সম্পাদকীয় (জামাইষষ্ঠী সংখ্যা)

সন্ধ্যায় বসে লেখালেখির কাজ করছি হঠাৎই আমার প্রবাসী বন্ধুর ফোন। কলেজ জীবনের বন্ধু, তাই ফোনটা দেখে মনটা ভাল হয়ে গেল। এটা ওটা নানা কথা বার্তার মধ্যেই ও জানাল ছোট্ট মেয়েকে এবার স্কুলে ভর্তি করেছে। দুবাইয়ের যেখানে ওরা থাকে সেখানে সিবিএসই বোর্ডের স্কুলও আছে। ও অবশ্য মেয়েকে দিয়েছে একটি আমেরিকান বোর্ডের স্কুলে। সেখানে নাকি পড়াশোনার চাপ খুব কম। বলে দেওয়া হয়েছে বাড়িতে এ বি সি ডি শেখানোর দরকার নেই, তারাই প্রয়োজনে শিখিয়ে নেবে। পড়াশোনায় চাপ না দিয়ে অন্যান্য বিভিন্ন বিষয় খুব সহজ করে শেখানোটাই ওদের নিয়ম বা সিলেবাস। আমার এক শ্যালিকা থাকে অস্ট্রেলিয়ায়, তার কাছেও শুনেছি প্রায় একই কথা। ওদের ওখানেও নাকি ছোট্ট বেলায় পড়াশোনাতে একেবারেই চাপ দেওয়া হয় না। বরং জোর থাকে খেলাধুলা বা অন্যান্য ভাললাগার কাজকর্মে উৎসাহ দেওয়ার ক্ষেত্রে। সে দেশে নাকি ক্লাস সিক্স পর্যন্ত গোটা পাঁচেক বই থাকে।

শুনেই মনে হল ওরা বোধহয় লেখাপড়াটাকে গুরুত্বই দেয় না। অথচ আমাদের দেশ অতি উন্নত, সেখানে আমার ছেলে যখন ক্লাস টু তে পড়ে তখনই তার ছাব্বিশটা বই। ব্যাগটা উঠিয়ে নিয়ে যেতে পারত না। সে কি ওদের চেয়ে বেশি শিখেছে? জানি না, কিন্তু পরে যখন দেখি ব্যবহারিক ক্ষেত্রে আমাদের ছেলেমেয়েরা বিদেশী ছেলেমেয়েদের কাছে গোল খেয়ে যাচ্ছে তখন দেশীয় সিলেবাসের নামে ক্ষুদেদের প্রতি এই অত্যাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে ইচ্ছে করেই। ওদের কাছে যখন শৈশব উপভোগ করবার জন্য নির্ধারিত, আমাদের কাছে তখন শুধুই চাপিয়ে দেওয়ার সময়। ওদের কাছে যখন পড়া পড়া খেলা, আমাদের কাছে তখন খেলাটাকেও পড়া বানিয়ে ফেলার আসুরিক প্রয়াস।

লেখাপড়া শেখা মানে শুধুই পুঁথি গত পাঠ কন্ঠস্থ করে উদরস্থ করা? আমার এক প্রাক্তন সহকর্মী জাপানে গিয়েছিলেন। প্রায় মাসে দেড়েক ছিলেন ওখানে, খুব ভাল ভাবে কাছ থেকে দেখেছিলেন ওদের জীবনযাত্রার খুঁটিনাটি। তিনি জানিয়ে ছিলেন, জাপানে লেখাপড়ার চাইতেও জোর দেওয়া হয় সামাজিক দায় দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধিতে। অর্থাৎ জীবনে চলার পথে প্রতি ক্ষেত্রেই যাতে সে অন্যের অসুবিধার কারন না হয়, অথবা অন্যকে সুবিধা করে দেয় সেই পাঠই পড়ানো হয় সর্ব প্রথম। তাই তো সে দেশে কেউ প্রকাশ্যে থুতু ফেলেনা, অকারনে নিজের প্রয়োজনে অন্যকে বিব্রত করে না। যার ফল পড়ে সুষ্ঠু পরিষেবার ক্ষেত্রেও।

আমাদের শিক্ষা কিছু শংসাপত্র নির্ভর। তাই চারটি শংসাপত্র হাজির করলেই আমরা ভেবে নিই তিনি উচ্চশিক্ষিত। তার ব্যবহারিক জ্ঞান বা সামাজিক দায়বোধের পরিচয় খতিয়ে দেখার চল এ দেশে নেই। সম্প্রতি কাগজে পড়লাম এ রাজ্যের ডিজির স্ত্রী এটিম জালিয়াতির শিকার। কেউ একজন ব্যাঙ্কের আধিকারিকের পরিচয় দিয়ে তার কাছে এটিএম কার্ড এবং পিন নম্বর জানতে চায়, তিনি সরল বিশ্বাসে তা দিয়েও দেন। ফল? লক্ষাধিক টাকা গায়েব। রাজ্যের সর্বোচ্চ পুলিশ আধিকারিক, একজন আইপিএস অফিসার। আশা করা যায় তার স্ত্রী নিশ্চয় নিরক্ষর নন, বরং তথাকথিত বেশ কিছু শংসাপত্র তারও নিশ্চয় আছে। কিন্তু এত প্রচার, এত খবরের পরেও এই ন্যুনতম বোধ তার হয়নি, যে অপরিচিত ব্যক্তিকে পিন নম্বর দিতে নেই! এখানেই ব্যবহারিক জ্ঞানের অভাব পরিলক্ষিত হয়। অর্থাৎ শিক্ষা আছে, কিন্তু তার সামাজিক প্রয়োগ নেই। প্রোজেক্টের নামে নানা কাজ চাপিয়ে দেওয়া হয় স্কুল পড়ুয়াদের উপরে। তার সিংহ ভাগটাই করে দেন বাড়ির লোকেরা, গৃহশিক্ষকেরা কিম্বা অর্থের বিনিময়ে প্রোজেক্ট বানিয়ে দেওয়া ব্যবসায়ীরা। কি লাভ হয়? শিক্ষার নামে অন্যদের ব্যাতিব্যস্ত করা। ছোট্ট থেকে সমাজ বিজ্ঞানকে সিলেবাসে রেখে মোটা মোটা বই না পড়িয়ে খেলার ছলে সামাজিক দায়ের পাঠগুলিকে কি দেওয়া যায় না? আমাদের চেয়ে উন্নত অন্য দেশগুলি যদি তা পারে, তাতে তাদের উন্নয়ন থেমে না যায়, তাদের ছেলেমেয়েরা যদি প্রকৃত শিক্ষিত হতে পারে তবে আমাদের দেশে পড়াশোনার নামে এই অত্যাচার কেন?

পরিশেষে বলি আমি শিক্ষাবিদ নই। অন্য দেশের শিক্ষার কথা শুনে এবং তাদের সাফল্যের হার দেখে পাশাপাশি এ দেশে আমার সন্তান সহ সন্তান সমদের কষ্ট দেখে এই প্রতিবাদের কথা মনে হয়েছে। শৈশব এখন বিপন্ন, স্কুলের পরিধি টপকে এখন সর্বত্র শিক্ষার ভুত তাড়া করে বেড়াচ্ছে। তাই তো স্কুল থেকে ফিরে আমরা শুধু খেলতে এখন আর মাঠে যাই না। যাই খেলা শিখতে। হারিয়ে যাচ্ছে মাঠও। ছেলেবেলায় দেখা ফাঁকা খেলার জায়গা বা মাঠগুলি এখন প্রায় অধিকাংশই নেই বা সঙ্কুচিত। আমরাই দায়ী, শৈশব চুরি করে, সামাজিকতার পাঠ না দিয়ে এক একটি রোবট বানিয়ে ছেড়ে দিচ্ছি এই কংক্রিটের জঙ্গলে। তাদের কাছে অন্য কিছু আশা করা আমাদের মানায় কি?

সকলে ভাল থাকবেন। মনের অনেক আশা ক্ষোভ আপনাদের সঙ্গেই ভাগ করে নিই। এবারেও ব্যতিক্রম নয়। অবেক্ষণ জামাইষষ্ঠী সংখ্যা কেমন লাগল আমাদের জানাতে ভুলবেন না। আবার কথা হবে পরের সংখ্যায়।

পলাশ মুখোপাধ্যায়

প্রধান সম্পাদক, অবেক্ষণ           

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *