সম্পাদকীয়, এপ্রিল ২০২১

পাড়ার রাস্তা হোক অথবা হাইওয়ে। সর্বত্র এখন একটাই ব্যানারে ছয়লাপ “বাংলা নিজের মেয়েকেই চায়”। মুখ একটাই, পিছনে বিভিন্ন অস্পষ্ট বাংলাসুলভ অবজেক্ট। দিক দিগন্ত ছেয়ে গিয়েছে এমন ব্যানারে। এর থেকে একটু কম হলেও পিছিয়ে নেই অন্যরা, তাদেরও আরও একটি মুখ নিয়ে “আর নয় অন্যায়“ জ্বল জ্বল করছে পথে প্রান্তরে। এখানেই শেষ নয়, ভোট প্রচারের এমন বিজ্ঞাপনে ছেয়ে গিয়েছে স্যোশাল মিডিয়া, ইউটিউব এমনকি মোবাইল ফোন কলও। একটাই কথা মাথায় আসে, এত টাকা আসে কোথা থেকে?  একটা নির্বাচন মানে কি পরিমানে খরচ হয় তা সাধারণ মানুষের কল্পনারও বাইরে। নির্বাচনের পরিকাঠামোগত খরচ তো আছেই, এর সঙ্গে যদি যোগ করা যায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলির প্রচারের খরচ তাহলে তা প্রায় আকাশ ছোঁয়।  কিন্তু মজার কথা এই আকাশস্পর্শী খরচ কিন্তু আসে আপনার আমার পকেট থেকেই। 

যে কোনও উৎসবের জন্য খরচ তো থাকেই। গণতন্ত্রের সেরা এই উৎসবের জন্য করোনা পরবর্তী সাবধানতা নিতে গিয়ে খরচের বহরও এ বার লাগামছাড়া। শুধুমাত্র এ বারের বাজেটেই ভোটের খরচ হিসাবে মোটামুটি ৪০০ কোটি টাকা ধরা হয়েছিল। ২০২০-২১ এর সংশোধিত বাজেটে দেখা যাচ্ছে, প্রস্তুতি নিতেই বেরিয়ে গিয়েছে ১৫৩ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে ভোটের খরচ এখনই অনুমান করা হচ্ছে ৫৫০ কোটি টাকা। এর পর রয়েছে ১ লক্ষ আধা সেনা মোতায়েন এবং পুলিশি খরচ। উনিশের লোকসভা ভোটে আধাসেনার পিছনে খরচ হয়েছিল ৬০০ কোটি টাকার মত। এবার আধা সেনার সংখ্যা আরও বাড়বে, তাই সেটাও প্রায় ৮০০ থেকে ৯০০ কোটি টাকা হবে বলে অনুমান নির্বাচনী আধিকারিকদের। সব মিলিয়ে এবারের বিধানসভা ভোটে  কমবেশি ১৫০০ কোটি টাকা রাজকোষের খরচ হতে পারে বলে সরকারী সূত্রে খবর। লোকসভা নির্বাচনের পুরো খরচ বহন করে কেন্দ্রীয় সরকার। শুধুমাত্র ভোটার তালিকা তৈরির খরচ আধাআধি ভাগ হয়। কিন্তু বিধানসভা ভোটের পুরো খরচই রাজ্যকে বহন করতে হয়। পঞ্চায়েত পুরসভা ভোটের খরচও পুরোটাই রাজ্যের। সেই হিসেবে এই ১৫০০ কোটি টাকার ব্যয়ভার বহন করতে হবে রাজ্যকেই।

এ তো গেল সরকারী খরচের আভাস। এবারে দেখা যাক বেসরকারী অর্থাৎ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের খরচের হালহকিকৎ।  তৃণমূল বছরখানেক আগে থেকেই ভোটে জেতার জন্য কয়েকশো কোটি টাকা দিয়ে পরামর্শদাতা নিয়োগ করেছে। বিজেপি ভোটের প্রচারের জন্য বেশ কয়েকটি হেলিকপ্টার আগে থেকেই ভাড়া করে রেখেছে। এত সভা, এত মিছিল, এত ব্যানার, এত পোস্টার, বেলুন, প্ল্যাকার্ড এসবের খরচ কে যোগায়? আপনি, আমি। আমাদের টাকাতে ভোটে জিতে ক্ষমতায় এসে আমাদেরই কি ভাবে আরও আর্থিক ক্ষতিগ্রস্ত করা যায় সেই ফিকিরই করতে থাকেন রাজনীতির কারবারিরা।

দিল্লীর গবেষণা সংস্থা “সেন্টার ফর মিডিয়া স্টাডিজ” এর মতে ২০১৯ এর লোকসভা ভোটে অন্তত ৫০ হাজার কোটি টাকা খরচ হয়েছিল, যার সিংহ ভাগই ছিল সোশ্যাল মিডিয়ার প্রচারের জন্য। যা ২০১৪ এর লোকসভা ভোটের চেয়ে ৪০% বেশি। ২০১৪ সালে সোশ্যাল মিডিয়া এবং বিজ্ঞাপনের খরচ ২৫০ কোটি হয়ে থাকলে ২০১৯-এ তা হয়েছে ৫০০০ কোটির কাছাকাছি। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনেও সোশ্যাল মিডিয়ার খরচ মাত্রাতিরিক্ত বাড়বে বলে বিশেষজ্ঞদের মত।

গত ১৫ বছরে অজ্ঞাত উৎস থেকে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো পেয়েছে  বিপুল পরিমাণ অর্থ। দল চালাতে ভারতের সব রাজনৈতিক দলই বিভিন্ন সংস্থা ও ব্যক্তির কাছ থেকে নানাভাবে চাঁদা নেয়। তবে রাজনৈতিক দলগুলো যদি ২০ হাজার টাকার উপরে চাঁদা তোলে, তবে কোথা থেকে অর্থ পাচ্ছে তা আয়কর কর্তৃপক্ষকে জানানো বাধ্যতামূলক। এসোসিয়েশন অব ডেমোক্রেটিক রিফর্মস (এডিআর)  নির্বাচন কমিশনে দেশটির ৭টি জাতীয় রাজনৈতিক  দলের দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে জানিয়েছে, ২০০৪ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ভারতের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো অজ্ঞাত উৎস থেকে ১১,২৩৪ কোটি টাকা তুলেছে।  জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলোর এই তালিকায় রয়েছে বিজেপি, কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস, সিপিআই(এম), এনসিপি, বহুজন সমাজ পার্টি ও সিপিআই। নির্বাচন কমিশনে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী মায়াবতীর বহুজন সমাজ পার্টি কুপন, ইলেকটোরাল বন্ড বা অজ্ঞাত উৎস থেকে কোনও চাঁদা গ্রহণ করেনি। তবে অন্য জাতীয় দলগুলো গত পনের বছরে নিয়েছে ১১,২৩৪.১২ কোটি টাকা। অজ্ঞাত উৎস থেকে বিজেপির নেওয়া চাঁদার পরিমাণ ১,৬১২.০৪ কোটি টাকা।

এই অজ্ঞাত উৎস কে? কে আবার আমরা সাধারণ মানুষ। সাধারণ চোখে এই টাকার সিংহ ভাগই দেয় বড় বড় ব্যবসায়ী, কর্পোরেট সেক্টর। সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কৌটো ঝাঁকিয়ে তোলা চাঁদার পরিমান এখানে সিন্ধুতে বিন্দুসম। এই বড় ব্যবসায়ীরা নিশ্চয় নিজেদের গ্যাঁটের থেকে এই টাকা দেন না। দেন আমাদের কাছ থেকেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে লুঠ করেই। ফলে ঘুরপথে আমাদের কষ্টার্জিত অর্থই নির্বাচিনের এই উৎসবে অর্থ যোগাচ্ছে।

বিজেপি এবারের বিধানসভা নির্বাচনে পাঁচ জন সাংসদকে দাঁড় করিয়েছে। তারা যদি কোনওভাবে জিতে যান বা মন্ত্রী হন তাহলে এবার ঐ পাঁচ সংসদ ক্ষেত্রে ফের নির্বাচন হবে। ভেবে দেখেছেন তার জন্য আবার কত টাকা নতুন করে খরচ হবে? না, এসব ভাবার দায় রাজনীতির কারবারিদের নেই। তাদের কাছে গৌরী সেন আপনি আমি। চাইলেই টাকা তাদের হাতের মুঠোয়। তাই আরও পাঁচটা লোকসভা আসনে নতুন ভোট হলে তাদের কিছু যায় আসে না। আসে আমাদের। কারন বহুজাতিক সংস্থাগুলি বা বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলির বিক্রি করা পণ্যের দাম হালকা বেড়ে গেলে কপালে ভাঁজ পড়ে আমাদেরই।  

পলাশ মুখোপাধ্যায়

প্রধান সম্পাদক, অবেক্ষণ  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *