দাবানল

নির্মল   ঘরামি, হুগলী  ##

                                                                                        (১)

          শীতের মরসুম। তবে গত তিনদিন ধরে ডিপ্রেশন চলছে। টিপ টিপ করে বৃষ্টি ঝড়ছিল। আকাশটা কেমন যেন ঘুম মেরে আছে। শিশু তার আবদারের জিনিস না পেয়ে বকা খেয়ে রাগে মুখখানা যেমন করে, ঠিক তেমনি। আবহাওয়া সূত্রের খবর, এই নিম্নচাপ এখনও দিন দুই থাকবে। শীতটাও  তুলনায় অনেক কম। নিম্নচাপ কেটে গেলে নাকি জাঁকিয়ে শীত পড়বে।

          রাত প্রায় সাড়ে দশটা। বৃষ্টিটা একটু ধরেছে। জলের ফোঁটা কার্নিশ থেকে টপ টপ করে পড়ছে, তার শব্দ শোনা যাচ্ছে। চারদিকে একটা থমথমে নিস্তব্ধতা। মাঝে মধ্যে মনে হয় এই বুঝি আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামবে। শীতের দিনেও বর্ষার আকাশ।

           আশা খোলা জানালা দিয়ে বাইরের ঘন অন্ধকারের মধ্যে  অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। রাতের সমস্ত তমসা তার হৃদয়ে পিঁপড়ের বাসা বেঁধেছে। আর সেখানকার কালো কালো পিঁপড়েগুলো তার হৃৎপিণ্ডটাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে। তাদের বিষের যন্ত্রণা তার শরীরটাকে অসাড় করে তুলেছে। তবুও তার হাত দুটো যেন সেই ঘন অন্ধকারের মধ্যেও একটা ভরসায় হাতড়ে চলেছে।

            অঙ্কুশ আশার একমাত্র ছেলে। নিজে একটু পড়াশোনা শিখেছিল। অভাবের তাড়নায় বেশি দূর পড়তে পারে নি প্রবল ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও। তাই পেটে একটু বিদ্যের ছোঁয়া আছে বলে ছেলের শিক্ষার ব্যাপারে কোনো কার্পণ্য করে নি। নিজে দু’বেলা ঠিক মতো না খেয়ে ছেলেকে খাইয়েছে,যাতে ছেলের কোনো কষ্ট না হয়। বাবা অনীশ চক্রবর্তীও হাড়ভাঙা ওভার ডিউটি করেছে,যাতে ছেলের পড়াশোনায় কোনো অভাব না থাকে। তাদের সমস্ত আশা-ভরসা ছিল তাদের একমাত্র ছেলে অঙ্কুশ।

           অঙ্কুশ পড়াশোনায় ভালো ছিল। এম.এ.পাশ করে বি.এড পড়ার ইচ্ছেটা ক্ষীণ হয়ে গেছে। এখন বি.এড পড়তে গেলে কাড়ি কাড়ি টাকার দরকার। বাবার কারখানার অবস্থাও ভালো না। টালমাটাল অবস্থা। যে-কোনো মুহূর্তেই বন্ধ হয়ে যাবে। একটা চাকরি ওর এখন খুবই জরুরি।তাই কম্পিটিটিভ একজামগুলো  দিচ্ছিল। কিন্তু  বর্তমানে এখানে চাকরি আর কোথায়! যাও এক-আধটা হচ্ছে, সেখানে চলছে লক্ষ লক্ষ টাকার খেলা, নয়তো হাত হতে হবে বিশাল লম্বা। সত্যি কথা বলতে কি, চাকরির কথা এখানে কেউ এখন আর ভাবতেই পারে না।

          কয়েকটি টিউশনি পড়িয়ে নিজের হাত খরচ আর মাঝে মধ্যে বাবাকে অসময়ে একটু-আধটু হেল্প করা–বেশ ভালোই চলছিল অঙ্কুশের। ভেবেছিল চাকরি না পেলে টিউশনি করে আর টুকটাক একটা ব্যবসা-ট্যাপসা করে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেবে।

         একসময় দেখলো টিউশনিটা প্রকৃত জীবন নয়। আজ আছে, কাল নেই। সেখানে কোনো ব্যক্তির স্বাধীনতাও থাকে না। তারপর মেঘাকে নিয়ে একটু পার্কে গিয়ে গল্পটল্প করবে সে সময়টুকুর‌ও অভাব হয় সেখানে। ফলে মেঘার সঙ্গে প্রায়শ‌ই মন কষাকষি লেগেই আছে। তার উপর যেখানে সেখানে ওকে নিয়ে বসে গল্প করাও যায় না। যদি কোনো ছাত্র-ছাত্রী দেখে ফেলে, তবে অপ্রস্তুতের মধ্যে পড়তে হয়। এককথায় প্রতি ক্ষেত্রে পা মেপে মেপে চলতে হয়। এই ঝঞ্ঝাটের জীবন‌ও তার কাছে দুর্বিষহ হয়ে ওঠে।

         অঙ্কুশের জীবন প্রবাহ এগিয়ে চলছিল আশা-দুরাশার বন্ধুর পথ ধরে। একদিন সে পরেও আসে ভয়ংকর বিপত্তি। মেঘার বাবা তার অফিসের এক কলিগের ভালো চাকরি করা ইঞ্জিনিয়ার ছেলের সঙ্গে তার বিয়ে দিতে চায়। বাবার কলিগ একদিন  তাদের বাড়িতে এলে মেঘাকে দেখে খুব পছন্দ হয়ে যায়। অফিসের অন্য এক কলিগকে দিয়ে তার প্রস্তাবটা বলায়। মেঘার বাবা মনে করে এই বাজারে এমন বনেদি পরিবারের এমন ভালো ছেলেকে হাতছাড়া করা মানে সোনার তার হাতে পেয়েও হারানো ছাড়া আর কিছুই নয়। অবশেষে হাত কচলাতে হবে।

       মেঘা  বিষয়টি জানতে পেরে পরের দিনই জরুরি ফোন করে ওদের দেখা করার পার্কে ডাকে অঙ্কুশকে। সমস্ত ঘটনা খুলে বলে। অঙ্কুশ যেন চোখে সর্ষেফুল দেখে। সমস্ত পৃথিবীটা যেন তার সামনে ভনভন করে ঘুরতে থাকে। কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। অবশেষে নিজেকে সামলে নিয়ে মেঘাকে শুধু বলে,’আমি তোকে মেসেজ করে দু’একদিনের মধ্যে সবকিছু জানিয়ে দেবো।’ একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস টেনে আর ছলছল চোখে এবং বুকভরা হতাশা নিয়ে মেঘা সেদিন চলে গিয়েছিল। ক্ষীণ আশাটুকু ধরে অপেক্ষা করছিল অঙ্কুশের মেসেজ আসার।

      সব দিক ভাবনা চিন্তা করে তিনদিনের মাথায় মেঘাকে মেসেজ লেখে। জীবন্ত হৃৎপিণ্ডটাকে উপড়ে ফেলার মতো তার এ মেসেজ। লেখে,’মেঘা, আমার বর্তমান যা পরিস্থিতি তাতে এই মুহুর্তে আমার মতো হতভাগা বেকার ছেলের পক্ষে তোকে বিয়ে করা ঠিক হবে না। যার জীবন তরী এখন ভাগ্যের পরিহাসের ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ নদীতে ডুবন্ত প্রায়, সেই তরীতে আমাদের দু’জনের ভার ব‌ইতে গিয়ে দু’জনেই অতল তলে তলিয়ে যাবো। তাই ভাবলাম, উৎসর্গ করবো আমার ভালোবাসাকে, যাতে তোর জীবনে সুখ-শান্তি-সমৃদ্ধির কোনো অভাব না ঘটে। তোর কাছে আমার সনির্বন্ধ অনুরোধ, আমার কথা বিস্মৃতির অতল তলে ফেলে নবীনকে বরণ করে নে। তুই এতে কোনোরকম আপত্তি করিস না। তোর সুখে থাকাটাই আমাকে শান্তি দেবে, বেঁচে থাকার নিঃশ্বাস যোগাবে। মনে মনে অহংকার বোধ করবো, ত্যাগেও জীবন ধন্য হয়। আশা করি তুই আমার এই অনুরোধ রাখবি আমার বেঁচে থাকার জন্য। যদি অন্যথা করিস, তাহলে বুঝবো তুই আমার মরণকে বেশি ভালোবাসিস। সেক্ষেত্রে তা বরণ করে নিতেও আমি কোনো দ্বিধা করবো না। শুধু এটুকুই জানি, আমি বেঁচে থাকবো তোর ভালোবাসাকে আঁকড়ে ধরে।‘   

      মেসেজটি সেন্ট হ‌ওয়ার পর অঙ্কুশ সিমটা খুলে ভেঙে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। পরে একটা নতুন সিম নেয় যার নম্বরটা মেঘাকে কোনোদিনই জানায় নি। দোলনায় দোল খেতে খেতে দড়ি ছিঁড়ে তলায় পড়ে গেলে যে অবস্থা হয়, অঙ্কুশের সেই অবস্থা এখন। নিজেকে শান্ত করে এই ভেবে, এই পৃথিবীতে আসা-‘যাওয়ার পথে তো আমরা সবাই একা। মাঝখানের ক’টাদিন একা না থাকার অভিনয় করে চলি।‘      

                                          (২)

     একদিন অঙ্কুশ সকালে উঠে একটা টিউশনি করতে চলে যায়। বাবা অনীশ একটা কারখানার সাধারণ শ্রমিক। তাকে শিপ্টিং ডিউটি করতে হয়। সেদিন ছিল তার মর্নিং শিফটে ডিউটি। তাই সে সকাল সকাল বেরিয়ে পড়ে। ঘন্টাখানেক বাসে করে আসার পর কারখানার সামনে গিয়ে দেখতে পায় গেটে সাসপেনশন অর্ডার ঝুলছে। মুহূর্তের মধ্যে মাথাটা ঘুরতে থাকে। হাল্কা হয়ে যায় শরীরটা। ব্লাক আউটের মতো সমগ্ৰ পৃথিবীটা অন্ধকার হয়ে আসে তার কাছে। পাশেই বটগাছের তলায় গিয়ে বাঁধানো শানের উপর বসে পড়ে। কিছুক্ষণ পর নিজেকে সামলে একটু ধাতস্থ হয়। ততক্ষণে কর্মচারীরা গেটের সামনে জমায়েত হয়ে গেছে। কিছুক্ষণ সকলে জিগির তুললো। অনীশ তাতে যোগ‌ও দিল। মিডিয়া এলো। প্রচার হলো খবরটা।    

     ক্লান্ত দেহে,বিষণ্ণ মনে  অনীশ যখন বাড়ি ফিরলো, রাত তখন প্রায় আটটা।  কারেন্ট চলে গেছে একটু আগে। চারদিক ঘোর অন্ধকার। সেই অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে মনের মধ্যে একরাশ অন্ধকার নিয়ে ফিরে আসে।  খবরটা টিভির দৌলতে ইতিমধ্যে বাড়িতে সবাই জেনে গেছে। তেমন কিছু ভারী খাবার অনীশের পেটে পড়েনি সারাদিন। খিদেটাও  মরে গেছে। মুখে তার কোনো কথা নেই। ভারবাহী মাথায় ভার বহনের সময় যেমন স্তব্ধ হয়ে যায়,তেমন‌ই নীরব সে আজ। চুপচাপ বসে পড়ে চেয়ারে।  কিছুক্ষণ পর হাতমুখ ধুয়ে সোজা বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ে। যাবার সময় স্ত্রীকে বলে যায়, ‘আমাকে আজ আর বিরক্ত করবে না কেউ।‘        

     কাল বেকার ছেলেকে নিয়ে বাড়িতে স্ত্রীর সঙ্গে এক পশলা বৃষ্টি হ‌ওয়ার মতো ঝগড়া হয়ে গেছে। আশা তাই আর কোনো কথা বাড়ায় নি।

     শুয়ে শুয়ে শুধু ভাবছিল, কীভাবে চালাবে তার এই সংসার তরী। বর্তমানে চাকরির যা অবস্থা, তাতে ছেলেরা বেকার থাকাটাই স্বাভাবিক। এইসব ভাবতে ভাবতে সারাদিনের ক্লান্তিতে কখন যেন চোখ বুজে আসে।স্বপ্ন দেখে। দেখে তার নৌকা মাঝ নদীতে ডুবে যাচ্ছে।সে জলে মধ্যে সাঁতার কাটছে কুলে যাবার জন্য। কিন্তু কোথাও কোনো কূলকিনারা  দেখতে পাচ্ছে না। শুধু জলের মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছে। ঘুম ভেঙে যায়। বিছানায় উঠে বসে। স্বপ্নের কথা ভাবতে ভাবতে এক গভীর নিস্তব্ধতায় লীন হয়ে যায়। রাতের অন্ধকার আরো ঘনকালো হয়ে ওঠে।

     মাঝরাতে অনীশের ঘর থেকে একটা গোঙানির আওয়াজ আসছিল। পাশে শুয়ে থাকা আশার ঘুম ভেঙে যায়। জেগে উঠে আলো জ্বালিয়ে দেখে স্বামীর হাত-পা-মুখ কেমন যেন বেঁকে যাচ্ছে। আতঙ্কে চিৎকার করে ছেলের নাম ধরে ডাকে। 

     মায়ের চিৎকারে অঙ্কুশের ঘুম ভেঙে যায়। দ্রুত ছুটে যায় বাবার ঘরে। বাবার অবস্থা দেখে অঙ্কুশ বুঝতে পারে, স্ট্রোক হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে একটা প্রাইভেট কার ডেকে এনে বাবাকে হসপিটালে নিয়ে যায়। মেজর অ্যাটাকের জন্য চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যেই ওর বাবা মারা যায়।

    বাবার শ্রাদ্ধ শান্তির কাজ করতে গিয়ে কিছুটা ধার দেনায় জড়িয়েও পড়েছিল ওরা। অঙ্কুশের অবস্থা এখন চরম ঝড়-জলে বিদ্ধস্ত কাকের মতো। একটা কাজ এখন ওর ভীষণ দরকার।

                                      (৩)       

    অঙ্কুশ একটা প্রতিষ্ঠানে কম্পিটিটিভ একজামের জন্য কোচিং নিতে যয়। সেখানে কয়েকজন ভালো বন্ধুও হয়। কোচিং সেন্টারের কিছুটা দূরে গঙ্গার পাড়ে একটা সুন্দর পার্কের মতো জায়গা আছে। একদিন ওরা ফেরার পথে সেখানে গিয়ে বসে গল্প করছিল। কেউ এটা ওটা নিয়ে নানা রকম ইয়ারকি মারছিল, আবার কখনও কেউ কেউ সিগারেটে ধরিয়ে তাতে সুখ টান দিচ্ছিল। অঙ্কুশকে চুপচাপ দেখে ছোটন বলে, ‘কিরে অঙ্কুশ, চুপচাপ কেন?’    

     ‘আর ভালো লাগছে নারে! কি যে করি ভেবে পাচ্ছি না। ‘অঙ্কুশ একটা হতাশার দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তারপর আবার বলে, ‘এতো পড়ে চাকরি কি আমরা সত্যি পাবো?’ হাতে তোলা পাথরের ছোট্ট টুকরোটা আলতোভাবে ছুঁড়ে মারে।  

     ‘সত্যি বলেছিস। বর্তমানে চাকরির যা অবস্থা!’তিলকের‌ও এক‌ই ধারণা।

     ‘আচ্ছা, আমরা যদি একটা শিক্ষিত ডাকাত দল তৈরি করি, কেমন হয়? ’সবাই ওর দিকে অবাক হয়ে তাকায়। ছোটন ওর হাতের ধরানো সিগারেটে টান দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে বল, ‘আরে আমাদের‌ও তো বাঁচতে হবে। তবে চুরি করবো তাদের‌ই যারা সাধারণ মানুষকে ঠকিয়ে সমাজে ধনী হয়েছে।‘

    ‘উচ্চ শিক্ষিত হয়ে এই চুরি করাটা আমাদের শোভা পায়?’ ঋষভ বিরোধীতা করে।      

    ‘আচ্ছা এখন তো রাজনীতি করলে মোটা টাকার মালিক হ‌ওয়া যায় দেখছি। তাহলে চল না আমরা একটা রাজনীতির দল‌ তৈরি করি।‘ ছোটন কথাগুলো বলে।

      ‘বর্তমানের পরিপ্রেক্ষিতে খারাপ না। তবে আমাদের দ্বারা এ কাজ বোধহয় হবে না?’অঙ্কুশ সংশয় প্রকাশ করে।

      ‘কেন হবে না?’ছোটন উষ্মা প্রকাশ করে।

      ‘কারণ বর্তমানে ক’জন উচ্চ শিক্ষিত মানুষ রাজনীতি করে বল তো? তুই বা আমি এখনকার নেতাদের মতো কাড়ি কাড়ি মিথ্যে কথাও বলতে পারবো না। তাছাড়া উন্নয়নের টাকা নয়ছয় হ‌ওয়া দেখে বিরোধিতা করলে বরং শত্রু বেড়ে যাবে।ফলে একদিন অকালে প্রাণটাও চলে যাবে।‘ঋষভ বিষয়টা বুঝিয়ে দেয়।

     ‘তবে ভাই, আমাকে এবার একটা কিছু করতেই হবে। বাবা মারা যাওয়ার পর অবস্থাটা বুঝতে পারছিস তো! মা যদি আমি থাকতে লোকের বাড়ি কাজে যায়, তবে আমার মতো হতভাগা ছেলেদের মরে যাওয়াই ভালো!’কথগুলো বলতে বলতে অঙ্কুশের চোখ দু’টো ছলছল করে ওঠে।

     সবাই চুপ হয়ে যায়। নিস্তব্ধতা ভেঙে ঋষভ বলে,’অঙ্কুশ, পাঁচ ছ হাজার টাকার একটা কাজ করবি?’ ঋষভ জানতে চায়

    অঙ্কুশ তাতেই সঙ্গে সঙ্গে রাজী হয়ে যায়। এরপর ওরা যে যার মতো বাড়ি ফিরে যায়। ঋষভ ওর দূর সম্পর্কের দাদার সঙ্গে অঙ্কুশকে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়ার পর একটা কোম্পানির শো-রুমে ছ’হাজার মাইনেতে একটা জব্ করছে। সঙ্গে দু’চারটে টিউশনি। সন্ধ্যের সময় ফিরে একটু বেশি পয়সা যারা দেয়,তাদের বাড়িতে গিয়ে তাদের ছেলেমেয়ে পড়িয়ে আসে।বেশ চলছে ওদের মা-ব্যাটার সংসার।      

                                 (৪)

     ‘কবে থেকে এই পেটে যন্ত্রণা আর বমি।’ডাক্তারবাবু জিজ্ঞাসা করে অঙ্কুশকে।

     ‘মাঝে মধ্যে একটু আধটু হতো। ওষুধ খেলেই আবার ঠিক হয়ে যেতো। কিন্তু আজ দুপুরে খাওয়ার পর বিকেল হ‌ওয়ার ঠিক আগে ওই পেটে ব্যাথা আর বমি। আজ বমির সঙ্গে একটু রক্ত আসতেই খুব টেনশন হচ্ছিল। তাই দেরি না করে আপনার কাছে নিয়ে এলাম। ‘অঙ্কুশ কারণটা বুঝিয়ে বলে।

     ‘শুনুন, নিজেরা কখনোই ডাক্তারি করবেন না। আর ওষুধের দোকানগুলোও হচ্ছে তেমন। কেউ কিছু গিয়ে বললেই ডাক্তারি করা শুরু করে দেয়। ‘রাগে সঙ্গে কথাগুলো বলেন। অঙ্কুশ চুপ করে থাকে। ডাক্তারবাবু মাথা নিচু করে প্রেসক্রিপশন লিখতে লিখতে বলেন, ‘এই ওষুধগুলো খাওয়াবেন। আর কিছু টেস্ট দেওয়া আছে, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব করে আনুন।‘ডাক্তারবাবু এবার মাথা তুলে অঙ্কুশের দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘আমার কিন্তু অবস্থাটা খুব একটা ভালো লাগছে না।‘ এরপর ওরা বেরিয়ে আসে।

     কয়েকদিন পর অঙ্কুশ মায়ের রিপোর্টগুলো নিয়ে একাই ডাক্তারের কাছে যায়। রিপোর্টগুলো ও একবার খুলে দেখে বিমর্ষ হয়ে যায়। ডাক্তারবাবু সেগুলো দেখে বলেন, ‘আমি যা সন্দেহ করেছিলাম তাই। মায়ের লিভার ক্যান্সার।‘

    অঙ্কুশ পাথরের মতো নিশ্চল হয়ে যায়। ডাক্তারের ডাকে হুঁশ হয়। চোখ জল গড়াতে থাকে। ডাক্তারবাবুকে শুধু বলে, ‘আমি কি নিয়ে বেঁচে থাকবো, ডাক্তারবাবু?’          

     ডাক্তারবাবু ওকে আশ্বাস দিয়ে বলেন, ‘অপারেশন করতে পারলে হয়তো ভালোও হয়ে যেতে পারে। তবে খুব তাড়াতাড়ি। দেরি হলেই কিন্তু বিপদ।‘ 

     ‘কেমন খরচ পড়বে, ডাক্তারবাবু’? অঙ্কুশ কৌতূহলের সঙ্গে জানতে চায়।

     ‘লাখ পাঁচ ছয় তো বটেই।‘   

     ‘লাখ পাঁচ ছয়!’অঙ্কুশের চোখে আর পলক পড়ে না। বোবা হয়ে যায় যেন।

      ডাক্তারের চেম্বার থেকে বেরিয়ে পথহারা পথিকের মতো উদ্দেশহীনভাবে এগিয়ে চলে। সারা রাস্তা সে ভাবতে থাকে,মাকে যেমন করেই হোক বাঁচাতে হবে।ওর জীবনের একমাত্র অবলম্বন এখন ওর মা। মাকে ও কিছুতেই হারাতে চায় না।

     বাড়ির কাছে আসতেই ও স্বাভাবিক হ‌ওয়ার চেষ্টা করে। মুখের মধ্যে একটা হাসি হাসি ভাব এনে দরজার সামনে গিয়ে কড়া নাড়ে।

     আশা ছেলের জন্য‌ই অপেক্ষা করছিল। কড়া নাড়ার শব্দ শুনতে পেয়েই আস্তে আস্তে এগিয়ে গিয়ে দরজা খোলে। অঙ্কুশ সোজা ঘরের মধ্যে ঢুকে যায়। দরজাটা তাড়াতাড়ি দিয়েই উদ্বিগ্নের সাথে ছেলেকে জিজ্ঞেস করে,’ডাক্তারবাবু কি বললেন, অঙ্কুশ?’ 

     থতমত খেয়ে যায় অঙ্কুশ। ভেবে পায়না মাকে কি বলবে। অবশেষে নিজেকে সামলে নিয়ে বলে,’তেমন কিছু নয়। একটা ছোট্ট অপারেশন করলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।‘ 

     ‘অপারেশন!সে তো অনেক টাকার ব্যাপার!’  

     ‘তোমাকে কতো ভাবতে হবে না। আমি আছি তো। সান্ত্বনার সুরে বলে অঙ্কুশ।

     কথাটা অঙ্কুশ জোর দিয়ে বললেও নিজেই জানে না কি হবে। ফোলা বেলুনের মধ্য দিয়ে হাওয়া বেরিয়ে গেলে যেমন চুপসে যায়, ওর বুকটাও তেমনি একটা চাপা সংশয়ে সঙ্কুচিত হয়ে গেলো।

     সারারাত শুয়ে শুয়ে অঙ্কুশ শুধু ভেবেছে, মাকে ওর বাঁচাতেই হবে। আবার সংশয়ে সঙ্কুচিত হয়ে ভেবেছে, এতো টাকা ও কী করে জোগাড় করবে। যে-সব আত্মীয় পরিজনের একটু পয়সা হয়েছে তারা অনেক আগেই ওদের সঙ্গে যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন করেছে। তবুও ও ঠিক করে প্রত্যেকের কাছে আর একবার গিয়ে করুনভাবে কিছু আর্থিক সাহায্য প্রার্থনা করবে।

    শেষপর্যন্ত অঙ্কুশ প্রায় ব্যর্থ হয়েই ফিরে আসে। অর্থের কথা শুনতেই নানা অছিলায় সবাই এড়িয়ে যায়। সেদিন থেকে অঙ্কুশের মনে হয়েছে, পয়সাই পরমাত্মীয়।

                                            (৫)        

     দিনটা ছিল শনিবার। অঙ্কুশ ওইদিন সন্ধ্যার পরে এক নামী ব্যবসায়ী সাধন সাহার বাড়িতে তার একমাত্র ছেলে বাবাইকে পড়াতে যায়।তার ছেলে একটা নামী ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ক্লাস সিক্সে পড়ে। মাসে অঙ্কুশকে পড়ানো বাবদ ভালো টিউশন ফি দেয়। এই টিউশনটা পেয়ে অঙ্কুশের সংসারটা মাকে নিয়ে ভালোই কেটে যাচ্ছিল।

     ‘জানেন স্যার আমাদের আবার আর একটা ফ্ল্যাট হবে। ‘বাবাই সরল মনে কথাটা বলে।

     অঙ্কুশ বাবাইকে খুব স্নেহ করে। সেই স্নেহের বশেই অঙ্কুশ বলে, ‘তোমাদের আরো দু’টো ফ্ল্যাট আছে না?’ 

      ‘হ্যাঁ। তবে এটা তো বাবা কোলকাতায় কিনবে।

     ‘তাই!’

      অঙ্কুশ ভাবে, যাদের আছে তাদের আরো হয়।আর যাদের নেই, যেটুকু থাকে তাও শেষ হয়ে যায়। কেন এই বৈষম্য? স্বর্গে, মর্ত্যে সর্বত্রই এই বৈষম্য অনন্তকাল ধরে চলছে। কেন… কেন… কেন…?

      উত্তর মেলে না।এ প্রশ্ন সমাজের দেওয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়ে শুধু ফিরে আসে।

     ‘আমি বড়ো হয়ে কোলকাতায় গিয়ে যখন পড়াশোনা করবো, তখন ওই ফ্ল্যাটে থাকবো।তাই আজ টাকা এনে ওই আলমারিতে রেখেছে।যারা ফ্ল্যাট তৈরি করছে তাদের নাকি দিতে হবে।তাই কাল বাবা যাবে টাকাটা দিতে।‘অবলীলায় বাবাই কচিমনে কথাগুলো বলে যায় যা ও ওর বাবা মায়ের আলোচনার সময় শুনেছিল।

     বাবাই আবার খাতায় মন দেয় কিছু লেখার জন্য। অঙ্কুশ ভাবে, এদের অনেক আছে: তবুও আরো চায়। আসলে চাওয়ার কোনো শেষ নেই।আর আমি মাকে বাঁচানোর জন্য কতজনের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছি দুটো পয়সার জন্য। বিনিময়ে কোথাও পেয়েছি মধুর ভাষণে বিতাড়ন, কোথাও কারুণ্যভরা প্রত্যাখ্যান। চুপ করে এই সাতপাঁচ ভাবতে থাকে।

     ‘স্যার…’খাতার উপরে নিচু করা মাথা তুলে বাবাই ডাকে।

     ‘হ্যুঁ, বলো।‘থতমত খেয়ে সোজা হয়ে সাড়া দেয় অঙ্কুশ।

     ‘এখানে কোন্ প্রেপজিশনটা বসবে?’বাবাই জানতে চায়।

     অঙ্কুশ উত্তরটা বলে দিয়ে আবার ভাবে,মা-ই এখন আমার সব। কতো কষ্ট করে আমাকে মানুষ করেছে। অথচ তাকে আমি… না না, যেমন করেই হোক মাকে বাঁচাতে হবে।‘চেয়ারে হেলান দেওয়া শরীরটাকে সোজা করে বসে। একবার বাবাই-এর দিকে তাকায়। আবার গালে হাত দিয়ে ভাবে–‘এদের অনেক আছে।এই অথৈ ভান্ডার থেকে যদি এতোটুকুও আমি পেতাম, তাহলে হয়তো আমার মা বেঁচে যেত।‘

     দরজা খোলার আওয়াজে অঙ্কুশের হুঁস ফেরে। সেদিকে তাকাতেই দেখে,বাবাই-এর মা চা হাতে এগিয়ে আসছে। চায়ের প্লেটটা টেবিলে রাখতেই উর্মিলাদেবী বলেন,’স্যার বাবাইকে আজকে একটু ঘন্টা খানেক পড়িয়ে ছেড়ে দিতে হবে।ওর এক বন্ধুর বার্থডে পার্টিতে যেতে হবে।‘

     ‘ঠিক আছে।‘অঙ্কুশ মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়।

     এরপর উর্মিলাদেবী অঙ্কুশের ডানদিকের দেয়াল সংলগ্ন আলমারি খুলে তার নিজের ও ছেলের এক সেট করে ভালো ড্রেস নিয়ে চলে যান। যেতে যেতে বলেন,’আমি রেডি হয়ে গেলে আপনাকে বলে যাবো।‘

     ‘আচ্ছা।‘

     তাড়াহুড়োর জন্য উর্মিলাদেবী আলমারির চাবি দিতে ভুলে যান। অঙ্কুশের চোখ সেদিকে পড়তেই ও আবার কিছু একটা ভাবনায় নিমগ্ন হয়ে যায়।

     ‘স্যার…’আবার বাবাইয়ের ডাক।

     ‘হ্যাঁ বল।‘

    একটু ওয়াশরুমে যাবো?’

    ‘হ্যাঁ যাও।‘অঙ্কুশ অনুমতি দেয়।

    হাত দু’টো মাথার পিছনে দিয়ে চেয়ারে হেলান দিয়ে ঘাড়টা ঘোরাতেই চোখ দু’টো আবার চলে যায় আলমারির দিকে। ভেজানো পাল্লায় চাবির গোছা ঝুলছে। অঙ্কুশ এবার ঘামতে শুরু করে। উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে। চেয়ারের মধ্যেই একবার এদিক, একবার ওদিক ঘোরে। মনটা বড়ো ছটফট করতে থাকে। উঠে দাঁড়ায়।পা বাড়ায়। আবার এসে চেয়ারে বসে।

   ‘আসছি স্যার।‘বাবাই অনুমতি চায়।

   ‘এসো।‘কথাটা বলতে গিয়ে অঙ্কুশের গলাটা একটু কেঁপে ওঠে।

   অঙ্কুশ ওর সলভড করা খাতা দৈখে দেয়। বাবাই এরপর ওর হোম টাস্ক বুঝে নিচ্ছিল। ইতিমধ্যে উর্মিলাদেবী আবার ঘরে ঢোকেন এবং বাবাইকে ছেড়ে দিতে বলেন। সেই সময় তিনি চাবি দিতে ভুলে যাওয়া আলমারি বন্ধ করে চাবি নিয়ে চলে যান।

                                     (৬)

     অঙ্কুশ কয়েকদিন হলো মাকে দেখাশোনা করার জন্য মাসিকে এনে রেখেছে। মাসিও খুব গরীব। একমাত্র মেয়েকে কষ্ট করে বি.এ.পাশ করিয়ে বছর খানেক হলো বিয়ে দিয়েছে। তবে মাসি তার সাধ্যমতো  অল্প কিছু সাহায্য করেছে অঙ্কুশকে।

    পরের দিন সকাল সকাল মাকে হসপিটালে নিয়ে যাবার গাড়ি এসে হাজির। অঙ্কুশ গতরাতেই গাড়ির ব্যবস্থা করে রেখেছিল। মা আর মাসিকে গাড়িতে তুলে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। যেতে যেতে অঙ্কুশ উদাস হয়ে আনমনে জানলা দিয়ে তাকিয়ে থাকে অনন্ত আকাশের দিকে।

    হঠাৎ ওর উদাসী মনটা এক বিকট শব্দের আওয়াজে কেঁপে ওঠে। ড্রাইভারকে বলতে শোনা যায়,’যাঃ! টায়ার পাংচার হয়ে গেল। এতো করে বলি একটা টায়ার কিনতে কিছুতেই কিনবে না। এভাবে গ্যাটিস দিয়ে কতোদিন আর চালানো যায়।‘

    কথাগুলো বলতে বলতে গাড়িটাকে রাস্তার একপাশে দাঁড় করিয়ে স্টেপনিটা লাগানোর জন্য ড্রাইভার নামে। অঙ্কুশ‌ও নেমে তাকে হেল্প করায় কাজটা তাড়াতাড়ি হয়। গাড়ি আবার চলতে শুরু করে। 

     বেলা দশটা নাগাদ ওদের গাড়ি ঠাকুর পুকুর ক্যান্সার হাসপাতালের সামনে এসে দাঁড়ায়। অঙ্কুশ গাড়ি থেকে নেমে সোজা রেজিস্ট্রারের অফিসে চলে যায়। মাসিকে বলে যায় মাকে নিয়ে ওয়েটিং রুমে অপেক্ষা করতে।নাম রেজিস্ট্রেশন করে গাড়িওয়ালাকে ভাড়া মিটিয়ে ছেড়ে দেয়। এগারোটা নাগাদ ডাক্তার দেখেন। আগের সমস্ত রিপোর্টগুলো দেখে আরো কিছু রুটিন চেকআপ করাতে বলেন।ক্যাশ কাউন্টারে চেক-আপের বিল জমা করে একদিনের মধ্যেই সব করে নেয়।

     প্রথম দিন ডাক্তার রিপোর্টগুলো দেখে ইমিডিয়েট অপারেশন করার কথা বলেন। তারপর কেমো নেবার পালা  

        ‘এই মুহূর্তে আমাকে কি করতে হবে ডাক্তারবাবু!’কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করে অঙ্কুশ। কুয়াশাচ্ছন্ন সাগরের মধ্যে বসে কূলকিনারা দেখতে না পাওয়া অসহায় মাঝির যে অবস্থা হয়, অঙ্কুশেরও সেই অবস্থা।

      ‘খরচ আছে। এই মুহূর্তে লাখ তিনেক টাকা ক্যাশ কাউন্টারে জমা করে দিন। অপারেশন, কেমো, ওষুধপত্র নিয়ে প্রচুর খরচা। এছাড়া আরো কিছু টাকা পয়সা নিয়ে রেডি থাকুন। কখন কি লাগবে বলা তো যায় না। ডাক্তারবাবু নির্দ্বিধায় বলে যান।

      অঙ্কুশ শিউরে ওঠে। তারপর ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসে। ক্যাশ কাউন্টারে গিয়ে কিছু টাকা জমা করে মাকে ভর্তি করে দেয়।

      পরের দিন বারোটায় অপারেশন হয়। তবে রোগীর অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। ডাক্তারবাবু বেরিয়ে যাবার সময় ভগবানকে ডাকতে বলে যান।

      মায়ের কাছে মাসি আছে। মাসিকে বলে রেখেছিলো আজ বিকেলের দিকে একবার বাড়িতে যাবে।যে-সব বন্ধুরা কিছু করে টাকা ধার দেওয়ার কথা বলেছে, তাই আনতে। বিকেল চারটায় অঙ্কুশকে  হসপিটালর অফিসে ডেকে পাঠানো হয়। অঙ্কুশ আসে। একজন ভদ্রলোক তাকে জিজ্ঞেস করে,’আপনি সাধন সাহার ছেলেকে পড়ান?’

       ‘হ্যাঁ।‘কম্পিত গলায় অঙ্কুশ উত্তর দেয়।  

      এরপর অঙ্কুশ আর ভদ্রলোকের মধ্যে কিছু কথোপকথন হয় এবং মাসির কাছে মায়ের দায়িত্ব দিয়ে আগামী কাল ফিরে আসার কথা বলে অঙ্কুশ বেরিয়ে যায় ভদ্রলোকের সঙ্গে।

    অঙ্কুশকে থানায় আনা হয় সাধন সাহার টাকা চুরির অপরাধে। পরের দিন রবিবার পড়ায় ওকে কোর্টে প্রডিউস করা যায় নি।তাই আগামী পরশু অর্থাৎ সোমবার কোর্টে তোলা হবে।

     ওই দিনই ওর মায়ের কেমো দেওয়া শুরু হবে। অঙ্কুশ না আসায় আশা খুব ভেঙে পড়ে। মাসিও বেশ চিন্তিত। তবে দিদির সামনে তার বহিঃপ্রকাশ ঘটায় না। বরং সান্ত্বনা দিয়ে বলে,’আমি আছি তো। ও হয়তো কোথাও কোনো কাজে আটকে গেছে। বিকেলের দিকে ঠিক চলে আসবে। চিন্তা করিস না কতো।‘  

     বেলা দু’টো। অঙ্কুশকে এজলাসে তোলা হয়। খোঁচা খোঁচা কালো দাড়িতে ছেয়ে গেছে গাল দু’টো। মুখখানা ঝোড়ো হাওয়ায় বিদ্ধস্ত কাকের মতো। চোখ দু’টো রাতজাগা নাবিকের মতো লালচে। পাগলের মতো উস্কো-খুস্কো চুল। ছুটতে ছুটতে বড়ো ক্লান্ত।

    অঙ্কুশ জজসাহেবের  সামনে তার টাকা চুরির অপরাধের কথা স্বীকার করে এবং সবটা চুরি না করে কেন মাত্র তিন লাখ টাকা চুরি করে তার কারণ‌ও অকপটে বলে যায়।

    অঙ্কুশের কথা শুনে জজসাহেব যেন কি একটা গভীরভাবে ভাবছেন। তারপর প্রথা ভেঙে তিনি মানবিক হয়ে অঙ্কুশকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘তোমার মা এখন কেমন আছেন?’

     ‘জানি না স্যার!’

     ‘ওর মা আজ বেলা বারোটা নাগাদ কেমো নিতে গিয়ে মারা যান।‘সরকার পক্ষের উকিল দাঁড়িয়ে কথাটা বলেন।

    খবরটা পুলিশের কাছ থেকে উকিলবাবু জানতে পারেন। পুলিশ অঙ্কুশকে নিয়ে আসার সময় ওর সীজ করা মোবাইলে মাসির কাছ আসা ফোনের মাধ্যমে খবরটি পায়।

   অঙ্কুশ কান্নায় ভেঙে পড়ে। কাঁদতে কাঁদতে শুধু বলতে থাকে, ‘আমি চুরি করতে চাই নি জজসাহেব। আমি আর পাঁচটা সাধারণ মানুষের মতো খেয়ে পড়ে বাঁচতে চেয়েছিলাম। কিন্তু এই সমাজ আর মেকি সমাজসেবীর দল আমাকে চোর বানিয়ে দিল। আমার মা-বাবা অনেক কষ্ট করে আমাকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করেছে। কিন্তু এরা আমাকে একটা কাজ দিল না। জানি মৃত্যুকে আটকানো যায় না; কিন্তু আমার কাছে যদি চেষ্টা করার অর্থ থাকতো, তাহলে কি আমি চুরি করতাম?’  

    অঙ্কুশ মাথা নীচু করে ঘন ঘন লম্বা শ্বাস নিতে থাকে। চোখ দিয়ে অনর্গল জল ঝরছে। এজলাস নীরব নিস্তব্ধ। নিস্তব্ধতা ভাঙে অঙ্কুশের কথায়, ‘আমার আর কেউ র‌ইলো না জজসাহেব। আমার বেঁচে থাকার কোনো মানে হয় না। আমাকে মায়ের কাছে যাবার ব্যবস্থা করে দিন।‘

    এজলাসের মধ্যে একটা থমথমে ভাব। অঙ্কুশ দিশাহীন। একবার মাথা তুলে তাকায়। তারপর এজলাস থেকে বেরিয়ে রেলিং থেকে ঝাঁপ দেয়। হৈচৈয়ে মুখর হয়ে ওঠে আদালত চত্বর। জজসাহেব গালে হাত দিয়ে তখন‌ও নীরব। 

    সুন্দরবনের গহন অরণ্যে আগুন লেগেছে। সেই আগুন দুর্বার গতিতে ছুটে আসছে সমস্ত কিছুকে পুড়িয়ে ছারখার করে দেবার জন্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *