা ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স কমিয়ে ডায়াবেটিকদের উপকার করে। যদিও আলুর গ্লাইসিমিক ইনডেক্স (জি আই) বেশি। অর্থাৎ রক্তে চট করে সুগার বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু খোসাসহ খেলে ও সঙ্গে অন্য শাক–সবজি মিশিয়ে নিলে পুরো খাবারের জিআই কমে যায়। তখন তা নিশ্চিন্তে খাওয়া যায়।’

পুষ্টিবিদদের মতে, আলু ভেজে নয়, খেতে হবে সিদ্ধ করে বা তরকারিতে। এছাড়া শুধু আলু ভর্তা না খেয়ে অন্য কোনো সবজির সঙ্গে মিশিয়ে ভর্তা করে খেতে পারেন। এতে পুষ্টিও পাওয়া যাবে এবং হঠাৎ করে সুগার বাড়বে না। এছাড়া যদি আলু বেশি খান তাহলে ভাত-রুটি কম খেলেই ঝামেলা মিটে যাবে।’

অনেকে ভেবে থাকেন যে, ডায়াবেটিস হলে কার্বোহাইড্রেট ও ফ্যাট কমিয়ে প্রোটিন প্রচুর খেতে হয়। কিন্তু আসলে ব্যাপারটি তেমন নয়। খেয়াল রাখতে হবে যে, মোট ক্যালোরির ৫০ শতাংশের বেশি কার্ব থেকে না এলেই হল এবং তা যেন ফাইবার সমৃদ্ধ হয়। তাই ময়দার বদলে হোল-গ্রেইন আটা, সাদা চালের বদলে ব্রাউন বা ওয়াইল্ড রাইস, সাদা পাউরুটির বদলে ব্রাউন ব্রেড, ফলের রসের বদলে গোটা ফল খেতে বলা হয়। সবজি, ডাল খেতে হয় খোসাসহ। সবজি ও ফল দিনে ১০০ গ্রামের মতো খাওয়া দরকার। আম–কলাও মাঝেমধ্যে দু’এক টুকরো খাওয়া যায়। মাঝে মাঝে একটু মিষ্টিও খেতে পারেন। তবে সেক্ষেত্রে ভরা পেট থাকতে হবে এবং ফাইবারসমৃদ্ধ খাবারের সঙ্গে খেতে হবে।

কিডনি ঠিক থাকলে প্রতি কেজি ওজনের জন্য এক গ্রামের হিসেবে খান।ডিমের কুসুম বাদ দিতে হবে না, প্রতিদিনই গোটা ডিম খান। মাছ খান দিনে ১০০ গ্রামের মতো। চিকেন ব্রেস্ট পিস খেতে পারেন। রেড মিট বাদ দিতে হবে না। মাংসের কম চর্বিওলা অংশ মাসে এক-আধবার খেতে পারেন।

পুষ্টিবিদ বিজয়া আগরওয়াল জানান, ‘ফ্যাট কম খেলেও ভাল ফ্যাটে যেন কার্পণ্য না হয়। কাঠবাদাম বা আমন্ড, আখরোট, তিসি, সূর্যমুখীর ও চালকুমড়োর বীজ, অ্যাভোক্যাডো, অলিভ অয়েল অল্প করে খান। ফ্যাটযুক্ত দুধ (ফুল ক্রিম মিল্ক) খান। সামুদ্রিক মাছ খান সপ্তাহে দু’তিন দিন। তেলের মধ্যে সর্ষে, সূর্যমুখী, বাদাম, অলিভ, রাইসব্রান, সবই খেতে পারেন। একেক রান্নায় একেকটা ব্যবহার করুন। তবে দিনে ৩ চা–চামচের বেশি যেন না হয়। ট্র্রান্স ফ্যাট, অর্থাৎ বনস্পতি, মার্জারিন, ভাজা ও প্রসেসড খাবার বাদ দিতে হবে। স্যাচুরেটেড ফ্যাটে ভরপুর ঘি–মাখনও যত কম খাওয়া হয় তত ভালো।’

এছাড়া, সুপার ফুড অর্থাৎ আমলকি, রসুন, পালং, মেথি, টমেটো, ফাইবারসমৃদ্ধ খাবার, অ্যামন্ড, করোলা, কাঁচা হলুদ ইত্যাদি ইচ্ছে হলে খেতেই পারেন। তবে নিয়ম মেনে। যেমন-মেথি ভেজানো পানি নয়, খান মেথির গুঁড়া। লাউ–করোলার রস না খেয়ে রান্না করে খান। প্যাকেটের আমলকি বা আমলকির রসের বদলে কাঁচা বা সেদ্ধ আমলকি খান। কাঁচা হলুদ খেতে পারেন। রান্নাতে দিলেও হবে। এছাড়া রসুন রান্না বা কাঁচা খেতে পারেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *