ময়না

রাণা চট্টোপাধ্যায়, বর্ধমান

 

“নিকুচি করেছে সংসারের! চুলোয় যাক। “কত্ত সহজে বাবার বলে যাওয়া কথাগুলো শুনে আড়চোখে তাকিয়ে আবার দুলে দুলে পড়তে লাগলো ক্লাস টুয়ে ওঠা দুলকি। ছোটো থেকে পড়াশোনার প্রতি অগাধ ভালোবাসা এই এক রত্তি মেয়েটার। বই পেলেই দুলে দুলে এতো সুন্দর পড়তে থাকে, তাই দাদু নতুন নাম দিয়েছিল দুলকি।  কিন্তু এই ছিঁটে বেড়ার অভাবী ঘরে যেখানে বিছানায় শুয়ে চাঁদ দেখা যায়, ছাদের চাল ফুটো দিয়ে সেখানে যে, পড়াশোনা বিলাসিতা এটা বুঝেও মেয়েকে বাহবা, সাহস জুগিয়ে যায় নাছোড়বান্দা ময়না।

দাদুর কাঁধে চেপে প্রথম যেদিন দুলকি স্কুলে গেছিলো, আহা কি দারুন না লাগছিল মেয়েটাকে। চোখে কাজল, কপালে টিকা দিয়ে অন্নপূর্ণার চাতালে মাথা ঠুকে তবে ছেড়েছিলো মেয়ের হাত। দীর্ঘশ্বাস নিয়ে  মনে মনে বলেছিল, “ঠাকুর মেয়েটাকে তুমি দেখো, আমার মতো ফাটা কপাল যেনো না হয় ওর”!

গ্রামের এই গোটা দশেক দুলে বাউরির ঝুপড়ি ঘর নিয়ে গড়ে ওঠা এই গরীব গুর্বো মানুষগুলোর কাছে, পরম ভরসা এই মা অন্নপূর্ণার থান। লাল শালুতে মোড়া একটা গাছ আর এক টুকরো সিঁদুর মাখা শিলাখণ্ডকে মনের কথা উজাড় করেও শান্তি। এই তল্লাটের  মরদগুলো, কোনো কম্মের নয়, দিন রাত ছাইপাস চোলাই খেয়ে শুধুই  হম্বিতম্বি!

ময়নার সুখের ঘরেও  সিঁদ কাটে এভাবে। শ্বশুর বাপটা ছিলো তাই রক্ষে, কিন্তু একদিন ঝড়-জলের বিকালে কোথায় যে সে হারিয়ে গেলো, আর ফিরলো না! জনে জনে দুলকি আর ময়না খোঁজ নিয়েছিলো। একদিন ও পাড়ার বিশে, খবর দিয়েছিল এক পাগলা ষাঁড়ের গুঁতোতে নাকি বুড়ো অক্কা পেয়েছে! রাত বিরেতে দূর গ্রামে যাত্রাপালা দেখে ফেরার খুব সখ ছিলো কিনা মানুষটার। ময়না বুঝে উঠতে পারে না, আর যাই হোক নিজের বাপ বলে কথা, তবু কিনা কোনো হেল দোল হয়নি সোয়ামিটার! আসে যায় আর লাল চোখ করে গন্ডেপিন্ডে গেলে। যদি কোনদিন নেশা চড়লো তো মাঝ রাতে ময়নার শরীরটাকে ক্ষেপা কুকুরের মতো ভোগ করেই লটকে পড়ে!

 

খুব মনে পড়ে সেই ছোটো বেলার কথা ময়নার। এই আজকের শ্বশুর বাপটা, নারকেল কাঠির ঝাঁটা বিক্রি করতে যেতো ওদের গ্রামে। ক্লান্ত হয়ে পেছনের দাওয়াতে বিশ্রাম নিতো কখনো কেমন। সেই থেকে চাচা বলেই  ডেকে আসতো ময়না।  একদিন, রোদে পুড়ে আসা মানুষটাকে, একটু নুন চিনি গুলে সরবত করে দিয়েছিল ময়না। তখন কি আর জানতো, তবু সেদিনের পর থেকে, এক আত্মিক বন্ধনে বাঁধা হয়ে গেছিলো এই মানুষটির সাথে। পরে তিনি খুব আবদার করে ময়নার মা বাবার কাছ থেকে পাকা কথা আদায় করে নিয়েছিলেন,  নিজের বাউন্ডুলে ছেলেটার জন্য ময়নাকে নিজের বৌমা করে নিয়ে যাবার।

 

ক্লাস সিক্স পর্যন্ত গ্রামের স্কুলে পড়েছিলো ময়না! মা বাবা দুজনেই খুব উৎসাহ দিতো। বাবা ও মা দুজনেই সকালে ইঁট ভাটায় কাজে চলে গেলে খুব মন উদাস হতো ময়নার।  আহারে মা ও দুর্বল শরীর নিয়ে  সংসার সামলে এত্তো খাটছে , খুব খারাপ লাগতো তার। কখনো ছুটির দিনে টিফিন পৌঁছোতে গিয়ে অকপটে মাকে, সেও ইঁট ভাটায় কাজ করতে চায় বলতে মা রেগে বলেছিলো “খবরদার, এদিক পানে আসবিক লাই “খেতে খেতে বাবা বলেছিলো,  “মা রে, ওই কচি হাতে কখনো ইঁট নয় বই পত্তর ওঠানোর কথাই ভাববি। তোর জন্যই না এতো পরিশ্রম”

 

দুলকিকে স্কুলে পাঠিয়ে শুকনো বাঁশ পাতা, খড় কুটো, উনুনে গুঁজে দিতে দিতে এই সব ভাবনার বীজ গুলো ভিড় করে আসে মাথায়। মা বাপের স্বপ্ন, স্বপ্নই থেকে গেছে ময়নার! মাকে অকালে যক্ষা, কেড়ে নিতেই  কেমন যেনো  উথাল পাথাল হয়ে যায়, হঠাৎ করে ময়নার জীবন। বাবার অমত স্বত্তেও মাতব্বররা বিধেন দিলেন বিয়ে করার। অগত্যা দুমাস যেতে না যেতেই , নতুন মা ঘর ঢুকলেন সঙ্গে এক সদ্য  দাড়ি গোঁফ গজানো ছেলে।

বাবা ভেবেছিলো, যাক মেয়েটা একটা দাদা পেলো।  কিন্তু  দাদার সাথে পরিচয় থেকেই ময়নার জীবনটা আতঙ্কের হয়ে উঠেছিলো। কি রকম একটা চুয়ারে মার্কা বছর কুড়ির বুড়িয়ে যাওয়া ছেলেটার শুধুই একটা  ছুঁক ছুঁক বাই যেনো। যা ময়নার বুঝতে বাকি হয় নি। দু তিন বার, পুকুর ঘাটে ও নির্জন ঘরে ময়নাকে ঠেসে দাঁতে দাঁত চেপে,  নষ্ট করতে চেয়েছিল এই নরখাদক! বাবা পাছে কষ্ট পায়, মুখ ফুটে বলে উঠতে পারে নি কখনো। মায়ের একটা ছবি বুকে চেপে, রাতের পর রাত বালিশ ভেজাতো।

হঠাৎ সেদিন হলো কি, সেই  ঝাড়ু বিক্রি চাচার গলার আওয়াজ পেতেই পড়িমরি করে দৌড় দিলো যৌবনবতী  ময়না। পথের মাঝে মা মরা দুখী মেয়েটাকে দেখেই চমকে উঠতেই ময়নার আকুতি শুনে খুব জলদি, নমঃ নমঃ করে  চার হাতের মিলনটাও হয়ে গেলো। আর বাপের বাড়িতে ময়নাকে অবশ্য পা মাড়াতে হয় নি।  বাবা কখনো কেমন মন হু হু করলেই দেখা করতে আসতো আদরের ময়নার কাছে ।

 

নববধূ রূপে বছর খানেক সুখের দিন কেটেছিলো ময়নার, হঠাৎ তাল কাটলো এক মৃত পুত্র সন্তান জন্ম দিয়ে। একদম অপুষ্টিতে এমন কান্ড হলেও পুরুষ মানুষ যদি সব কিছু বিচার বুদ্ধি দিয়ে  বুঝে,  বৌদের পাশে দাঁড়াতো সমাজ থেকে গৃহ হিংসা বিষয়টাই কমে যেতো। স্বাভাবিক ভাবেই আকণ্ঠ চোলাই গিলে আসা স্বামী অসহ্য পেটে ব্যথায় কাতরানো বৌকে সুস্থ সন্তান না দিতে পারার অপরাধে ক্যাত ক্যাত করে লাথ মেরে ঘর থেকে বের করে দেয়! এক নাগাড়ে রক্ত ক্ষরণের সেই বিভৎসতার দিনেও, বৃদ্ধ শ্বশুর বাপটা ঠায় মাথার কাছে বসে স্বান্ত্বনা দিয়ে গেছে যা, ময়নার কাছে সেই দুর্দিনে , চরম প্রাপ্তি। সেই সব কষ্টের দিনে ময়না বুঝে গেছিলো সংসারে মেয়েরা একটা ভোগ্য পণ্য, সময় সুযোগে পুরুষরা তাদের ভোগ করবে, ছড়ি ঘোরাবে আর তারা থাকবে খেলনা পুতুলের মতো।

অসুস্থতার এই সময়ে,  অদম্য পড়াশোনার ইচ্ছের কথা মনে রেখে শ্বশুর মশাই, ও পাড়ার বাবুদের বাড়ি থেকে পুরোনো খাবারের কাগজ, ছেলেদের পুরনো বইপত্তর এনে  পড়তে দিত ময়নাকে। আস্তে আস্তে একটু সুস্থ হবার পর ময়না ঠিক করলো, এভাবে তো চলতে পারে না সংসারটা। শ্বশুর মশায়ের বয়স বাড়ছে, তার ওপর, স্বামীর যা মতিগতি, সংসারে এক কানাকড়িও ঢালে না!  পাড়ার আর দু তিন জন মহিলার, সাথেই সটান ইঁট ভাটায় কাজ করতে যাবার সিদ্ধান্ত নিলো। ম্যানেজার পাকড়াশি, বেশ ঢলঢলে যৌবনের অধিকারী,  ময়নাকে খুশি মনেই কাজে যোগ দেওয়ালেন।

 

প্রথম প্রথম অনভ্যস্ত হাতে খুব কষ্ট হতো ময়নার। সারাদিন কড়া রোদে কাজ সেরে, সূর্য ডোবার কিছু আগে মজুরি নিতে লম্বা লাইনে প্রতীক্ষার বাঁধ ভেঙ্গে যাবার উপক্রম হতো রোজ। তারপর ক্লান্ত শরীরটাকে কোনরকমে পুকুরে ডুব দিয়ে, অন্নপূর্ণার চাতালে মাথা ঠুকে রান্নাবান্নার কাজে হাত লাগাতো।  খুব খারাপ লাগতো ময়নার, যার জন্য এ বাড়িতে আসা সেই বুঝলো না, কখনো জানতেই চাইলো না! অথচ এই সংসারকে একটু ঠিক ঠাক রাখার জন্য কতো চেষ্টাই না  ময়নার। সে অনুভব করতো, স্ত্রীদের পাশে স্বামী, বলিষ্ঠ ভাবে পাশে না দাঁড়ালে সেই সংসার এই ভাবেই খোঁড়াতে খোঁড়াতে এগিয়ে চলে।

একদিন হঠাৎ করেই আবার এক ঘূর্ণিঝড় এসে যেনো,  প্রাণবায়ু নিভিয়ে দেবার উপক্রম। কিন্তু কই মাছের প্রাণের মতো এ যাত্রাও উতরে গেছিলো ময়না। অন্যদিনের মতো সকালে কাঠের জ্বালে রান্না করে হন্তদন্ত হয়ে কাজে লাগতে গিয়ে থমকে যায় ময়না! গোটা ইঁটভাটা লাল পতাকায় মোড়া। একদম থমথমে পরিবেশ। একটু ভেতরে উঁকি দিতেই মনে হলো কেউ যেনো  মিটিং করছে, কিন্তু তখনই কারা যেনো চোখ মুখ বেঁধে চ্যাংদোলা করে মেঝেয় আঁচড়ে ফেললো! বিপদ ঘনীভূত হলে, ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় দিয়ে মেয়েরা ঠিক বুঝে উঠতে পারে, ময়নাও এর ব্যতিক্রমী নয়। পিছমোড়া করে বেঁধে তার ওপর কিছু পশুরুপী মানুষ অত্যাচার করলে সংজ্ঞা হারায় সে।

জ্ঞান ফিরলো তখন,  সূর্য প্রায় অস্ত যাবে যাবে। উপলব্ধি করলো অসহ্য যন্ত্রনাময় শরীরটা একটা কাদা মাখা জলা জমিতে পড়ে! চাপ চাপ জমাট বাঁধা রক্তে ভেজা ফ্যার ফ্যারে শাড়িটা বিদ্রুপ করছে, পাঁচ ফুটের বিধস্ত ময়নাকে। কোনরকমে টলতে টলতে জনমানব শূন্য ফাঁকা মাঠে উঠে দাঁড়ালো সে। সামনের এক ডোবায়, রগড়ে রগড়ে যেনো  শরীর থেকে সব পাপ তোলার চেষ্টা করে  অনেক ক্ষণ পর বাড়ির পানে পা বাড়ালো ময়না। ভিজে সপ সপে কাপড়ে অন্নপূর্ণা থানের কাছে আসতে পুরোহিত মশাই, অবাক হয়ে কপালে লাল টিকা এঁকে দিলেন যেনো সাক্ষাত অন্নপূর্ণা ভর করেছে আজ ময়নার মধ্যে।

সেদিন রাতে শরীরের খিদে মেটাতে বর সামনে এলে সব কেমন, বমি করার মতো উগড়ে দিলো ময়না। এ যেনো এক অপার শান্তি। স্বামী কালিয়া কোনো প্রতিবাদ না করে সব শুনেছিলো সেদিন। পরদিন সকালে এই প্রথম বার উদ্বিগ্ন গলায় বাড়ির বাইরে কাজ় করতে  বারণ করে কালিয়া। পরে শ্বশুরের উদ্যোগে চাতালটা ঘিরে পাড়া ঘরের মতো একখান দোকান শুরু করে ওরা। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই ময়নার কোল জুড়ে আসে, সাক্ষাত অন্নপূর্ণা।

গতকালই দুলকি ক্লাস টুয়ে উঠেছে। নতুন বই এর পাতার গন্ধে খুশি হওয়া দুলকির, দুলে দুলে পড়া শোনা যায়। মরতে মরতেও বার বার ময়নার এই প্রাণ ফিরে পাওয়ার মাঝেও শ্বশুর বাপটার এই ভাবে নিখোঁজ হওয়া, বেদনা দেয় তবু দুলকির পড়ার আওয়াজ  নতুন করে প্রাণ সঞ্চার করে ময়নাকে।

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *