বাংলা গানের ভাষা নির্মানে লোকাভরণ শৈলী : প্রসঙ্গ ভাস্কর বসুর গান

পার্থসারথি সরকার, গড়িয়া, কলকাতা

##

সাহিত্যক্ষেত্রে যখন সার্থকভাবে লোকজীবন হতে আহৃত লোকউপাদানকে ব্যবহার করা হয়, তখন সে নির্মানশৈলী সাহিত্যের একটি বিশেষ অঙ্গ হয়ে ওঠে। এই আহৃত লোকউপাদানটিকে তখন আর কোন প্রকারেই আলাদা করা যায় না। বাক্যের বিন্যাস, পদের ব্যবহার কিংবা ভাবাণ্বয়ের নানা ক্ষেত্রেই এই উপাদানগুলি সরাসরি সার্থকভাবে মিশে যেতে পারে। তবে এই সার্থকভাবে মিশে যাওয়ার ক্ষেত্রটি অবশ্যই কোন কবি বা সাহিত্যিকের স্ব-রচনাশৈলীর একটি বৈশিষ্ট্য। প্রায়োগিক দিকের এই সার্থকতার মধ্যে দিয়েই লোকউপাদান আপন স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেও নির্মিত নব সাহিত্যকে সার্থকতা প্রদান করে।

লোক উপাদান সার্থকভাবে সাহিত্যের মধ্য অঙ্গীভূত হবে, এটাই হবে লোকাভরণ শৈলীর মূল কথা। আর এখানেই সে অলংকারের বহিরঙ্গ বিষয়কে পরিহার করতে পারে। এই লোকাভরণের ক্ষেত্রে তা কোন সময় মূল রচনার সঙ্গে শৈলীগতভাবে অণ্বিত হয় না, আর অনেকক্ষেত্রে মূল রচনার সঙ্গে কি রচনার সঙ্গে অণ্বিত হয়ে যায়।

সমগ্র বিশ্বসাহিত্য পর্যালোচনা করলে এই লোকাভরণ শৈলীর একটি সুষ্ঠু প্রায়োগিক দিকের রেখাচিত্র ফুটে উঠতে দেখা যায়। বাংলা সাহিত্যও এর অন্যথা নয়। বাংলা সাহিত্যের প্রতিটি শাখাতেই লোকাভরণ শৈলীর কমবেশী প্রয়োগ দেখতে পাওয়া যায়। স্বাভাবিকভাবে লোকসাহিত্যের ছড়া, প্রবাদ-প্রবাচন, ধাঁধা ইত্যাদিও লোকাভরণের লোকউপাদান হিসাবে পরিগনিত হয়। আবার লোকসংস্কার, লোককাহিনি, লোকগীতি, লোকধর্ম, লোকক্রিয়া ইত্যাদি নানা বিষয় সাহিত্যের রচনাশৈলীর উপাদান হিসাবে ধরা দেয়। বাংলা গানের হাজার বছরের ইতিহাসে এর অন্যথা হয়নি। চর্যাপদ থেকে শুরু করে মধ্যযুগের সাহিত্যের বড় একটা অংশ, এমনকি পাশ্চাত্য অভিঘাতে উদ্ভূত বানিজ্য শহর কলকাতাতেও প্রথমযুগে যে নানা ধারার গান, ফিল্মের গান, গণসংগীত ইত্যাদিতেও লোকাভরণ শৈলী এসেছে অনিবার্যভাবে। রবীন্দ্র-নজরুল-দ্বিজেন্দ্রলাল-রজনীকান্ত-অতুলপ্রসাদ এই পঞ্চকবি কিংবা শতাব্দী প্রথমার্ধের যে রেকর্ডিংয়ের যুগ, সেখানে ভাষা শৈলী নির্মানে অনিবার্যভাবে এসে পড়েছিলন। এঁদের মধ্যে মুখ্যত রবীন্দ্রনাথ এবং তার পরবর্তীতে নজরুলের সবচেয়ে বেশি প্রভাব রয়ে গেছে।

লোকাভরণ শৈলীর সার্থক প্রকাশ ঘটে গেছে রবীন্দ্রনাথের লেখনীর মধ্যে দিয়েই। রবীন্দ্রনাথ লোকসংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতি যে কতটা আস্থাশীল ছিলেন, তা তাঁর লোকায়ত ছড়া সংগ্রহ, লোকসাহিত্যের উপর প্রবন্ধ রচনা এবং তাঁর রচনায় লোকাভরণ শৈলীর ব্যবহার সে সাক্ষই বহন করে। তাঁর এই ধারাকে বয়ে নিয়ে সমৃদ্ধ  হয়েছে বাংলা গানের ধারাও। সেখানে প্রণব রায়, হীরেন বসু থেকে শুরু করে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার, অভিজিৎ মজুমদার, অনল চট্টোপাধ্যায় এ সবাইয়ের নামই এসে যায়।

পাশাপাশি আরো একটি নাম গুরুত্ব সহকারে আলোচনা করার অপেক্ষা রাখে, তিনি অরুণকুমার বসু, যিনি ভাস্কর বসু নামে খ্যাত। সাহিত্যের প্রতি তাঁর অনুরাগ ছিল। প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশুনোও করেছিলেন বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে। পরে তিনি অধ্যাপনার কাজে নিযুক্ত হন। গণনাট্য আন্দোলনের সঙ্গে বেশ কিছুদিন যুক্ত ছিলেন তিনি। প্রখ্যাত গীতিকার সলিল চৌধুরীর সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্ক থাকায় এ ব্যাপারে তিনি উৎসাহী হয়ে পড়েছিলেন অবশ্যম্ভাবীভাবে।

সংগীত রচনার ক্ষেত্রে প্রেরণা যোগালেও লোকাভরণ শৈলীর আঙ্গিককে সার্থকভাবে আপন গীতিরচনায় ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ভাস্কর বসুর মৌলিকত্ব অনস্বীকার্য। সমালোচক সমীর গুপ্তের অনুসরণ করলে বলা যায়, এ ব্যপারে ভাস্কর বসুই সলিল চৌধুরীর রচনার একাংশে পথপ্রদর্শকের ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন—

“সলিলদা সম্পর্কে ভাস্কর বসুর (অরুণদা) কাকা আবার মামাও। কিশোর অরুণদা একটি কবিতা লিখে সলিলদাকে পড়ে শোনান। সলিলদা খুশি হয়ে কবিতাটিতে সুর দিয়েছিলেন। কবিতাটির মুখের কথা রবীন্দ্রনাথের কবিতার মতো, ‘বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর নদেয় এলো বান’। গানটি হীরালাল সরখেলের কন্ঠে রেকর্ড করা হয়, বেশ জনপ্রিয়তাও পায়অরুণদার গানটা সুর দেবার পর সলিলদাও নিজে প্রচলিত কথা বসিয়ে ‘আয় বৃষ্টি ঝেঁপে, ধান দেব মেপে’ গানটি রচনা করেন।”

সমালোচকের মতামত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তবে ‘কবিতাটির মুখের কথা রবীন্দ্রনাথের কবিতার মতো’-কথাটি যথোপযুক্ত নয়। রবীন্দ্রনাথের ‘বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর নদেয় এলো বান’-নামে ছড়াটি আদপেই লোকসাহিত্যের একটি বৃহৎ অংশ লোকছড়ার ভেঙে গড়ে তোলা একটি কবিতা। এখানে রাবীন্দ্রিক ঘরানায় সার্থকভাবে লোকাভরণের ব্যবহার লক্ষ করা গেছে। আর সেই কবিতার সঙ্গে যে সাযুজ্য এখানে দেখা গেছে তা লোকাভরণ শৈলীর নিরিখে, কোন রবীন্দ্র কবিতার ভাবনা কিংবা ঢংয়ে নয়।

তবে সার্বিক গীতির ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ যে আসেননি তা নয়। রবীন্দ্রনাথের ‘ঔই জানালার কাছে বসে আছে করতলে রাখি মাথা’-কে সামনে রেখে তিনি গীতি রচনা করেন—

“খোলা জানালার ধারে মাথা রেখে কত শিশির পড়েছে কবরীতে

কেন ঊষার আলোকে মিশে আমি আহা পারিনি তোমায় ডেকে নিতে।”

সমগ্র জীবনে ভাস্কর বসুর রচিত গানের সংখ্যা খুব বেশি নয়। তবে যে গানগুলি রচনা করেছিলেন তার অধিকাংশতেই লোকাভরণ শৈলীর ব্যবহার অত্যন্ত সূচারুরূপে সম্পন্ন হয়েছে। তাঁর গানে লোকছড়া ব্যবহৃত হয়েছে শিল্পের পরিপূর্তির ক্ষেত্রে। কোনস্থানে গ্রামবাংলার মেয়েদের মর্মন্তুদ কাহিনি লোকছড়ার মাধ্যমে রূপলাভ করেছে, কোথাও আশাহত ব্যর্থতার ছবি হিসাবে উপস্থিত হয়েছে, আবার কোথাও দেশভাগজাত যন্ত্রণার ছবি লোকছড়ার মধ্যে দিয়ে ফুটে উঠেছে।

সাতচল্লিশের খন্ডিত স্বাধীনতা সাধারণ মানুষের মনে যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া নিয়ে এসেছিল, তা বিশেষ সন্ধান করার প্রয়োজন রাখে না। এপার গঙ্গা ওপার গঙ্গা সমগ্র বাংলার ছবি তাঁর গানের মধ্যে অপরূপ ব্যথায় ম্রিয়মাণ হয়ে আছে। লোকছড়া ‘এপার গঙ্গা ওপার গঙ্গা মধ্যিখানে চর/ তার মাঝে বসে আছে শিব সদাগর’-কে অবলম্বন করে তিনি রূপদান করলেন তাঁর গানে—

“এপারে গঙ্গা ওপারে গঙ্গা মধ্যিখানে চর

সোনার বরণ বধূ এসে প্রদীপখানি ভাসিয়ে গেল স্রোতে থরথর।

কোন অতীতের কালো বুকে মনে তো আর নাই

সেই মেয়েটির হারানো মুখ খুঁজে তো না পাই

সেই বধূটির সুখে ছাওয়া একটুখানি ঘর

ভেসে গেল অথৈ গাঙে স্রোতে থরথর।”

এ প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে ভাস্কর বসু নিজেই বলেন—

“দেশভাগের কঠিন রক্তাক্ত ইতিহাস আর গ্রাম ছাড়ার করুণ আর্তনাদ ফোটাবার জন্য ছড়ার ভাঙ্গাচোরা চরণ নিয়ে একটা গান লিখে দিয়েছিলাম সুধীনদার খাতায়। একদিন সেটাতে ভারি কান্নাভেজা সুর বসিয়ে দিয়েছিলেন সুধীনদা, আর তেমনি ক্রন্দনমধুর কন্ঠে গেয়ে উঠেছিলেন প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়—কী জানি আজ কারও মনে আছে কি নেই…”

“উঠো উঠো মা গৌরী হিমানি আর নাই” গানটি বাঙালির ঘরের কন্যাদের একটি বিষাদের ছবিকে ফুটিয়ে তুলেছে। গানটি সম্বন্ধে বলতে গিয়ে ভাস্কর বসু বলেন—

ঠিক এমনি ধরণের (বিদেশিনী কাদের রাণী পালকি চড়ে চলেছে) ছড়ামিল লিরিক, ঈষৎ গ্রাম্য শ্যামল শোভা-মাখানো। বাঙালি ঘরের বিয়ের পর কন্যা-বিদায়ের চিরন্তন ছবিটিও আমার কথায় আর সুধীন দাশগুপ্তের সম্পূর্ণ স্বদেশীয় সুরে কী আশ্চর্য অনবদ্য গান হয়ে আছে শ্রোতার কানে। গীতা দত্তের অমলিন কন্ঠে বাঁধা এর প্রতিটি উচ্চারণ :

উঠো উঠো মা গৌরী/ হিমানি আর নাই

সোনামতী রাঙা রোদে/ গাঙ সিনানে যাই।

গৌরী গৌরী ফিরে চাও,/ ঘাটে এল সপ্ত নাও।।

হলুদবরণ গৌরী যাবে/ বরণদোলায় চড়ে

সিঁদুরে চন্দনে মুখে/ রাঙা রোদ পড়ে।

কত বহুড়ি কত ঝিউড়ি/ শঙ্খ বাজালো

গৌরী যাবে অনেক দূরে/ আকাশ করে আলো।

গৌরী গৌরী ফিরে চাও,/ ঘাটে এল সপ্ত নাও।

এই পর্যন্ত লেখার পর সুধীনদা বললেন, মায়ের মুখে কিছু কথাটথা বসাও। আমি লিখলাম :

এত কালের মাটি তোমায়/ অন্ন দিল তুলে,

তারে তুমি মনে রেখো/ যেয়ো না ভুলে… ”

গানটির আদ্যন্ত যে বাংলার ব্রত ভেঙে নির্মিত হয়েছে, সে সম্বন্ধে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। বাংলার ব্রতগুলিকে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর দুটি ভাগে ভাগ করেছেন। প্রথমটি হল শাস্ত্রীয় ব্রত এবং দ্বিতীয়টি হল মেয়েলি ব্রত। এই মেয়েলি ব্রতটি আবার দুই ভাগে বিভক্ত—কুমারী ব্রত এবং নারী ব্রত। কুমারী ব্রতের মধ্যে ব্রতের আদি রূপটি পাওয়া যায়। অনেক ব্রত ছোট ও অপ্রধান বলে শাস্ত্রের হাত থেকে বেঁচে গিয়ে অনেকটা অটুট অবস্থায় রয়ে গেছে। এর মধ্যে ব্রতের খাঁটি নিখুত চেহারাটি পাওয়া যায়। এমন একটি ব্রত হল ‘তোষলা ব্রত’। যা ‘তুঁষতুষলি’ নামে খ্যাত। সেখানে পাওয়া যায়—

  “তোষলা গো রাঈ, তোমার দৌলতে আমরা ছ-বুড়ি পিঠে খাই,

                ছ-বুড়ি ন-বুড়ি, গাঙ্‌ সিনানে যাই, গাঙের বালিগুলি দুহাতে মোড়াই;”

এবং এই ব্রততেই স্নান সমাপনে সূর্যোদয় বর্ণনা করে ছড়াতে পাওয়া যায়—

“রায় উঠেছেন অন্নে, তামার হাঁড়ির বর্ণে,

                তামার হাঁড়ি, তামার বেড়ি—

                উঠ উঠ মা-গৌরী নিবেদন করি।”

“উঠো উঠো মা গৌরী” গানটির শেষে আছে—“গৌরী গৌরী ফিরে চাও,/ ঘাটে এল সপ্ত নাও।”

আর ‘ভাদুলি’ ব্রততে আছে—

“পুঁটি! পুঁটি! উঠে চা।

                ভাদুলি মায়ে বর দিল।

                ঘাটে এল সপ্ত না’।”

এই রকম ব্রতের ছড়া ভেঙে তৈরী আরও একটি গান হল “উঠ উঠ সূরযাই ঝিকিমিকি দিয়া” গানটি। ‘ভাদুলি’ ব্রতে মেয়েরা সূর্যকে আবাহন করছে, আর সুর্যের মুখে বসানো হয়েছে তার প্রত্যুত্তর—

“মেয়েরা।       উঠ উঠ সূর্যঠকুর ঝিকিমিকি দিয়া।

সূর্য।            না উঠিতে পারি আমি ইয়লের লাগিয়া।”

আর এখানে সেই মেয়েটির কামনা যেন আরও বেদনা বিধুর হয়ে উঠেছে, হয়তো প্রেক্ষিত বদলে গেছে বলেই-

“উঠ উঠ সূরযাই ঝিকিমিকি দিয়া

                তোমারে পুজিব আমি বনফুল দিয়া।

                হিমানী নাগিনী রাতি যাবে গো চলিয়া…

                ঝলমল হাসিতে কি ডাকিল সূরযাই

                আমি যে কিশোরী মেয়ে কোন নাম নাই…

                আমি তোমারে দিয়েছি প্রাণ দিয়াছি এ হিয়া।”

আর এই গানকেই সামনে রেখেই বোধহয় গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার পরবর্তীতে রচনা করেছিলেন- “ওঠ ওঠ সূরযাই রে ঝিকিমিকি দিয়া’, যা লতা মঙ্গেশকরের কন্ঠে অত্যন্ত জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল।

পূর্বে উল্লেখিত ‘বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর’- লোকছড়া ভেঙে এক অপূর্ব নির্মাণ। লোকছড়ায় উল্লেখিত তিন কন্যা রাঁধা-বাড়া, খাওয়া এবং গোঁসা করে বাপের বাড়ি যাওয়া আজকের দিনের প্রেক্ষিতে ঠিক মেলে না। আজকের দিনে সোনার ধান ভেসে যায়, বাসা ভেঙে যায়, আর—

“আমার ঘরের কন্যা কাঁদে তার কেমনে হয় আহার যোগান।”

আসলে সলিল চৌধুরীর সান্নিধ্য তাঁকে গণসংগীতের প্রতি আগ্রহান্বিত করেছিল। সলিল চৌধুরী তাঁর গণসংগীতে অজস্র লোকছড়ার ভাঙ্গা-গড়ার খেলায় মেতেছিলেন। ভাস্কর বসু এই গানটিতে সেই গণসংগীতের আদর্শের পাশাপাশি লোকছড়ার অসাধারণ সন্নিবেশ ঘটিয়েছিলেন।

আবার “সজলপুরের কাজল মেয়ে”-গানটির মধ্যেও ভাস্কর বসু বাঙালি জীবনের এক বেদনাবিধুর ছবি ফুটিয়ে তুলেছেন। লোকছড়া “নোটন নোটন পায়রাগুলি ঝোটন বেঁধেছে”—থেকে এই কবিতাটির নবনির্বাণ ঘটেছে। গানটির মধ্যে সেই ভাঙ্গা-গড়ার কিছু নিদর্শণ—

  “সজলপুরের কাজল মেয়ে নাইতে নেমেছে

                চিকন চিকন চুলগুলি সে ঝাড়তে লেগেছে। …

                কে দেখেছে রাজার কুমার চলতে দেখেছে

                রাজার কুমার চলেছিল পলাশ-দিঘি দিয়ে

                আজও কুমারের ধূলা খেলা কাল কুমারের বিয়ে…

                সজলপুরের কাজল মেয়ে নাইতে এসেছে

                নোটন নোটন পায়রাগুলি ঝোটন বেঁধেছে।”১০

‘চন্দ্রকলা বরণমালা’ –গানটিও লোকাভরণ শৈলীতে অনবদ্য হয়ে উঠেছে। সেখানে “দোল দোল দুলুনি রাঙা মাথায় চিরুনি”, “কুঁচবরণ কন্যা তোমার মেঘবরণ কেশ” ইত্যাদি ছড়াগুলোকে মনে করিয়ে দেয়—

“চন্দ্রকলা বরণমালা দোলায় চেপে যায়

                আর রাঙা মাথায় চিরুনি মন রূপেতে ভোলায়

                তাধিনা ধিন তালে মাদল বাজে ঐ

                রূপসাগরে ডুব দিয়ে কার আনন্দ থৈ থৈ…

                তার চাঁদ মুখে চাঁদের আলো সারা নিশি জাগে

                মেঘ দেখি না কেশ দেখি তার নয়নে ঘোর লাগে…”১১

‘যমুনাবতী সরস্বতী’- গানটিও লোকাভরণ শৈলীর মোড়কে বর্তমান কঠোর বাস্তবেরই প্রতিনিধিত্ব করেছে। ধূলাখেলা ফেলে কত যমুনাই তো চলে গেছে, যারা ফেরেনি কখনও—

   “যমুনাবতী সরস্বতী কাল যমুনা লীলাবতী

                কাজিতলার ঘাটে বাঁধা যমুনাবতীর না’

                ঘর করে আঁধার বালা কোন বিদেশে যাও

                যমুনা খেলেধূলা ছাড়া এবার মাথায় সিঁদুর দাও…

 

                যমুনাবতী সরস্বতী কাল যমুনার বিয়ে

                কত যমুনা গেল চলে কাজিতলা দিয়ে…

                এ পারেতে রইল জেগে কাজিতলার গাঁও

                আধেক রাতে স্মরণ কোরো ব্যথা যদি পাও…”১২

লোকাভরণ শৈলী বাঙলা আধুনিক গানের ক্ষেত্রে একটি বিশেষ দিকের বার্তাবাহী। বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে যে গানের রেকর্ডিংয়ের শুরু, তৎপরবর্তী ক্ষেত্রে সেই বাঙলা গান ক্রমশই পল্লবিত হয়েছে। তৈরী হয়েছে নতুন প্রকরণ। তথাপি তার অনেকখানিই লোকাভরণকে আশ্রয় করে। তা সে গণসংগীত কিংবা আধুনিক তা যাই হোক না কেন। আর এ ধারায় ভাস্কর বসু এমনই একজন ব্যক্তিত্ব যিনি বাঙলা গানের অবয়ব নির্মাণে লোকাভরণ শৈলীর সার্থক প্রয়োগ ঘটিয়েছেন। যার মধ্যে দিয়ে ঐতিহ্য এবং আধুনিকতা একসঙ্গে পথ চলেছে, যা পথ দেখিয়েছে পরবর্তী গীতিকারদের। ভাস্কর বসুর কৃতিত্ব এইখানেই।

 

 

তথ্যসূত্রঃ

১. সলিল চৌধুরীর প্রথম জীবন ও গণসংগীত, সমীরকুমার গুপ্ত, মিলেমিশে, কলকাতা ৫৪, বৈশাখ ১৪১৮, পৃ. ১০১-১০২।

২. শারদীয়া আজকাল ১৮১৫, ‘এ পারে আমি ও পারে তুমি মধ্যে বয় উজান’, অরুণকুমার বসু, পৃ.৪৪৮।

৩. তদেব।

৪. তদেব, পৃ ৪৪৯।

৫ বাংলার ব্রত, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিশ্বভারতী, কলকাতা ৬,অগ্রহায়ণ ১৪১২, পৃ ৩৪।

৬. তদেব, পৃ ৩৫।

৭. তদেব, পৃ ৪৩।

৮. তদেব, পৃ ৫১।

৯. ছোট্ট পাখি চন্দনা, আলপনা বন্দ্যোপাধ্যায়, সা রে গা মা, CDNF 142470

১০. চার দশকের বাঙলা গান, অরুণ সেন ও গোপালকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়, প্রকাশ ভারতী কলিকাতা-০৪, প্রথম প্রকাশ মে ১৯৭৪ পৃ.২০৬।

১১. ছোট্ট পাখি চন্দনা, আলপনা বন্দ্যোপাধ্যায়, সা রে গা মা, CDNF 142470

১২. তদেব।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *