সম্পাদকীয় (শারদীয়া সংখ্যা ২০১৮)

 

বাঙালির বড় চাপ। কত বিষয়ে যে মাথা খাটাতে, মাথা ঘামাতে অথবা মাথা গলাতে হয় তার কোনও ইয়ত্তা নেই। অন্য কোনও জাতি হলে তো মাথা খারাপই হয়ে যেত। বিশেষ করে কলকাতা এবং আশপাশের বাঙালি হলে তো কথাই নেই। ভুবনের ভার তাদেরই উপরে। শুধু কি ভুবনের ভার? ভুবনে যেন কোনও কিছুতেই তাদেরকে কেউ ছাড়িয়ে না যেতে পারে সেটা দেখা এবং তা নিয়ে জরুরী পদক্ষেপ করবারও গুরু দায়িত্বও কোলে থাকা বা কোল ঘেঁষা বাঙালিরই। বিশ্বাস হচ্ছে না তো, মনে করেছেন বাঙালি বিদ্বেষী বুঝি। আরে মশাই না… আমিও তো গর্বিত, আপ্লুত মুখরিত, শিহরিত, আনন্দিত, উচ্ছ্বসিত যে সেই বাঙালিদেরই একজন আমি নিজেও। অন্যদের কেন? আমাদের কেন নয়?এই প্রতিযোগিতায় আমিও সমান সামিল। কেন বলুন তো? বাঙালির যে বড় চাপ।

বুঝলেন না তো…? এবার তবে প্রাঞ্জল করে প্রাণ আর জলকে আলাদা ভাবে বোঝাই। এই দেখুন চিনারা নাকি আমাদের ছাড়িয়ে যাচ্ছে বলে গেল গেল রব চারিদিকে। বাঙালি কিন্তু চিনাদের আগেই পিছনে ফেলে দিয়েছে। আমাদের পাড়ায় পাড়ায়, মোড়ে মোড়ে, রাস্তায় রাস্তায়, যে পরিমান রোল চাউমিনের দোকান তা চিনেও আছে কিনা সন্দেহ। চিনারা শুনেছি একটু তেল ঝাল কম খায়, সিদ্ধও পছন্দ করে বেশি। চাউমিন বানানোর পদ্ধতিতে আমরা চিনাদের কয়েক গোল দিয়ে দিয়েছি আগেই। মোড়ের রোলে কিম্বা চাউমিনে হাতা হাতা পোড়া বাসি তেল, পোকা খাওয়া পেঁয়াজ, বুড়ো শসা দিয়ে যেটা তৈরি হয় তার স্বাদ চিনা চাউমিনকে ধারে কাছে আসতে দেয় না। এর সঙ্গে যখন আমরা আমাদের অতি প্রিয় বিক্রমপুরের কাসুন্দিও মিশিয়ে দিই, তখন তো চাউমিন জমে চমচম একেবারে। এখানেই শেষ নয়, দক্ষিন ভারতীয় খাবারের দোকানগুলিতে বাঙালিদের ভিড় দেখে কাছে ঘেঁষতে ভয় পান এদিকে থাকা দক্ষিন ভারতীয়রা। ইডলি, দোসা, উত্তাপম, সম্বরে বাঙালির তো গদ গদ দশা। কি বুঝলেন? বাঙালির যে বড় চাপ।

শুধু কি খাবার নাকি? বাঙালি উৎসব প্রিয়, সংস্কৃতি প্রিয়, আমোদ প্রিয় বলে খ্যাতি রয়েছে সর্বত্র। তাই অন্যরা কোনও একটা উৎসবে বা অনুষ্ঠানে আমাদের ফেলে এগিয়ে যাবে সেটা হয় নাকি? অন্যদের উৎসবও তাই করায়ত্ত করে নিয়েছি আমরা। সবটা পারিনি কিন্তু আস্তে আস্তে নিয়ে নেব সবই। অন্যদের বিয়েতে নাকি হুল্লোড় বেশি হয়! এটা আবার হতে পারে নাকি? বিয়ের আগে সঙ্গীত্ বা মেহেন্দি এখন আমাদেরও আচার। সানাই তো ছিল কিন্তু এখন আমরা ডিজেও নিয়ে নিয়েছি আমাদের বিয়েতে। বৌ ভাতে নানা কাজ কর্ম থাকে ধুতি পরে তো কাজ সামলানো, ডিজে তে নাচা এগুলো হতে পারে না, তাই আমাদের বরেরা এখন বৌভাতে নিয়ম করে স্যুট টাই পরে, না হলে কুর্তা পাজামা। কারা নাকি বলত গনেশ পুজো মহারাষ্ট্রে হয় খুব ধুমধাম করে। আরে ধুর আমাদের এখানে এস বস্, প্রতি পাঁচশো মিটার অন্তর অন্তর একটা করে গনেশ পুজো এখানেও হয়। পাঁচশো মিটার ভুল বলে ফেললাম কোথাও কোথাও আমরা এই দূরত্বটা পাঁচশো ফুটেও নামিয়ে এনেছি। এখন তো ছট পুজোতেও ছুটি দিয়েছি আমরা। গনেশ বিসর্জনের মিছিল? আরে আমরাও তো দুর্গা কার্নিভাল শুরু করে দিয়েছি। পোঙ্গল টা যেন কখন হয়, ওইটা এখনও মাথায় আসেনি আমাদের, নাহলে ওটাকেও শুধু ওদিকে আটকে না রেখে একটা বঙ্গীকরণ করে দিতামই। বুঝলেন না? বাঙালির যে বড় চাপ।

আরে বাংলার বাইরে কোথাও কোনও ভাল জিনিস থাকবে না,থাকতে পারে না। তাই তো গোয়াকে, লন্ডনকে, সুইজারল্যান্ডকে এখানেই করে দিচ্ছি আমরা। তবে অন্যদের আবেগ বা ভালবাসাকে এখনও সেভাবে হাতাতে পারিনি আমরা। এই একটা দুঃখ রয়ে যাচ্ছে। বাঙালির আবেগ কম এই খোঁটা শুনতে হবে? ভাবা যায় না। দক্ষিন ভারতে কোন রাজনৈতিক নেতা নেত্রী মারা গেলে বা অসুস্থ হলেও অন্তত আট দশ জন সমর্থক মারা যান দুঃখে বা শোকে। আমাদের তেমন কোন রেকর্ড নেই। লজ্জার। এই লজ্জাটা অবশ্য নির্বাচনের সময় মৃত্যু মিছিলের মাধ্যমে আমরা খানিকটা পুষিয়ে ফেলি। তবুও, এক্ষেত্রেও কি পিছিয়ে থাকাটা উচিৎ? ভাবুন তো বাঙালির কি বড় চাপ!

সকলকে শারদীয়ার শুভেচ্ছা। ভাল থাকবেন। অবেক্ষণ পত্রিকাকে এভাবেই ভালবাসবেন। আবার কথা হবে আগামী সংখ্যায়।

পলাশ মুখোপাধ্যায়

সম্পাদক, অবেক্ষণ

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *