সম্পাদকীয়, সেপ্টেম্বর ২০২০

এই মাত্র টিক টক অ্যাপটি মোবাইল থেকে মুছে দিয়ে মুচকি হাসলেন সুলোচনা বৌদি। ভাবখানা এমন, যেন চিনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রায় জিতেই গিয়েছেন। পরম তৃপ্তিতে সুস্বাদু খাবার অর্ডার করে বসলেন জোমাটো-তে। পছন্দসই খাবার বেছে পেটিএমের মাধ্যমে টাকা মিটিয়ে এবার জুত করে সোফাটায় হেলান দিলেন। খুশি খুশি মন, একটু শপিং হয়ে যাক, ব্যাস খুলে গেল ফ্লিপকার্ট, অপ্পো ফোনটাতে চলল বুড়ো আঙুলের ব্যায়াম। সুলোচনা বৌদি টিক টক উড়িয়ে দিয়ে ভেবেছিলেন গোটা চিনকেই উড়িয়ে দিয়েছেন। কিন্তু আদতে তা সিন্ধুতে বিন্দুসম। কারন চিন আমাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে সুকৌশলে ঢুকে গিয়েছে। সেটা একদিনে হয়নি, তাই আমরাও ৫৯ টি চিনা অ্যাপ নিষিদ্ধ করে একদিনেই চিনকে সমুচিত শিক্ষা দেওয়া গেছে ভেবে নিলে তার চেয়ে বোকামো আর হবে না। সুলোচনা বৌদি টিক টক মোছার পর যে যে অ্যাপগুলি খুলেছিলেন, অথবা আমরা দৈনন্দিন জীবনে সাধারণত সব চেয়ে বেশি যে অ্যাপগুলি ব্যবহার করি তার সব প্রায় কটিতেই কোনও না কোনও ভাবে চিনা লগ্নি রয়েছে। এভাবেই চিন আমাদের ভিতরে ঢুকে গিয়েছে অজান্তে, নিঃশব্দে।

 টিক টক মোবাইল থেকে উড়িয়ে দিয়ে চিনা বিরোধীতার জোয়ার এল যখন, তখনই বাজারে এসেছিল আর একটি অ্যাপ, মিত্র বা মিত্রো। বলা হল এটি একেবারে খাঁটি দেশীয় অ্যাপ। আমাদের প্রধান মন্ত্রীর সেই বিখ্যাত মিত্রো… বলে ভাষণের দৌলতে এই নামটা যে ভারতীয়, সেটা খুব খেয়ে গেল আম আদমি। এত দিন টিক টকে মজে ছিল গোটা দেশ, খানিকটা নেশাগ্রস্তই হয়ে পড়েছিল বলা যায়। তাই টিকটক যাওয়ার পরে দেশীয় অ্যাপ মিত্রো… আসতেই শুরু হয়ে গেল ডাউনলোডের জোয়ার। জানা আছে কি? মিত্রো অ্যাপটি মোটেই দেশীয় অ্যাপ নয়। অ্যাপটির মালিক শিবঙ্ক আগরওয়াল, আইআইটি রুরকির শিক্ষার্থী, একটি পাকিস্তানের কোডিং সংস্থা কিউবক্সাসের কাছ থেকে অ্যাপটির কোড কিনেছিলেন এবং অ্যাপটিকে মিত্রো হিসাবে পুনরায় ব্র্যান্ড করেছেন, তারপর ভারতে চালু করেছেন। কিউবক্সাস জানিয়েছে এই কোড আগে টিক টকের ছিল, এবং এতে ব্যবহারকারীর গোপনীয়তা রক্ষার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সুরক্ষা মানা সম্ভব হয়নি। এবার বোঝা গেল আপনি চিনা টিক টককে মুছে দিয়ে একটি পাকিস্তানি অ্যাপ ডাউনলোড করে নিলেন মোবাইলে দেশীয় অ্যাপ ভেবে। এ যেন, “টকের জ্বালায় পালিয়ে গিয়ে তেঁতুল তলায় বাস”।

 ইতিমধ্যে এক সংস্থা “রিমুভ চায়না অ্যাপ” নামক একটি অ্যাপ তৈরি করেছে। যা এই মুহূর্তে পাওয়া যাচ্ছে প্লে স্টোরে। তাদের দাবি এর ফলে সব ধরনের চিনা অ্যাপ ব্যবহার বন্ধ করা যাবে সহজেই। টিকটক, জেন্ডার সহ একাধিক অ্যাপ খুব সহজেই বন্ধ করা যাবে। ইতিমধ্যে কয়েক লক্ষ মানুষ ওই অ্যাপ ডাউনলোড করেছেন।

 সারা পৃথিবী এখন আপনার হাতের মুঠোয়, গুগল আছে তো…। কিন্তু জানেন কি? চিনে গুগল নেই। নেই হোয়াটস অ্যাপ, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামও। চিন তাদের দেশে বাইরের কোনও অ্যাপ বা সাইট চালাতে দেয় না। তাদের দেশে এই ধরনের সাইট বা অ্যাপের বিকল্প তারা নিজেরাই বানিয়ে নিয়েছে। সে ক্ষেত্রে তারা ঐ অ্যাপের মাধ্যমে তাদের দেশের মানুষের উপরে কড়া নজর রাখতে পারে। প্রয়োজনে ব্যবস্থা নিতে পারে। এটাকে অনেকে মজা করে বলেন গ্রেট ফায়ার ওয়াল অফ চায়না। বিষয়টা ভাল না খারাপ সেটা নিয়ে বিতর্ক থাকতেই পারে। কিন্তু একটা জিনিস চিন করে দেখিয়েছে, যে, অন্যের উপরে তারা নির্ভর করে না সেটা গোটা বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছে। আমরা প্রতি মুহুর্তে অন্যের পরে নির্ভরশীল। জামা কাপড় তেল সাবান তো ছেড়ে দিন, সামরিক অস্ত্র, প্রযুক্তিগত সামগ্রীর মত গভীর গোপন পণ্যগুলিও আমরা সাধারণত বাইরে থেকেই আমদানি করি। আমাদের মেধারা পড়াশোনা শেষ করেই বাইরে চলে যায়, আটকাতে পারি না। তাই আমাদের সব খুল্লাম খুল্লা। চিনের কিন্তু তা নেই। তাদের সব কিছুকে তারা গোটা বিশ্বের কাছে খুলে দেয়নি। বরং ধীরে ধীরে তাদের পণ্যগুলিকে ছড়িয়ে দিয়েছে অন্যত্র।

অনেকেই চিনের সঙ্গে যুদ্ধ যুদ্ধ করে লাফাচ্ছেন। একটি জনপ্রিয় হিন্দি খবরের চ্যানেলে একটি সমীক্ষায় সেদিন দেখছিলাম ভারতের ৭৬ শতাংশ মানুষ চান চিনের সঙ্গে অবিলম্বে যুদ্ধ হোক। শুধু তাই নয় তাদের বিশ্বাস সেই যুদ্ধে ভারতের জয় নিশ্চিত। এখানে যুক্তির থেকে আবেগের উপস্থিতি যে অনেকটাই বেশি তা বলে দিতে হয় না। কারন চিনের সামরিক শক্তি বা যুদ্ধাস্ত্র সম্পর্কে সত্যি সে ভাবে আমরা কেন গোটা বিশ্বের কেউই ভাল জানে না। কিন্তু ভারতের কাছে কি আছে তা প্রায় সকলের কাছেই খোলা, বিশেষ করে আমাদের অধিকাংশ যুদ্ধাস্ত্রই তো বাইরে থেকে কেনা। রাফাল এসে যাওয়াতে মনে হল আমরা এবার যুদ্ধে জিতেই গিয়েছি। কিন্তু রাফালের ক্ষমতা গোটা বিশ্বের কাছে খোলা পাতা। পাশাপাশি চিনের যুদ্ধ বিমান কিন্তু কোনও যুদ্ধে এখনও অংশ নেয়নি, সেটা যেমন স্বস্তির, তেমনই চিন্তারও। ভারতে গোপনীয়তা আছে, কিন্তু সেটা শুধুমাত্র রাজনৈতিক নেতাদের বিপুল সম্পত্তি লুকানোর ক্ষেত্রেই দেখা যায়। অন্য ক্ষেত্রেও স্বনির্ভরতা এবং গোপনীয়তা বোধহয় আমাদেরও প্রয়োজন। না হলে চিন ধীরে ধীরে তার শক্তি বাড়াবে, প্রতিবেশী দেশগুলিতে প্রভাব বিস্তার করবে গোপনে, আর আমরা শুধু দেখতেই থাকব এবং পায়ের তলার মাটি সরে যাওয়ার পরও মিথ্যা আস্ফালনের নাটক করব।

পলাশ মুখোপাধ্যায়

প্রধান সম্পাদক, অবেক্ষণ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *