কুসুমিতা

 চিত্রা দাশগুপ্ত #

কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারী পঙ্কজ দত্তর স্ত্রী সুমিতা একটি কন্যা ও একটি পুত্র নিয়ে সুখের-সংসার। মেয়ে মালঞ্চ, কলেজে ফাইনাল-ইয়ার ও ছেলে পরাগ, বারো ক্লাসে পড়ে। হঠাৎ করে কালো-মেঘের ছায়া ঘনিয়ে এলো পঙ্কজবাবুর সংসারে। পথ-দুর্ঘটনায় ওর জীবনটা ওলট-পালট করে দিল। অনেক চেষ্টা করেও ডাক্তার-বদ্যি কেউ ওনাকে আর দুপায়ে দাঁড় করাতে পারলো না।  অফিস থেকে যা পাওনা-গন্ডা ছিল পেলেন। দুর্ঘটনা-বীমা থেকেও পেলেন কিছু টাকা। পেনশন পাবেন কিন্তু ছেলে মেয়ের ভবিষ্যত তারপর স্বামী-স্ত্রীর বাকী জীবনটা পড়ে আছে …..

প্রথম দিকে খুবই মুষড়ে পড়েছিল সবাই। বাবার আমলের বসত-বাড়ি খোলা-মেলা কিন্তু ভাড়া বসানো সম্ভব না। পিছনে বেশ অনেকটা খোলা জায়গা,সেখানে বাগানে নানা রকম ফল-ফুলের গাছ। পঙ্কজবাবু নিজে হর্টিকালচারিস্ট, ছেলে মেয়ে বৌ সবাই মিলে সুন্দর বাগান করেছিলেন। 

মালঞ্চর হাতটা ভালো, যা লাগায় সুন্দর দেখ-দেখ করে বেড়ে ওঠে। 

পাড়ার-প্রতিবেশী প্রায় ওর কাছে চারাগাছ, বীজ চাইতে আসে। 

মালঞ্চ ভাবে ও বড় সন্তান, ওকে বাবার পাশে দাঁড়াতেই হবে, 

একটা রোজগারের পথ বের করতেই হবে।

কম্পিটিশন বাজারে একটু নতুনত্ব কিছু করতে হবে ,একটু আলাদা—- 

হঠাৎ মাথায় এলো ,বড় কিছু ভেবেচিন্তে পরে হবে—- তবে এখন থেকে 

চারাগাছ,বীজ ,কাটিং আর ফ্রি দেবে না। যেমন ভাবনা তেমন কাজ। পরদিন গেটে একটা হাতে-লেখা বোর্ড ঝুলিয়ে দিল— এখানে স্বল্প-মূল্যে ফুল-গাছ, বীজ, কাটিং পাওয়া যায়।  

আজকাল ফ্ল্যাটে থাকলেও সবার খুব ব্যালকনিতে বাগান করার ঝোঁক হয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যে বেশ সাড়া পেয়ে ওর উৎসাহ বেড়ে গেল। বাজার থেকে নানা মাপের গামলা কিনে ভাইকে সাথে নিয়ে দিন রাত এক করে নানা রকম ফুলের গাছে বিক্রির জন্য তৈরি করতে লাগলো মালঞ্চ। মা জল সিঞ্চনের দায়িত্বটা নিয়েছে, প্রয়োজনে বাবার উপদেশ পরামর্শ নেয়। 

বিক্রি-বাট্টা ভালই হচ্ছে,পরিচিতিও হচ্ছে ।

আশপাশ থেকে পুজোর ফুল-মালা সাপ্লাইের অর্ডারও পাচ্ছে। মালঞ্চ চায় আরো বড় কিছু করতে। বেশ সময় ও যত্ন নিয়ে এবার মরশুমী ফুলের চাষ করল। মাটি কুপিয়ে সার দিয়ে দিন-মজুরি নিয়ে সাহায্য করে একটি ছেলে। দেখতে দেখতে গাছগুলো বড় হয়ে ফুলে ফুলে ভরে গেল। নানা বর্ণে গন্ধে বাগানটা যেন স্বর্গ-রাজ্য হয়েগেল। নানা ধরনের গেঁদা ছাড়া আরো কত রকমারি ফুল—ডালিয়া, চন্দ্রমল্লিকা, কার্নেশান, পিটুনিয়া আরও কত, প্রায় বিশ-বাইশ রকমের ফুল। 

এক হাতে আর সামলানো সম্ভব হচ্ছে না। দুজন মজুর নিযুক্ত করল মালঞ্চ। একটা গ্রিন-হাউজ তৈরি করে বিশেষ ধরনের কিছু ফুল অর্কিড 

চাষ করছে বাবার পরামর্শ মত। অল্প সময়ের মধ্যে খুব আশাপ্রদ ফল পেয়ে কিছু ব্যাংক লোন নিয়ে বাড়ির সামনের ঢাকা বারান্দাটাতে ওরা একটা ফ্লোরিস্ট শপ্ খুলল। নাম দিল “কুসুমিতা”।

পাড়ার মধ্যে এমন একটা দোকান—-আর ফুলের চাহিদা তো জন্ম থেকে মৃত্যু সব ক্ষেত্রেই অনিবার্য, তাই জমে গেল ব্যাপারটা। বিশেষ করে শীতের মরশুমে যেমন ফুলের চাহিদা তেমন গামলায় ফুল সমেত গাছের চাহিদা। এখন মালঞ্চ বিয়ে-বাড়ি, বরের-গাড়ি, শ্রাদ্ধ-বাড়ি সব রকম ফুল সাজাবার অর্ডার নিচ্ছে। যদিও বাংলায় সব ঋতুতেই নানা রকম ফুল ফোটে তার চাহিদা ও থাকে, তবে শীতের মরশুমী ফুল তার পাগল করা রূপ আর রঙে সবার মন কেড়ে নেয়, চোখ জুড়িয়ে যায়। গ্রীষ্মের সন্ধ্যা থেকে বাগান ভর্তি বেলি ফুলের স্নিগ্ধ সুরভী সারা পাড়াটা যেন মম করে। 

আজ মালঞ্চ ভাবে ফুল যেন ওদের জীবনে ঈশ্বরের আশীর্বাদের পুষ্প-বৃষ্টি মত ঝরে পড়ে ওদের জীবনটাকে পাল্টে দিয়েছে। ভাই পরাগ তার স্কুলের পড়া শেষ করে বাবার মত হর্টিকালচারিস্ট হবার উদ্দেশ্যে নামি কলেজে পড়ছে। হুইল-চেয়ারে বসেও শারীরিক প্রতিবন্ধী পঙ্কজ দত্ত হর্টিকালচার কনসালটেন্ট হিসেবে এক সার্থক নাম। ফুলের দৌলতে ওরা আজ সুখী ও স্থিতিশীল। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

18 − seven =