বিস্মৃতির অতলে রাধানগর

শুভজিৎ দত্ত, আগরপাড়া, উত্তর ২৪ পরগনা ##

ভারতের ‘প্রথম আধুনিক মানব’ রাজর্ষি রামমোহন রায় ‘ভারত পথিক’ হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন। গর্বের বিষয় হলো এই  প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিটি জন্মগ্রহন করেছিলেন কলকাতা শহরতলি থেকে মাত্র ঘন্টা কয়েক দূরে হুগলীর খানাকুল-রাধানগর গ্রামে। এই গ্রাম এবং তার পার্শ্ববর্তী রঘুনাথপুর গ্রামে তাঁর স্মৃতি বিজড়িত অসংখ্য নিদর্শন আজও বর্তমান। আমার সৌভাগ্য হয়েছিল কিছুটা সময় সেই গৌরবের ইতিহাসকে আলিঙ্গন করার, ইতিহাসের সোঁদা গন্ধ মাখার। ২২ শে মে ছিলো রামমোহন রায়ের জন্মজয়ন্তী। যে মানুষটি ছিলেন আধুনিক চিন্তা ভাবনার রূপকার,যাঁর সংগ্রাম ছিলো নারীদের জীবন রক্ষা ও সম্মান প্রতিষ্ঠার জন্য,এবং যিনি রক্ষণশীলতা ও গোঁড়ামির ঘোরতর বিরোধী ছিলেন,সেই মহান মানুষটির স্মৃতিকে গভীরভাবে উপলব্ধি করতে কয়েকমাস আগে বেড়িয়ে পড়েছিলাম খানাকুল-রাধানগরের উদ্দেশ্যে।

বালি থেকে তারকেশ্বর লোকাল করে তারকেশ্বর স্টেশনে নেমে বাসে চেপে রওনা দিয়েছিলাম রাধানগরের উদ্দেশ্যে।চারিদিকে গ্রামের সৌন্দর্য  দর্শন করতে করতে ঘন্টাখানেকের পথ পেরিয়ে অবশেষে নামলাম রাধানগরে।আমার গন্তব্য এই ‘রাধানগর’ যেখানে আছে রামমোহন রায়ের আদি বাড়ি বা ‘রামমোহন মেমোরিয়াল’ এবং এখান থেকে ১.৫ কিমি দূরের গ্রাম রঘুনাথপুর। বাস থেকে নেমে প্রথমেই  পৌঁছেছিলাম রঘুনাথপুর গ্রামে যেখানে আছে রামমোহন রায়ের পৈতৃক কাছারি বাড়ি এবং অনতিদূরেই তাঁর বসতভিটে। তার সাথেই আছে সেই পবিত্র স্থান যেখানে তিনি সতীদাহ প্রথা রদ করার জন্য শপথ নিয়েছিলেন।বইয়ের পাতায় যেটুকু আমরা জানতে পারি তার থেকে বহুগুন বেশী ইতিহাস ওখানের পরতে পরতে মিশে আছে, সেদিন ওখানকার বাতাস‌ও যেন ফিসফিসিয়ে অজানা ইতিহাসের গল্প বলে যাচ্ছিল আমায়। তবে ওনার আদি পুরুষেরা কিভাবে এই খানাকুল রাধানগর ও রঘুনাথপুর গ্রামে  এলেন সেইসব ইতিহাস জানতে গেলে আমাদের পিছিয়ে যেতে হবে প্রায় কয়েকশ বছর।

রামমোহন রায়ের প্রপিতামহ শ্রীযুক্ত কৃষ্ণচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর বাসস্থান স্থানান্তরিত করে এই রাধানগর গ্রামে এসে উপস্থিত হয়েছিলেন। তাঁদের আসল পদবী ছিল বন্দ্যোপাধ্যায়  এবং আদি বাসস্থান ছিল মুর্শিদাবাদের শাঁকসা অঞ্চলে। সেইসময় খানাকুল-কৃষ্ণনগর অঞ্চলের জমিদার ছিলেন অনন্তরাম চৌধুরী। তিনি নবাবকে প্রাপ্য খাজনা ও কর দিতে অস্বীকার করেন।তাই মুর্শিদাবাদের নবাব তার কর্মচারী ভবানন্দ রায়কে দায়িত্ব দেন একজন সুযোগ্য সাহসী মানুষের খোঁজ করার যিনি অনন্তরামকে শায়েস্তা করে উচিৎ শিক্ষা দিতে সক্ষম। নবাবের কথামতো ভবানন্দ তাঁরই জ্ঞাতি আত্মীয় কৃষ্ণচন্দ্রকে সমস্ত কথা জানান। তখন কৃষ্ণচন্দ্র শাঁকসা থেকে গোঘাট হয়ে রাধানগর যাত্রা করেন। সেখানে অনন্তরামকে তিনি তলোয়ার যুদ্ধে পরাস্ত করেন ও তাকে পিছমোড়া করে নবাবের দরবারে পাঠিয়ে দেন। এই অঞ্চলে ওনারা তখন ‘শিকদার’ নামে পরিচিত ছিলেন। অতঃপর সাহসিকতার পরিচয় দেওয়ার জন্য  কৃষ্ণচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়কে মুর্শিদাবাদের নবাবই ‘রায় রায়ান’ উপাধিতে ভূষিত করেন। এভাবেই রাধানগরে রায় বংশের সূচনা হয় ও বসবাস স্থাপন হয়।

কৃষ্ণচন্দ্র রায় জমিদারি পেলেন ঠিকই কিন্তু রাধানগর ছিলো খুব ছোট জায়গা। আবার রামমোহনের পিতা রামকান্ত রায়েরা ছিলেন সাত ভাই।যখন রামকান্ত দেখলেন এই ছোট্ট গ্রাম সাত ভাইয়ের বসবাসের পুরোপুরি উপযুক্ত নয় তখন তাঁরা ১.৫ কিমি দূরেই রঘুনাথপুরে একশত বিঘা জমি কিনলেন। এবং ওখানেই রাজাদের ন্যায় বাড়ি,সেরেস্তা,নায়েবের ঘর,কাছারি বাড়ি তৈরি করলেন।ওই জায়গায় বিশাল বহর আমবাগান,পুকুর সবই তাঁদেরই নির্মিত। পরবর্তীকালে রামকান্ত তাঁর জেষ্ঠ্যপুত্র জগমোহন রায় ও বড় নাতি গোবিন্দপ্রসাদকে রঘুনাথপুরের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি লিখে দিয়েছিলেন ; এবং মধ্যমপুত্র রামমোহন রায় ও কনিষ্ঠ পুত্রকে রাধানগরের সমগ্র সম্পত্তির মালিক হিসাবে নির্বাচন করেছিলেন।এভাবেই এই এলাকায় রায় বংশ প্রভাব বিস্তার করেছিল।

রামমোহন ছিলেন কুলীন হিন্দু ধর্মের বিরোধী। সনাতন হিন্দু ধর্ম নিয়ে রামমোহনের ক্রমাগত মতবিবাদ শুরু হয় পিতা রামকান্তর সঙ্গে। সমাজসংস্কার,জাতিভেদ প্রথা না মানা,সতীদাহ প্রথার বিরোধিতা ইত্যাদি নিয়ে পিতা-পুত্র দ্বন্দ্ব যখন চরম শিখরে, রামকান্ত বিরক্ত হয়ে রামমোহনকে ত্যাজ্যপুত্র করে দেন,ফলে তাকে রাধানগরের জন্মভিটে ছেড়ে দিতে হয়।তখন বর্ধমান,হুগলীর সকল জমিদারী ছিল বর্ধমানের রাজাদের অধীনে। এমতাবস্থায় অসহায় রামমোহন বর্ধমানরাজের কাছে একটু আশ্রয়স্থান প্রার্থনা করেন। তখন বর্ধমানরাজ রামমোহনকে রঘুনাথপুরে অশোকতলা শ্মশানভূমি জায়গাটি দান করেন। অতঃপর তিনি ওখানে একটি বসতবাড়ি তৈরি করেন,ও নিজ পরিবারকে নিয়ে সেখানেই বসবাস শুরু করেছিলেন।

এই হল রঘুনাথপুর ও এই রাধানগরের ছোট্ট ইতিহাস। এই সব কথা ভাবতে ভাবতেই এসে দাঁড়িয়েছিলাম রঘুনাথপুরের সেই বেদীর কাছে যেখানে তিনি প্রথম সতীদাহ প্রথা রদ করার সংকল্প নিয়েছিলেন। এখানে দাঁড়িয়ে আবারও পিছিয়ে গেলাম কয়েকশ বছর। রামমোহন রায়  প্রথম জীবনে ইংরেজদের অধীনে চাকরী করতেন। যখন তিনি  অবিভক্ত বাংলার রংপুরে পোস্টিং ছিলেন,তখনই কিন্তু রঘুনাথপুরে ওনার অজান্তেই ঘটে যায় এক চরম বিপত্তি। তাঁর বড়বৌঠান জগমোহন রায়ের স্ত্রী অলোকমঞ্জুরী দেবীকে ইচ্ছার বিরুদ্ধে সতীদাহ প্রথার বলি হতে হয়। যে বৌঠান তাকে মাতৃস্নেহে ভালোবাসত,সেই বৌঠানকে তৎকালীন কুলীন ব্রাহ্মণ নিয়মের জন্য স্বামীর মৃত্যুর কারণে ভাঙ খাইয়ে অচেতন অবস্থায় একই চিতায় দাহ করা হয়েছিল। রামমোহন রায় এখবর পেয়ে যত শীঘ্র সম্ভব গ্রামে ফিরে  আসেন কিন্তু  ততক্ষনে সতীদাহ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়ে যায়। তখন তিনি সেই নিভে যাওয়া চিতার সামনে যান এবং সেই চিতাভস্ম স্পর্শ করে  প্রতিজ্ঞা করেন যে সমাজের বুক থেকে অমানবিক ‘সতীদাহ প্রথা’ বন্ধ করবেনই যাতে আর এরপর থেকে কোনো মেয়েকে সহমরণের নামে এক কদর্য মৃত্যুবরণ করতে না হয়, এবং তার এই লড়াইয়ের  ফলস্বরূপ ১৮২৯ সালে ব্রিটিশসরকার সারাভারতে এই সতীদাহ প্রথা নিষিদ্ধ করেন।বর্তমানে এই পবিত্র স্থানটিতে রামমোহন রায় স্মৃতি রক্ষা কমিটি একটি বেদী ও রামমোহনের মূর্তি স্থাপন করেছেন।এই বেদীটি বর্তমানে ‘সতী বেদী’ নামে পরিচিত।বাঙালি হিসেবে গর্বিত হচ্ছিলাম যে এরকম একটা ঐতিহাসিক স্থানে আজ দাঁড়িয়ে আছি।শুধু খারাপ লাগল এটা দেখে  কালের গ্রাসে রাধানগর গ্রামে ওনাদের পৈতৃক  বাড়িটির আজ শুধু ধ্বংসাবশেষ পড়ে আছে এবং রঘুনাথপুরের এই পুরো ঐতিহাসিক আমবাগান চত্বরটিই বর্তমানে হুগলি জেলা পরিষদের অধীনে ‘রামমোহন রায় বসতবাটি পর্যটন কেন্দ্র’ নামে পরিচিত। কিন্তু এরকম ঐতিহাসিক স্থানে যেরকম পিকনিক পার্টির ডিজের যা দৌরাত্ম্য দেখলাম তাতে মনটা বেশ খারাপই লাগল। 

রঘুনাথপুর থেকে এবার ১.৫ কিমি হেঁটে চলে আসি রাধানগর। এখানেই ‘রামমোহন স্মৃতি মন্দির’ বা রামমোহনের জন্মস্থান এবং পৈতৃক বাড়ি।ওখানে যাওয়ার পরই সৌভাগ্যক্রমে আলাপ করার সুযোগ হয় রামমোহন রায়ের দৌহিত্রের বংশধর নিত্যব্রত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে। ওঁর মাধ্যমেই অনেক অজানা কথা জানতে পারি এবং উনিই আমাদের পুরো বাড়িটা ঘুরিয়ে দেখান। জানা যায় ১৮৫৯ সালে রেভারেন্ড জেমস্ লং রামমোহনের জন্মস্থানটি চিহ্নিত করেছিলেন। সেই স্থানে বর্তমানে একটা বেদী তৈরি করা হয়েছে। একসময়  এই বাড়িটিও ধূলিসাৎ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু পবিত্র এই বাড়িটিকে ১৯১৬ সালে ব্রাহ্ম সমাজের বিশিষ্ট উদ্যোক্তাগণ যেমন বিজেন্দ্রনাথ পাল, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রমুখ রামমোহনের স্মৃতি রক্ষার্থে উদ্যোগী হন এবং ‘রামমোহন স্মৃতিমন্দির’ তৈরি করেছিলেন। এখানে স্মৃতি সৌধটির নকশা স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এঁকেছিলেন এবং ভিত্তিপ্রস্থর স্থাপন করেছিলেন হেমলতা ঠাকুর, যিনি রামমোহন রায়ের জ্যেষ্ঠ পুত্র রাধাপ্রসাদের দৌহিত্রের কন্যা ও ঠাকুরবাড়ির বধূ ছিলেন। ১৯১৭-১৮ সাল নাগাদ সহৃদয় ব্যক্তিবর্গদের দানে ও সহযোগিতায় বাড়িটি তৈরি হয়। এই স্মৃতিমন্দিরের একটি লক্ষ্যণীয় বৈশিষ্ট্য হলো যে বাড়িটি মন্দির, মসজিদ ও গির্জার সমন্বয়ে স্থাপিত। কিন্তু ১৯৪৪ সালে রক্ষণাবেক্ষণ-এ নিযুক্ত ঠিকাদারকে চুক্তি অনুযায়ী প্রাপ্য পাওনা না দিতে পারায় বাড়িটি নিলাম হয়ে যায়। তখন রাধানগরে ‘রামমোহন স্মৃতি রক্ষা কমিটি’ গঠিত হয়। সেই কমিটির সম্পাদক স্যার যতীন্দ্রনাথ বসু সম্পূর্ণ নিজ ব্যয়ে একলক্ষ টাকা দিয়ে পুনরায় বাড়িটি কিনে নেন, এবং পরবর্তীকালে হুগলী জিলা পরিষদকে এটি হস্তান্তর করেন ও উপযুক্ত দেখভালের জন্য আবেদন জানান। সেই থেকে এখনও এই বাড়িটি হুগলি জেলা পরিষদের অধীনেই আছে, এবং এই বাড়ির ভিতরে ছবির মাধ্যমে রাজা রামমোহনের জীবনের নানা অধ্যায় তুলে ধরা হয়েছে। তবে রামমোহন মেমোরিয়ালের নবতম সংযোজন হলো রায়বংশেরই একজন সদস্য  ব্রিস্টলে রামমোহনের সমাধিস্থল থেকে মাটি এনেছিলেন ও এখানে ব্রিস্টলের ন্যায় একটি স্মৃতিবেদী প্রতিষ্ঠা করেন।

এইরকম একটা ঐতিহাসিক স্থানে ইতিহাস, স্থাপত্য মিলেমিশে অভূতপূর্ব পরিবেশ তৈরি করেছে। তবে আমার মতে জায়গাটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব  কমেছে। স্বল্পমূল্য  টিকিটের বিনিময়ে রঘুনাথপুরে ‘রাজা রামমোহন রায় বসতবাটি পর্যটন কেন্দ্র’ এ প্রবেশের পর পিকনিক পার্টির অপসাংষ্কৃতিক আচরণ এমন পূন‍্যতোয়া জায়গাটির অবমাননা করে,যা যথেষ্ট দৃষ্টিকটু এবং অন‍্যায়। এব্যাপারে স্থানীয় কমিটির কঠোর দৃষ্টিপাতের প্রয়োজন। তবে সবশেষে বলব শান্ত, নিরিবিলি পরিবেশে রামমোহন রায় ও তাঁর স্মৃতিগুলি পুরোনো ইতিহাসের সাক্ষ্যবহনের দরুন কোথাও একটা আমার আবেগকেও নাড়া দিচ্ছিল, মন বারংবার পেন্ডুলামের ন‍্যায় দোদুল্যমান ছিলো একবার ইতিহাসে এবং একবার বর্তমানে। ওই পূন‍্যভূমি ছেড়ে আসার সময় বারেবারে মনে হচ্ছিল আমরা বাংলার মানুষেরা যেন যুগে যুগে রাজা রামমোহন রায়ের মত এমন লড়াকু উন্নতশীর ও মুক্ত চেতনা, বাগ্মী ও সহমর্মী মন এবং জীবনদর্শনকে আমাদের চেতনায় ধারণ করে বাংলাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *