দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে

আনোয়ার হোসেন, বাংলাদেশ ##

-মতিঝিলের রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে বাঘ!!!

বিজ্ঞানী রিয়েল আব্দুল্লাহ’র মনে হলো তিনি স্বপ্ন দেখছেন। এইমাত্র তিনি ভয়ংকর প্রানঘাতী করোনা ভাইরাসের সফল প্রতিষেধক আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছেন। দীর্ঘ অনেক দিন পর। এইডস্‌ রোগের প্রতিষেধক হিসেবেও কাজ করবে এই ঔষধ। বলা হয়েছিল এক থেকে দেড় বছরের মধ্যে আবিষ্কার হয়ে যাবে করোনা ভাইরাসের প্রতিষেধক। আমেরিকা চিন আর রাশিয়ার বিজ্ঞানীরা নাকি এর টিকা আবিষ্কার করে ফেলেছেন। সফল পরীক্ষাও নাকি চালিয়েছিলেন তারা। কিন্তু তা হয়নি। ঐ টিকা কিছুটা কাজ করলেও আরো শক্তিশালী হয়ে এক বছর পর ফিরে আসে করোনা ভাইরাস। আগে শীত প্রধান দেশে প্রকোপ বেশি থাকলেও এবার ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বব্যাপী। আফ্রিকার দরিদ্র দেশগুলো হয়ে পড়ে বিরানভূমি। মহা শক্তিশালী আমেরিকা, চিন, রাশিয়া আর ইসরায়েলে যেন হামলা করেছে নিজে আজরাইল। সবারই দিশেহারা অবস্থা। রিয়েল আব্দুল্লাহ’র মনে হলো কিছু একটা করা দরকার। কিছুদিন আগেই ময়মনসিংহের ত্রিশালের কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি শেষ করে বিদেশী একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে প্রধান  বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হিসেবে অবিশ্বাস্য মোটা বেতনের চাকুরি নিয়েছেন তিনি। মতিঝিলে অফিস, শাপলা চত্তরের পাশেই। ভাইরাস প্রতিরোধের জন্য সবাইকে দীর্ঘ সময়ের জন্য ঘরে থাকার অনুরোধ জানিয়েছিলেন তিনি। সরকারের কাছেও আবেদন করেছিলেন। বিনামূল্যে ইন্টারনেট ব্যবহারের প্রযুক্তি আবিষ্কার করে ইতিমধ্যে বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত তিনি। তাছাড়া বেশ কটি গবেষনা আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সাময়িকিতে প্রকাশিত হওয়ার ফলে তার কথার একটা ওজন আছে। সরকারও তাই সারা দেশ লক ডাউন করে সবাইকে ঘরে থাকার নির্দেশ জারী করে। তবে তা যে কাজ করেনি সেটা সে চোখের সামনেই দেখতে পাচ্ছে। নইলে মতিঝিলে বাঘ দেখার কথা না। নাকি স্বপ্ন দেখছে সে? না স্বপ্ন নয়। সারা ঢাকা শহর বিশাল বিশাল গাছপালার জঙ্গল হয়ে গেছে। দৌড়ে ফ্ল্যাটের ভেতরে গেলো সে। কম্পিউটার অন করাই আছে। নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম একাউন্টগুলো অন করল সে। ও মাই গড! কোন একটিভ আইডি নেই! আমেরিকা, চীন আর জাপানে তার বন্ধুদের প্রোফাইল চেক করল সে। না, সব প্রোফাইলই দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে মৃত। পৃথিবীর সব মানুষই কি শেষ হয়ে গেছে ডাইনোসরদের মতো? মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লেন তিনি। সরকার লক ডাউন ঘোষনা করার পর থেকে নিজের বায়োরোধী কক্ষ থেকে বের হননি তিনি। তার ফ্ল্যাটটাকে একটা অক্সিজেন চেম্বার বলা চলে। বাইরের বাতাস পরিশোধন করে এখানে প্রবেশ করানো হয়। তিন কক্ষের ফ্ল্যাটের ভেতরেই ডাইনিং কিচেন, টয়লেট, ড্রয়িংরুম, লিভিংরুম আর তার গবেষনাগার। খাবার মজুত করাই ছিল। প্যাকেটজাত খাবার। গরম করো আর খাও। একা মানুষ তিনি। বিয়ে করেননি। ভেবেছিলেন করোনা ভাইরাসের প্রতিষেধকটা আবিষ্কার করা শেষ করে বিয়ে করে ফেলবেন তিনি। গবেষনা কমিয়ে দেবেন। কারন, সব বউই চায় স্বামী তাকে নিয়েই গবেষনা করুক। আবিষ্কার করুক তাকে। গিনিপিগের মতো খেলা করুক তাকে নিয়ে। মেয়েও পছন্দ করা ছিল। 

একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আবার বাইরে বেড়িয়ে আসলেন তিনি।

বাঘটা এখনও আছে। একা নয়, সাথে চার চারটে সুন্দর তুলতুলে বাচ্চা। তাকে দেখে মা আর ছানা বাঘ কিছুক্ষন অবাক চোখে তাকিয়ে রইল। যেন কোন অদ্ভুত প্রানী দেখছে। তারপর বিরক্ত হয়ে একটা গলিতে ঢুকে পড়ল। নিজের মোটর সাইকেলটা বের করলেন তিনি। ফুয়েল আর ইঞ্জিনটা একবার চেক করলেন। সব ঠিক আছে। বেড়িয়ে পড়লেন রাস্তায়। মোটর সাইকেল চালাতেও সমস্যা হচ্ছে। রাস্তা ফুরে মাঝ রাস্তায় জন্ম নিয়েছে গাছপালা আর ঝোপঝাড়। বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় সেদিকে চোখ ফেরালেন। বিশাল মাঠ এখন ঘন জঙ্গল। প্রবেশপথে একপাল গরু ছাগল ঘাস খাচ্ছে। রাস্তায় নির্ভয়ে হেটে চলেছে হাস মুরগি! পাখিদের কিচির মিচির শব্দে কান পাতা দায়। হাতিরঝিলে এসে দেখে এলাহী কারখানা। মাছ আর মাছ। বিশাল বিশাল মাছ পানিতে মুখ ভাসিয়ে শ্বাস নিচ্ছে। আর পাখিদের মেলা বসেছে যেনো। কত্ত রং বেরঙের পাখি! এগিয়ে যেতে থাকল সে। কোথাও কোন মানুষের চিহ্ন নেই। রাস্তার উপর এখানে সেখানে পড়ে আছে মানুষের কঙ্কাল আর হাড়গোড়।

-বাবা গো!

দ্রুত মোটর সাইকেল নিয়ে একপাশে সরে গেল সে। মহাখালী চৌরাস্তায় আইসিডিডিআর এর সামনে আসতেই গেট দিয়ে দৌড়ে বের হলো একপাল হরিণ। একেবারে হঠাৎ করে তার সামনে এসে পড়ল। পাশে সরে না গেলে তার উপর দিয়েই যেতো হরিণের পাল। আইসিডিডিআর-এর ভেতরে হরিণ! এয়ারপোর্ট এসে কি মনে করে ভেতরে প্রবেশ করল সে। সবগুলো প্রবেশপথই খোলা। থাকারই কথা। কেউ নেই। ঘন জঙ্গলে ছেয়ে গেছে পুরো বিমানবন্ধর এলাকা। ভয় পেয়ে গেলো সে। এখানে হিংস্র কোন প্রানী থাকা অসম্ভব নয়। বলতে না বলতেই বেরিয়ে এলো একজোড়া হাতি। নড়াচড়া বন্ধ করে চুপচাপ দাড়িয়ে রইল সে। হেলতে দুলতে হাতি দুটো চলে গেল। সাহস করে আরেকটু ভেতরে প্রবেশ করল সে। বিমানের হ্যাঙারের দিকে এগিয়ে গেল। বিশাল বিশাল বোয়িং বিমানগুলো পড়ে আছে অতিকায় প্রানীর মতো। একটার ভেতরে উকিঁ দিলো সে। 

-আউচ!

উড়ে এসে মুখে খামচি দিলো কি যেনো। মুরগী! আরে এ তো দেখছি মুরগীর খোয়াড়! মোটর সাইকেলের ফুয়েল শেষ হওয়ার আগেই ফিরে যেতে হবে। উল্টো পথ ধরল সে। মগ বাজার চৌরাস্তায় এসে দেখে রাস্তায় শুয়ে রোদ পোহাচ্ছে বিশাল এক অজগর সাপ! মৌচাকে মৌমাছির ক্ষেত যেনো। এখানে সেখানে মৌচাক। যেনো মধুর চাষ করা হয়েছে। নিজের বাসার সামনে এসে থামল সে। ক্লান্ত। একটা মানুষেরও অস্তিত্ব খুজে পায়নি সে পুরো ঢাকা শহর জুড়ে।  

পিপিই খুলে ছুড়ে ফেলে ফেলে দিলো সে। নিজেকে জীবানুমুক্ত না করেই প্রবেশ করল ফ্ল্যাটে। সর্তকতার কোন প্রয়োজন নেই আর। মানুষ বেচেঁ থাকে মানুষের জন্য। আপনজনের জন্য। আপনজন তো দূরের কথা কোন মানুষই বেচেঁ নেই পৃথিবীতে। একা একা বাচাঁ যায় না। বাচাঁর কোন অর্থ হয়না। বেচেঁ থাকার ইচ্ছেটাই মরে গেছে তার। তাই সর্তকতারও প্রয়োজনবোধ করছে না। 

সেলফোনের ভাইব্রেশনে থরথর করে কেপেঁ উঠল টেবিলটা। দৌড়ে গিয়ে ছো মেরে তুলে নিলো সে ফোনটা। মুখটা উজ্জল হয়ে উঠল। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটা ভিডিওবার্তা এসেছে। একটা মেয়ে। বিশ বাইশের বেশি হবে না বয়স। মুখটা দেখে মনে হচ্ছে ভীষন ভয় পেয়েছে সে। মেয়েটা সুন্দরী। লম্বা কালো চুল। নিষ্পাপ চেহারা। 

“হ্যালো! আমি এ্যামি বলছি নিউ ইর্য়ক থেকে। কেউ যদি আমার এই ভিডিও বার্তা দেখে থাকেন প্লিজ সাড়া দিন। গত পাচঁ বছর ধরে চেষ্ঠা করছি আমি। কোন মানুষের সাড়া পাইনি। কেউ কি বেচেঁ আছেন?”

আনন্দে নাচতে ইচ্ছে করছে বিজ্ঞানীর। যাক একজন মানুষ অন্তত বেচেঁ আছে পৃথিবীতে। 

-হ্যালো, আমি রিয়েল। বাংলাদেশ থেকে বলছি।

-রিয়েল? রিয়েলি?

-হ্যা।

-আমার খুব ভয় করছে।

-কেন?

-আমরা দুজন ছাড়া কেউ বেচেঁ নেই। কত বছর বাইরে যাই না আমি। জানিনা বাইরে কি অবস্থা।

-সাবধান বাইরে বের হবে না। আমি আসছি।

-তুমি আসবে? কিভাবে?

-যেভাবেই হোক আমি আসব।

-আচ্ছা। আমি তোমার অপেক্ষায় থাকব। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *