গল্প হলেও সত্যি

নবনীতা দাস, রঘুনাথগঞ্জ, মুর্শিদাবাদ।

 

অবশেষে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলা গেল। দীর্ঘ দুমাসের দুশ্চিন্তার অবশান। স্নাতকের পর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর প্রবেশিকা দিতে দিতে শেষে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি, দুর্গাপুর এ ভর্তি হলাম। বেশ শান্ত ও ছিমছাম এই ইস্পাত নগরী দুর্গাপুর। প্রশস্ত রাস্তাঘাটে ধরে সারি সারি গাছ, বাড়িগুলো যেন সবুজের মাঝে সাজিয়ে রাখা। যাকে বলে একেবারে পরিকল্পিত নগর। বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরও অসাধারণ, পরিবেশও মনোরম। প্রধান প্রবেশদ্বারের কাছেই একাডেমিক ও এডমিনিষ্ট্রটিভ বিল্ডিংগুলো বিস্তৃত। তার বাম পাশে বয়েজ হোস্টেল ও ডান পাশের অঞ্চলটা গার্লস হোস্টেলের। বাকিটা জায়গা জুড়ে কোথাও ফ্যাকাল্টি কোয়ার্টার, কোথাও ক্যাম্পাসের হসপিটাল, পোস্ট অফিস, দু তিনটে ব্যাংক, ক্যান্টিন আরও কত কি! চারিদিকে পর্ণমোচি গাছপালার সারি, ক্যাম্পাস জুড়ে রাস্তার ধারে পরে থাকা হলদে পাতার সমাহার, অবিরত পাতা ঝরার শব্দ, সব মিলে পরিবেশটা বেশ রোমান্টিক লাগে, আবার সূর্যের আলোটা নিভলে ততটাই গা ছমছম করে।

র‍্যাগিং এর ভয়ে। তাই বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরের কাছের একটি পেয়িং গেস্ট এ ঠাঁই হলো আমার। সেখানেই আমার পরিচয় অন্বেষার সাথে। ওর মেকানিক্যাল, আমার কম্পিউটার হলেও আমাদের ভিতর বন্ধুত্বের রসায়নটা জমল ভালোই। অসাধারন একটা প্রাণচঞ্চল, হাসিখুশি ও মিশুকে মেয়ে অন্বেষা। দুজনের এই পেয়িং গেস্ট এ ভালোই চলছিল প্রথম দিকটায়। কিন্তু দিন কতক পর থেকেই আমাদের দুজনেরই মনে হতে লাগলো এই রোজ রোজ ক্যাম্পাসের বাইরে থেকে যাতায়াত করে ক্লাস করা ও খাওয়াদাওয়ার অনিয়ম ইত্যাদি একটু কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ছে। তাই অগত্যা হোস্টেলে ঘর পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠলাম দুজনেই। কিন্তু ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে, হোস্টেলের মাইন বিল্ডিং এ সমস্ত সিট ভর্তি। অবশেষে যদিও অজস্র ঝামেলা ঝঞ্ঝাট, ওয়ার্ডেন এর কাছে কান্নাকাটি সহ বিভিন্ন নাটক করে, বিশেষ করে অন্বেষার অনবদ্য অভিনয় দক্ষতা ও আমার বাকপটুতা সাহচর্যে অবশেষে রুম পাওয়া গেলো। বলাই বাহুল্য, মেন বিল্ডিং এ জায়গা হয়নি। আমাদের জন্য একটা কোয়াটার এর ব্যবস্থা করা হয়। এই কোয়ার্টারগুলোর অধিকাংশই আগে ছাত্রছাত্রীদের থাকার জন্য ব্যবহার করা হলেও এখন পরিত্যক্ত। বিশেষ করে নতুন হোস্টেল হওয়ার পর। এই কোয়াটার নং 12 বি এ একটাই ঘর, ডাইনিং ও বাথরুম, ঘরে তিনটে বিছানা। খাওয়া দাওয়া যদিও হোস্টেলের বিল্ডিংএই করে আসতে হবে।

রবিবারের সন্ধের দিকেই আমরা দুজনে জিনিসপত্র নিয়ে ঢুকে পড়লাম আমাদের নিজস্ব হোস্টেলরুপী কোয়ার্টারে। নতুন ঘরে সব গুছিয়ে বসতে বসতে বাজলো আটটা। ওই সময় ঢুকলো আমাদের তৃতীয় রুমমেটও। প্রজ্ঞা এম. টেক. করছে। যদিও আগে পরিচয় ছিল না, তবু ভালোই হলো এই পাণ্ডব বর্জিত কোয়ার্টারে যত দল ভারি হয় ততই ভালো। মেয়েটা একটু চুপচাপ হলেও বেশ ভালো, আমাদের আড্ডায় খুব ভালো শ্রোতার ভূমিকা নেয় সে। যদিও অন্বেষা যে আড্ডায় থাকে সেখানে আর কারো কিছু বলার তেমন সুযোগ থাকে না, এতটাই গপ্পোবাগিশ। সোমবার থেকে ক্লাস শুরু হলো যথারীতি। সকাল নটার ক্লাস থাকে আমার প্রায় রোজ, অন্বেষারও উনিশ বিশ। প্রজ্ঞা আগেই বেড়ায়, ওর হয়তো আটটার ক্লাসটা থাকে। হোস্টেল জীবনে যা হয়, কোনোক্রমে ঘুম থেকে নিজেকে বলপূর্বক তুলে টেনে হিচড়ে ক্লাসে নিয়ে যাওয়া আর কি। অবশেষে এলো শুক্রবার পরদিন এডমিনিষ্ট্রেশন খোলা থাকলেও ক্লাস বন্দই থাকে। তাই প্রতিদিনের মতো ঘরে সাতটার মধ্যে ফিরে গিয়ে ঠিক করলাম আজ আর পড়া নয়। প্রজ্ঞা ঘরে ঢুকলে আজ জমিয়ে আড্ডা বসবে। তার মধ্যেই হোস্টেল থেকে খাওয়াদাওয়া সেরে আসা যাবে। প্রজ্ঞা রোজ খেয়েই ঢোকে।

নটার মধ্যে সবাই ঘরে একত্রিত হয়ে আড্ডা শুরু করা গেল। অন্বেষাই শুরু করলো স্বাভাবিক ভাবে। নটা থেকে এগারোটা পর্যন্ত চললো তার ক্লাস নাইন থেকে শুরু হওয়া প্রেমকাহিনীর সবিস্তারে বিবরণ। ছোটখাটো মহাভারত বলা যেতে পারে। প্রেমের গল্প থেকে প্রসঙ্গ ঘোরাতে আমি বললাম এবার প্রত্যেকে একটা করে নিজেদের জীবনের স্মরণীয় ঘটনা বলবে। প্রজ্ঞা যদিও না না করছিল। তার নাকি কালকের দিনটা খুব গুরুত্বপূর্ণ, আর ভালো লাগছেনা ইত্যাদি বলেও কোনো লাভ যদিও হলোনা। আমরা ওকে আশ্বাস দিলাম যে আমরা দায়িত্ব নিয়ে তার মন ভালো করে দেবই। সবার প্রথমে শুরু করলাম আমিই।

এক

ঘটনাটা আমার কলেজ জীবনের। তখন থাকতাম কলেজ হোস্টেলেই। সেবার ফাইনাল পরীক্ষা চলাকালীন একটি আমাদের হোস্টেলেরই মেয়ে নিজের ঘরেই গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করে। পরে জেনেছিলাম কোনো একটা পরীক্ষা খারাপ হওয়ায় ঠিক মেনে নিতে পারেনি সে। সে যাই হোক, সেদিনটার কথা আমি কোনদিন ভুলবো না। পরীক্ষাটা অধিকাংশ মেয়ে সেন্টারের কাছেই কোথাও থেকে দিচ্ছিল। তাই হোস্টেল প্রায় ফাঁকা পড়েছিল। আমরা যে তলায় থাকতাম সেখানে সবমিলিয়ে ছিল মতে ছয়জন। মেয়েটি আত্মহত্যা করে সেদিন ভয়ে ছোট কেউ আর নিজের ঘরে আলাদাভাবে শুতে চাইলো না। সবাই ঠিক করলো কয়েকদিন সবাই এক ঘরেই ঘুমাবে। যদিও তার মধ্যে বাধ সাধলাম আমি। একঘরে অতজন একসাথে ঘুমানো মানে ঘুম ছাড়া বাকি সব হবে, কিন্তু ঘুম হবে না। পরের দিন পরীক্ষা, তাই ঘুমটা খুব জরুরি। বাকিরা যদিও আমাকে কিছুতেই এক থাকতে দিতে রাজি ছিল না, তবু আমি প্রায় জোর করেই নিজের ঘরে ঘুমোতে গেলাম। বলাই বাহুল্য, আমার রুমমেটরা ছিল না কেউই। আমার বান্ধবীরা তারপরও সহজে আমাকে ছেড়ে দেওয়ার পাত্রী ছিলনা যদিও। বিপদের মুখ থেকে তারা আমাকে উদ্ধার করবেই এরকম একটি মনোভাব নিয়ে বার বার আমার দরজায় এসে কাকুতি মিনতি করতে শুরু করলো ওদের সাথে শোওয়ার জন্য। আমি একা থাকলে নাকি আমাকে ভুতে পেতে পারে এবং সেই ভুত দ্বারা প্রাপ্ত আমি ওদের রাতে আক্রমণও করতে পারি, এরকম ধারণার কথাও দুএকজন বললো। তিন থেকে চারবার তাদের এই তলবে সাড়া দেয়ার পর ঠিক করলাম যে, নাহ আর নয়। এর পরের বার যতই দরজার কড়া নাড়ুক, আমি আর দরজা খুলবো না, এমনকি বিছানা থেকেও উঠবো না। তাই পঞ্চমবারে যখন প্যাসেজে আবার পায়ের আওয়াজ শুনতে পেলাম আমি আরো ভালোভাবে চোখটা বন্ধ করে ঘাপটি মেরে শুয়ে থাকলাম। পায়ের আওয়াজটা আমার ঘরের দরজার সামনে এসে থামলো, তারপর দরজাটা খুলে আমার পাশে এসে দাড়ালো। আমি শুনতে সবই পাচ্ছিলাম কিন্তু আর সত্যিই ওদের কথা শুনতে ইচ্ছে করছিল না। রাতও হয়েগেছে অনেক। এবার না ঘুমোলে কালকের পরীক্ষাটা পণ্ড হবেই হবে। আর কতক্ষনই বা দাড়াবে! কিছুক্ষন পর ডাকাডাকি করে না পেয়ে হতাশ হয়ে চলে যাবে। আর এরপর আর আসবে না তা নিশ্চিত। যথারীতি বেশ খানিকক্ষণ দাঁড়িয়েই থাকলো সে। কিন্তু ডাকলো না একবারও। শুধু কিছুক্ষন পর গালের উপর আলতো করে হাত রাখল, আবার সরিয়েও নিলো নড়লাম না দেখে বোধহয়। আমি ভাবলাম যাক বাবা, বাঁচা গেল, এবার নিশ্চয় চলে যাবে। কিন্তু না সে তো নড়ছেই না! এক মিনিট, তিন মিনিট, পাঁচ মিনিট কেটে গেল, তবু সে নড়ল না কিছুতেই। শেষে অধৈর্য হয়ে আমি চোখটা খুলেই দেখি সামনে কেউ নেই। বুকটা কেমন যেন ছ্যাঁত করে উঠলো। আমি সঙ্গে  সঙ্গে আলোটা জ্বালিয়ে দেখি ঘরের দরজাটাও ভিতর থেকেই বন্ধ। হ্যাঁ শেষ বার তো আমিই বন্ধ করেছিলাম ওটা! একবারও কেন যে মাথায় এলো না! সাথে সাথে দরজা খোলা বাইরে বেড়ালাম। যথারীতি প্যাসেজটাও জনশূন্য। আমি আর কিছু ভাবতে পারিনি, দৌড়ে গিয়ে ওদের ডাকলাম। পরীক্ষার শেষে ছুটি পড়ার আগে পর্যন্ত ওদের সাথেই থেকেছিলাম ওই ঘটনার পর থেকে। ওদের পরে জিজ্ঞেস করে জেনেছিলাম বিগত একঘন্টায় ওরা কেউ ঘর থেকে বেরোয় নি।

আমার কাহিনী শেষ হওয়ার পর পরিবেশটা কেমন থমথমে হয়ে গিয়েছিল। বাইরের গাছের সরসর শব্দে ও রাতের আলোআধারীতে গাটা বেশ ছমছম করছিল। এরপর ছিল অন্বেষার পালা। তবে ওর ঝুলিতে কোনো ভৌতিক অভিজ্ঞতা না থাকায়, তথাপি ওর ঝুলি জুড়ে শুধু প্রেমকাহিনী থাকায় অন্বেষা আবার শুরু করলো তার সেই “সোনা” সংক্রান্ত একটা ঘটনা বলতে।

দুই

আমি তো জানিস আমার সোনাকে কত ভালোবাসি। তাই প্রতিবছর ওর জন্মদিনে কোনো না কোনো সারপ্রাইজ দিয়েই থাকি। সেরকমই একবার জন্মদিনে আমি ঠিক করলাম ওর বাড়ির সামনে গিয়ে হ্যাপি বার্থডে এর গানটা বাজাব এবং গিফট আর ফুলের তোড়াটা ও বারান্দায় যখন সেটা শুনে বেরিয়ে আসবে তখন ওকে দেব। যেমন ভাবা তেমনি কাজ। আমি নিজে তো আর যেতে পারবো না ওর বাড়িতে, পাড়া জুড়ে দুই বাড়ির মধ্যে বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে যেতে পারে এবং তাতে আমার শহীদ হওয়া অবসম্ভাবী। তাহলে উপায় কি? আমাদের বাড়ি মফস্বলে, সেখানে তো আর ভায়োলিন বা গিটার বাদক পাওয়া সম্ভব নয়। তাই অগত্যা যেতে হলো তাসার বায়না দিতে। সমস্যা তাও মিটল না যদিও। তাসার লোকজন জীবনে হ্যাপি বার্থডে বাজায়নি, বাজানোর চেষ্টাও করেনি। কিন্তু আমিও ছাড়ার পাত্রী নই। সেই গান ইন্টারনেটে ডাউনলোড করে ওদের ওই মুহুর্তে জোরজবরদস্তি তাসাতে সেটা তুলিয়ে ছাড়লাম। 1200 টাকায় রফা হলো, জানিনা যদিও বাচ্ছা বলে ঠকিয়েছিলো কিনা। সে যাই হোক, কথা ছিল জন্মদিনের দিন সকাল সাতটাতে ওদের বাড়ির সামনে গিয়ে এটা বাজাতে হবে এবং উপহারাদি যা আছে দিতে হবে সোনা বাইরে বেরিয়ে এলে। অবশেষে এলো সেই দিন। আমাদের দুজনের বাড়ি একই পাড়াতে হওয়ায় আমাদের ছাদ থেকে পুরো ঘটনাটা দেখার জন্য সেদিন সাড়ে ছয়টা থেকে আমি ছাদেই বসেছিলাম পড়ার নাম করে। ঠিক সাতটাতে শুরু হলো বাজনা। আমার হৃদস্পন্দন গেল থেমে, হাত পা ঠান্ডা হয়ে গেল আর মাথায় জ্বলে উঠলো তীব্র আগুন। একি বাজাচ্ছে ওরা? এত হ্যাপি বার্থডে কোনো মতেই নয়। একটু পরে বুঝলাম ওরা ‘এ মেরে ওয়াতান কে লোগো’ বাজাচ্ছে। ওদের বাড়ির সামনে লোকে লোকারণ্য। সেই কৌতূহলী দর্শকদের ভিড়ে আমার বাবাকেও দেখতে পেলাম। আর আমার সোনা বলাই বাহুল্য ওর বাড়ির সামনে দাড়িয়ে ওর মায়ের কাছে ঝাড় খেয়ে চলেছে। হাতে আমার দেয়া গিফ্টগুলো আর চোখ মুখ লাল করে তাকিয়ে আমাদের বাড়ির ছাদের দিকেই।

তিন

গল্প শেষ হওয়ার আগে থেকেই আমরা তো হেসে খুন। অন্বেষা নিজেও বলতে বলতে হেসে লুটোপুটি খাচ্ছে। ওই ঘটনার পর থেকে ওর সোনা নাকি আর যাই হোক বাড়িতে অন্তত থাকে না ওই জন্মদিনের দিনে। এরপর যদিও প্রজ্ঞার পালা ছিল কিন্তু ওকে দেখে মনে হলো না যে ও আর কিছু বলবে। শুধু একবার বললো ওর কাছে যেদিনটা স্মরণীয় সেটা নাকি আমাদের কাছেও স্মরণীয় হয়ে থাকবে একদিন। কথাটার মাথা মুন্ডু যদিও কিছুই বুঝলাম না। বোম ফেলবে নাকি রে মেয়েটা। রাতও হয়েছিল অনেক, তাই সবাই ঘুমিয়েই পড়লাম। পরদিন আমার আর অন্বেষার ক্লাস না থাকলেও প্রজ্ঞাকে যথারীতি দেখতে পেলাম না। আজকে আবার কিসের ক্লাস থাকে ওর কে জানে। যাইহোক, আমি আর অন্বেষা দশটার দিকে গেলাম হোস্টেলে ব্রেকফাস্ট করতে। আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্ত ছাত্রীদের সঙ্গে দেখা হলো। আমরা যেহেতু আলাদা থাকি কারো সাথেই আলাপ নেই প্রায় নিজেদের ক্লাসমেট ছাড়া। সবার ক্লাসের সময়ও আলাদা, তাই খাবার সময়গুলোতেই দেখা হয়না সবার সাথে একসাথে। তাছাড়া একসপ্তাহ তো হলো এখানে থাকতে আসা। বেশ ভালো গল্প জমল কিছু মেয়ের সাথে। একথা ওকথা বলতে বলতে যখন আমরা বললাম যে আমরা থাকি ওই বি 12 বি তে, ওরা যেন কেমন হকচকিয়ে গেল। একজন বললো, “ক্যাম্পাসের এক প্রান্তে থাকিস দুজন, তোদের ভয় করে না!” আমি বললাম, “নাহ, ভয় করে না। তাছাড়া আমরা তো তিনজন থাকি। এত অসুবিধা হয়না।” ওদের মধ্যেই একজন বলে উঠলো, “ওই হোস্টেল ক্যান্টিনের মাসিটা তখন পাস দিয়েই যাচ্ছিল। আমার কথা শুনে বললো, “ওই কোয়াটারে তো দুজন থাকে শুনেছি গো! আমাদের কাছে তো হিসেব থাকে মেয়েদের। তোমরা সত্যি বলছো তো?” “মিথ্যে কেনই বা বলতে যাবো এই ব্যাপারে?” মাসিটা কি একটা ভাবলো অন্য মনস্কভাবে, তারপর বললো, “তোমরা এক কাজ করো, ওয়ার্ডেন ম্যাডামকে একবার এই ব্যাপারটা বলো। আমার জিনিসটা ঠিকঠাক লাগছে না। উটকো কেউ হোস্টেলে কি উদ্দেশ্যে আছে বলা তো যায়না। বলো তোমরা।” আমাদের খুব অদ্ভুত লাগলো কথাটা শুনে। অন্বেষা তো এর মধ্যে একটা রহস্যের গন্ধ পেয়ে গিয়ে খুব উত্তেজিত হয়ে উঠলো। ওয়ার্ডেনের কাছে যাওয়া হলো তখনই। তবে আমি অন্বেষাকে বললাম সরাসরি সব না বলে দিতে। কারণ প্রজ্ঞার সাথেও কথা বলা দরকার। ওর কোনো দায়বদ্ধতা থাকতেও পারে, তাই হয়তো এভাবে আছে। সব হলেও ও আমাদের বন্ধু। তাই ওয়ার্ডেনকে ঘুরিয়ে বললাম যে আমাদের ঘরের তৃতীয় খাটটা একটু ভাঙা, তা সেটা কি বদলে দেয়া যাবে? সেটা শুনে তিনি বললেন অন্য খাটগুলো ব্যবহার করার কথা, তৃতীয় কোনো মেয়ে ওই ঘরে এলে বদলে দেয়া হবে। আমাদের মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল এই শুনে। আমরা আর সময় নষ্ট না করে এডমিনিষ্ট্রেশনের শান্তনুদার কাছে ছুটলাম। শান্তনুদা আমাদের খুব স্নেহ করেন। ওনার কাছে হোস্টেলের লগ, রেজিস্টার, স্টুডেন্ট লিস্ট ইত্যাদি থাকে। একটু অনুরোধ করলে উনি সাহায্য করবেন আমরা নিশ্চিত ছিলাম। উনি করেও দিলেন কাজটা আমাদের অনুরোধে। বললেন, “আমি আজ খুব ব্যস্ত। দেখতেই তো পাচ্ছিস বাইরের লোকজনের ভিড়। বয়স হোস্টেলের একটা রিসার্চ স্কলার কাল রাতে হোস্টেলের চারতলা থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। সেই নিয়ে হুলুস্তুল কান্ড। আমি স্টুডেন্ট লিস্ট থেকে দেখে তোদের ওই নামের কোনো স্টুডেন্ট থাকলে তার ইনফরমেশন বাইরের প্রিন্টারে প্রিন্ট আউট দিচ্ছি। তোরা নিয়ে নিস।” আমি অন্বেষাকে প্রিন্ট আউটটা নিয়ে আসতে বলে বাইরে এলাম ব্যাপারটা কি ঠিকঠাক জানতে। সেখানে একটা মেয়েকে জিজ্ঞেস করতে যা জানলাম তা হলো এই;-

ছেলেটি এম. টেক. করে এই বিশ্ববিদ্যালয়েই গবেষণা করছিল। আত্মহত্যার কোনো কারণ জানা যায়নি। ছেলেটি যদিও খব একটা ভালো ছিলো না চারিত্রিক দিক দিয়ে। অনেক মেয়ের জীবন নষ্ট করেছে। কয়েক বছর আগে একটা মেয়ে নাকি ওর জন্য আত্মহত্যাও করে। শেষে মেয়েটি আরো বলে, “ভাগ্যের কি প্রহসন বলো, শেষে কিনা ওকেও আত্মহত্যাই করতে হলো।” আমার গলাটা কেমন যেন শুকিয়ে আসছিল। তাও কোনো রকমে জিজ্ঞেস করলাম, “মেয়েটার নামটা কি ছিল বলতে পারবে?” সে বলল, “আমাদের এখানকার পুরোনো স্টুডেন্টরা সবাই জানে। তোমরা হয়তো নতুন এসছো তাই এখনও শোনো নি ঘটনাটা।” ইতিমধ্যে অন্বেষা  প্রিন্ট আউট নিয়ে বেড়িয়ে এসেছে। ওর চোখে মুখে আতঙ্কের ছাপ। প্রিন্ট আউটটা ওর হাত থেকে নিতে নিতে আবার জিজ্ঞেস করলাম, ” কি নামটা বললে না তো?” মেয়েটা বললো, “পদবীটা মনে নেই তবে নামটা বোধয় ছিল প্রজ্ঞা।” ইতিমধ্যে আমি প্রিন্ট আউটটাতে চোখ বলেছিলাম। তাতে যা লেখা ছিল তার সারমর্ম এই, নাম- প্রজ্ঞা ভৌমিক, এম. টেক প্রথম বর্ষের প্রাক্তন ছাত্রী, হোস্টেল নং- বি 12বি। হোস্টেলের ঘরেই সিলিং ফ্যান থেকে গলায় দড়ি দেয় সে। তারিখটা আজকেরই শুধু সালটার পার্থক্য। পাশে দেওয়া পাসপোর্ট সাইজের ছবিটাতে যে মুখটা দেখতে পেলাম সেটা সেই মেয়েটির যার সাথে আমরা বিগত ছয়টা রাত কোয়াটার নং বি 12বি তে কাটিয়েছিলাম।

 

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *