খেলার গল্প, গল্পে খেলা

অভিজিৎ বিশ্বাস

আড্ডা দিতে ভালোবাসেন না এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া মুশকিল। অফিস ছুটির পর বাড়ি ফিরে হাত মুখ ধুয়ে, পাড়ার রকে বসে আড্ডা মারাটা পুরোনো কলকাতার ঐতিহ্য বহন করে। বাপ-ঠাকুরদার আমলে সেই আড্ডা রীতিমত ডেইলি রুটিনের মধ্যেই পড়ত। ছেলেবেলায় সেই আড্ডার ধারেকাছে যাওয়ার নূন্যতম সাহসটুকু জোগাড় করতে পারতাম না। দূর থেকে সেই আড্ডার রূপ দেখে ঝগড়া আখ্যা দেওয়াটাই স্বাভাবিক ছিল। দেশ-বিদেশ, রাজ্য-রাজনীতি, খেলাধূলা ইত্যাদি বিষয়ের আলোচনায় যখন সেই আড্ডা জমে উঠত, তখন আমার যে কি ‘ভয়ঙ্কর’ অনুভূতি হত, তা লিখে বোঝানো সম্ভব নয়। ভয়ঙ্কর বললাম কারণ, মায়ের আদেশানুসারে যখন বাবাকে সেই আড্ডার মঞ্চ থেকে ডাকতে যেতাম, তখন নরেন কাকু, সুরেশ কাকু, দেশ বিদেশের এমন সব প্রশ্ন আমার সামনে তুলে ধরতেন। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া আমার আর কোনো উপায় থাকত না। কৌতুহল বশত বাবাকে অনেকবার তাঁদের আড্ডার মূল বিষয়বস্তু সম্পর্কে জিঞ্জাসা করেছি কিন্তু কোনোদিনই বাবা খেলা ব্যতীত অন্য কথা আমার সাথে আলোচনা করেননি। বাবা জানতেন যে খেলা সম্পর্কে আমার আগ্রহ কতখানি। আর একবার যদি তিনি খেলার গল্প শুরু করেন, তাহলে আমার সকল কৌতুহল দূর হবে। বাবার কাছে গল্প শুনতে শুনতে প্রায় দিনই সময়ের খেয়াল থাকত না। এখনও মনে পড়ে বাবার কাছে মোহনবাগান-কসমস ম্যাচের গল্প শোনার সময় পুরো ম্যাচটাই আমার চোখের সামনে ভেসে উঠেছিল।
যুগ বদলেছে, সময় পালটেছে, আজ আর পাড়ার রকে কোনো আড্ডা দেখতে পাওয়া যায় না। নতুন যুগের মানুষ স্যোশাল নেটওয়ার্ক এর মধ্যে তাঁদের আড্ডাটাকে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছে। ছোটোরাও বোধহয় এখন আর তাদের বাপ-ঠাকুরদার কাছে গল্প শুনতে চায় না, তাদের হাতের মুঠোয় যে এখন ইন্টারনেট দুনিয়া। আঙুলের একটা চাপে যে তারা বের করে নিতে পারে দুনিয়ার খুঁটিনাটি। এখনও সময় পেলে বাবার সঙ্গে আড্ডা জমাই। বুকটা গর্বে ভরে ওঠে যখন হালফিলের খেলার খবর, সমালোচনা বাবার সাথে ভাগ করে নি। কিন্তু নিজে যখন চোখ বুজে ছেলেবেলায় বাবার মুখে শোনা গল্পের পাতা ওল্টাই, বুঝতে পারি কাজের চাপে সেইসব স্মৃতির মলাটে মোড়া গল্পের পাতাগুলোতে ধূলোর আস্তরন জমা হয়েছে। তাইতো আজও সময় পেলেই সেইসব স্মৃতি প্রবন্ধের ধূলো ঝাড়তে বাবার সাথে আড্ডা দিতে বসে পড়ি। যোগ্য তথ্য যুগিয়ে আবারও চাঙ্গা করে নি পৃথিবী তথা ভারতবর্ষের খেলার ইতিহাস। সেই আড্ডাই আজ গল্পের আকারে সংক্ষিপ্ত তথ্য রূপে তুলে ধরার চেষ্টা করছি-
বিশ্ব ফুটবলের অজানা গল্প- খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় ৪০০ সালের কাছাকাছি সময় চীন দেশে “কুজু” নামক একটি খেলার সূচনা হয়, বিশ্ব দরবারে যা পরবর্তীকালে ফুটবল নামে পরিচিতি লাভ করে। আমেরিকা এবং কানাডায় এটি “সকার” নামেও পরিচিত। পৃথিবীর প্রথম ফুটবল ক্লাবের নাম “শেফিল্ড ইউনাইটেড”, যা ১৮৫৭ সালে তৈরি হয়। টেলিভিশনে প্রথম ফুটবল ম্যাচ দেখানো হয় ১৯৩৭ সালে। বিশ্ব ফুটবলের সবথেকে দুঃখজনক দিন হিসাবে ধরা হয় ১৯৬৪ সালে পেরু তে অনুষ্ঠিত একটি ফুটবল ম্যাচকে। রেফারির একটি ভূল সিদ্ধান্তে সেদিন দর্শকদের মধ্যে হাতাহাতির ফলস্বরুপ প্রায় ৩০০ জন মানুষ প্রান হারান।
আন্তর্জাতিক ফুটবলের গল্প- বিশ্বের প্রথম আন্তর্জাতিক ফুটবল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয় ১৮৭২ সালে ইংল্যান্ড এবং স্কটল্যান্ড এর মধ্যে। প্রথম আন্তর্জাতিক ফুটবল প্রতিযোগিতার নাম “ব্রিটিশ হোম চ্যাম্পিয়নশিপ” যা ১৮৮৪ সালে শুরু হয়। ১৯০০ সালের অলিম্পিক গেমসে ফুটবল খেলা শুরু হলেও ১৯০৮ সালের অলিম্পিকে তা প্রথম আনুষ্ঠানিক খেলার মর্যাদা পায়। ১৯০৪ সালে গঠিত হয় ফিফা(FIFA- Federation of International Football Association)। ১৯১৪ সালে অলিম্পিক প্রতিযোগিতায় অনুষ্ঠিত ফুটবল প্রতিযোগিতাকে “অপেশাদার বিশ্ব ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপ” হিসাবে স্বীকৃতি দেয় ফিফা।


বিশ্বকাপ ফুটবলের গল্প- ১৯২৮ সালে অলিম্পিকের বাইরে আলাদাভাবে নিজস্ব আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয় ফিফা। ১৯৩০ সালে প্রথম বিশ্বকাপ ফুটবল প্রতিযোগিতা শুরু হয় উরুগুয়ে তে। প্রথম বিশ্বকাপ ফুটবল চ্যাম্পিয়নের শিরোপাও অর্জন করে উরুগুয়ে। প্রথমবার এই প্রতিযোগিতা আরম্ভ হয়েছিল ১৩ টি দল নিয়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে ১৯৪২ ও ১৯৪৬ সালে বিশ্বকাপ ফুটবল অনুষ্ঠিত হয়নি। ১৯৩০ সাল থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত বিশ্বকাপ জয়ী দলকে “জুলে রিমে ট্রফি” দেওয়া হত। ১৯৭০ সালে ব্রাজিল তৃতীয়বার বিশ্বকাপ জেতায় তাঁদের স্থায়ীভাবে ট্রফিটি দিয়ে দেওয়া হয়। এর পর থেকে ট্রফিটির নতূন নাম হয় “ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফি”। ১৯৫০ সালের বিশ্বকাপে সু্যোগ পেয়েও নিজেদের নাম প্রত্যাহার করে নেয় ভারত।


ভারতীয় ফুটবলের গল্প- উনিশ-শ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে ভারত ফুটবলের সাথে পরিচিত হয় তৎকালীন ব্রিটিশ সেনাদের মাধ্যমে। “এফ-এ কাপ” এবং “স্কটিশ কাপ” এর পর পৃথিবীর তৃতীয় এবং চতুর্থ প্রাচীন ফুটবল প্রতিযোগিতা “ডুরান্ড কাপ”(১৮৮৮) ও “আই-এফ-এ শিল্ড”(১৮৯৩) শুরু হয় ভারতে। ভারতে প্রথম ফুটবল ম্যাচ খেলা হয় ১৮৫৪ সালে “ক্যালকাটা ক্লাব অফ সিভিলিয়ান্স” এবং “ব্যারাকপুর জেন্টেলম্যানস” এর মধ্যে।
১৮৭২ সালে সৃষ্টি হয় “ক্যালকাটা ফুটবল ক্লাব”। এরপর ডালহৌসি ক্লাব, বাগবাজার ক্লাব, শোভাবাজার ক্লাব, মোহনবাগান ক্লাব ইত্যাদি ভারতীয় ফুটবলে প্রবেশ করে। ১৮৯৩ সালে গঠিত হয় “আইএফএ”(IFA- Indian Football Association)। এবং ১৯৩৭ সালে গঠিত হয় “এ-আই-এফ-এফ”(AIFF- All India Football Federation)।


১৯৩০ সালে স্বাধীনতার আগে প্রথম ভারতীয় ফুটবলার হিসাবে বিদেশি দলের হয়ে খেলেন “মহম্মদ সেলিম”। তিনি স্কটল্যান্ড এর “সেলটিক ফুটবল ক্লাব” এর হয়ে খেলেছিলেন। ভারতীয় জাতীয় ফুটবল দল প্রথম আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সবথেকে বড় টুর্নামেন্ট খেলার সুযোগ পায় ১৯৪৮ সালের লন্ডন অলিম্পিকে। সেখানে প্রথম ম্যাচে ফ্রান্সের কাছে ২-১ ব্যবধানে হেরে বিদায় নিতে হয় তাঁদের। এই ম্যাচে একটি গোলের সুবাদে “সারাঙ্গপনি রামান” প্রথম ভারতীয় ফুটবলার হিসাবে অলিম্পিকের মতন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গোলের নাম লেখান। ১৯৫০ সালের বিশ্বকাপ ফুটবলে সু্যোগ পেয়েও সেখান থেকে নাম প্রত্যাহার করে নেয় ভারত। ফিফার নিয়মানুসারে সেইসময় কোনো দল-ই খালি পায়ে বিশ্বকাপ ফুটবলে অংশগ্রহন করতে পারত না, আর ভারত যেহেতু সেইসময় খালি পায়ে খেলে অভ্যস্থ, তাই বিশ্বকাপ থেকে নাম প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হয় তাঁরা। যদিও প্রত্যাহারের কারন হিসাবে এ-আই-এফ-এফ আরো কয়েকটি যুক্তি দেখিয়েছিল। যেমন, যাতায়াতের খরচ বহন করা সেইসময় বোর্ডের পক্ষে সম্ভব ছিল না। অনুশীলনের জন্য যথেষ্ট সময় বরাদ্দ ছিল না। বিশ্বকাপ ফুটবলের থেকে অলিম্পিক প্রতিযোগিতাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিল এ-আই-এফ-এফ।
১৯৫১ থেকে ১৯৬২ সালকে ভারতীয় ফুটবলের স্বর্ণযুগ হিসাবে ধরা হয়। ১৯৫১ সালে এশিয়ান গেমস চ্যাম্পিয়ন হয় ভারত। ১৯৫২-১৯৫৫ সালে ধারাবাহিক ভাবে তাঁরা ৪ বার “কোয়াড্রাঙ্গুলার কাপ” জিতে নেয়। ১৯৫৬ সালের অলিম্পিক এবং ১৯৫৮ এশিয়ান গেমসে তাঁরা চতুর্থ স্থান অধিকার করে। ১৯৫৬ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ৭-১ ব্যবধানে জয়লাভ করে ভারত, যেটি আজ পর্যন্ত ভারতীয় ফুটবল দলের সবথেকে বড় জয় হিসাবেই ধরা হয়। এই বছর-ই অলিম্পিকে প্রথম এশিয়ান ফুটবলার হিসাবে ভারতের হয়ে হ্যাট-ট্রিক করেন “নেভিল ডি’সুজা”। ১৯৫৯ সালের মারডেকা কাপে দ্বিতীয় স্থান পায় ভারত। ১৯৬২-র এশিয়ান গেমস ফাইনালে দক্ষিণ কোরিয়াকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় তাঁরা। এরপর ১৯৭০ সালের এশিয়ান গেমসে তৃতীয় স্থান অধিকার করে ভারত। এরপরে আর কোনো বড় মাপের আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে সাফল্য দেখাতে না পারলেও স্যাফ(SAF) গেমস, স্যাফ(SAFF) কাপ, নেহেরু কাপ এর মত অনেক প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয় ভারত।


মোহনবাগান ক্লাবের গল্প- ১৮৮০ এর দশকে ভারতে স্বাধীনতা আন্দোলন শুরু হয়। জাতীয়তাবাদীদের সাহায্যের জন্য উত্তর কলকাতার মোহনবাগান অঞ্চলের মিত্র ও সেন পরিবারের সহযোগিতায় “ভূপেন্দ্রনাথ বসু” ১৮৮৯ সালের ১৫’ই আগস্ট প্রতিষ্ঠা করেন “মোহনবাগান স্পোর্টিং ক্লাব”। কিন্তু রাইফেল শ্যুটিং কিংবা ওই ধরনের কোনো খেলার সাথে সেইসময় যুক্ত না থাকায়, অধ্যাপক “এফ জে রো” এর পরামর্শে ক্লাবের নতুন নাম হয় “মোহনবাগান অ্যাথেলেটিক ক্লাব”। ১৯০৪ সালে কোচবিহার কাপে অংশ নিয়ে মোহনবাগান প্রথম ট্রফি জেতে। ১৯০৫ সালে তাঁরা আবার এই ট্রফি পায়। ১৯০৬ সালে তাঁরা “ট্রেডস কাপ”, “গ্ল্যাডস্টোন কাপ” এবং “কোচবিহার কাপ” একসঙ্গে জিতে নেয়। ১৯১১ সালে খালি পায়ে খেলে “ইস্ট ইয়র্কশায়ার রেজিমেন্ট”কে ২-১ গোলে পরাজিত করে প্রথম ভারতীয় দল হিসাবে “আই এফ এ শিল্ড” জেতে মোহনবাগান। এই ম্যাচে তৎকালীন মোহনবাগান অধিনায়ক “শিবদাস ভাদুড়ি” এবং “অভিলাস ঘোষ” মোহনবাগানের হয়ে গোল করেন। ১৯৩৭ সালে ইংল্যান্ডের “ইংলিশটন করিন্থিয়ান্স” এর বিরুদ্ধে প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে তাঁরা। ১৯৩৯ সালে প্রথম “কলকাতা লিগ” চ্যাম্পিয়ন হয় মোহনবাগান। স্বাধীন ভারতবর্ষের প্রথম দল হিসাবেও ১৯৪৭ সালে আবার “আই এফ এ শিল্ড’’ জিতে নেয় তাঁরা। ১৯৭৭ সালে বিখ্যাত নর্থ আমেরিকান সকার লিগ দল “নিউ ইয়র্ক কসমস” এর সাথে একটি মৈত্রী ফুটবল ম্যাচ খেলে মোহনবাগান। এই ম্যাচে বিখ্যাত ব্রাজিলিয়ান ফুটবলার “পেলে” কসমস দলের হয়ে খেলেছিলেন। “ইডেন গার্ডেনস” স্টেডিয়ামে প্রায় ৮০ হাজার দর্শকের সামনে শেষ অবধি ২-২ ফলাফলে শেষ হয় ম্যাচটি। ২০০৮ সালে বিখ্যাত জার্মান দল “বায়ার্ন মিউনিখ” এর বিরুদ্ধে খেলার সু্যোগ পায় মোহনবাগান। “যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গন”এ অনুষ্ঠিত এই ম্যাচটিকে জার্মান গোলরক্ষক “অলিভার কান” তাঁর অবসর ম্যাচ হিসাবে ঘোষণা করেন।
ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের গল্প- ১৯২০ সালের কোচবিহার কাপে মোহনবাগান এবং জোড়াবাগান এর মধ্যে একটি খেলায় জোড়াবাগান তাঁদের টিম লিস্ট জমা দিলেও ডিফেন্ডার “শৈলেষ বোস” সেই দলে জায়গা পাননি। জোড়াবাগান ক্লাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট “সুরেশ চন্দ্র চৌধুরি” তাঁদের কোচের কাছে “শৈলেষ বোস” এর দলে জায়গা না পাওয়ার কথা জানালেও কোচ তা শুনতে চাননি। এর ফলে তিনি দলত্যাগ করেন এবং “রাজা মন্মথ নাথ চৌধুরি”, “সুরেশ চন্দ্র চৌধুরি” ও “অরবিন্দ ঘোষ” এর সহযোগীতায় সেই বছরই ১লা আগস্ট তৈরি করেন “ইস্টবেঙ্গল ক্লাব”।
“হারকিউলিস কাপ” নামক একটি ৭-এ সাইড প্রতিযোগিতায় প্রথম অংশগ্রহন করে ইস্টবেঙ্গল তা চ্যাম্পিয়ন হয়। ১৯৪২ সালে ইস্টবেঙ্গল “আই এফ এ প্রথম ডিভিশন” শিরোপা জেতে। ১৯৪৩ সালে প্রথম “আই এফ এ শিল্ড” এবং এবং ১৯৪৫ সালে প্রথম “কলকাতা ফুটবল লিগ” চ্যাম্পিয়ন হয় তাঁরা। ১৯৪৫ সালেই তাঁরা আবার “আই এফ এ শিল্ড” জিতে নেয়। ১৯৭০ সালে ইরানের “পাস” ক্লাবকে হারিয়ে সবাইকে চমকে দেয় ইস্টবেঙ্গল। ১৯৭০-১৯৭৫ সালে তাঁরা অনবরত ৬ বার “কলকাতা ফুটবল লিগ” জিতে “মোহমেডান স্পোর্টিং ক্লাব” এর ৫ বারের রেকর্ড ভেঙে দেয়। ১৯৯৩ সালে ইস্টবেঙ্গল তাঁদের প্রথম আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট(ওয়াই ওয়াই কাপ-নেপাল) জেতে। ১৯৯৮ সালে “কিংফিশার” গ্রুপ এর সাথে যুক্ত হয়ে ক্লাবের নতুন নাম হয় “কিংফিশার ইস্টবেঙ্গল ক্লাব”। ২০০৩ সালে তাঁরা ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তায় “আশিয়ান ক্লাব চ্যাম্পিয়নশিপ” জিতে নেয়। ২০১০-২০১৬ সালে তাঁরা পর পর ৭ বার “কলকাতা ফুটবল লিগ” জিতে নতুন রেকর্ডের সৃষ্টি করে। ২০১৩ সালে প্রথম ভারতীয় দল হিসাবে “এ এফ সি কাপ” এর সেমিফাইনাল খেলে ইস্টবেঙ্গল।
মোহমেডান ক্লাবের গল্প- ১৮৮৭ সালে “নবাব আমিনুল ইসলাম” এর নেতৃত্বে তৈরি হয় “ক্রিসেন্ট ক্লাব”। তারপর এই ক্লাবের নাম বদলে রাখা হয় “হামিদিয়া ক্লাব”। অবশেষে ১৮৯১ সালে এই ক্লাব “মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব” নামে পরিচিতি লাভ করে। ১৯০২ সালে তাঁরা প্রথম কোচবিহার কাপ জেতে। ১৯৩৩ সালে কলকাতা ফুটবল লিগের প্রথম ডিভিশনে খেলার সুযোগ পায় মোহামেডান। দেশের নানান প্রান্ত থেকে খেলোয়াড় জোগাড় করে ১৯৩৪ সালে তাঁরা প্রথম ভারতীয় দল হিসাবে কলকাতা ফুটবল লিগ চ্যাম্পিয়ন হয়। ১৯৩৪-১৯৩৮ সালে টানা পাঁচবার এই লিগ জিতে তাঁরা রেকর্ড সৃষ্টি করে। ১৯৩৬ সালে মোহনবাগানের পর দ্বিতীয় ভারতীয় ক্লাব হিসাবে আইএফএ শিল্ড এবং প্রথম ভারতীয় ক্লাব হিসাবে ১৯৪০ সালে ডুরান্ড কাপ জেতে মোহামেডান। ১৯৬০ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত “আগা খান গোল্ড কাপ” চ্যাম্পিয়ন হয়ে প্রথম ভারতীয় দল হিসাবে বিদেশের মাটিতে ট্রফি জেতার কৃতিত্ব স্থাপন করে তাঁরা। ১৯৮৩ সালে তাঁরা ফেডারেশন কাপ চ্যাম্পিয়ন হয়। বর্তমানে আই-লিগ এর দ্বিতীয় ডিভিশনে খেলছে মোহামেডান।
ক্রিকেটের গল্প- বাবার মুখে শুনেছি যতদূর তিনি জানেন ১৫৯৮ সালে দক্ষিণ-পূর্ব ইংল্যান্ডে প্রথমবার ক্রিকেট খেলা হয়, যদিও সেইসময় এই খেলা শিশুদের খেলা হিসাবেই পরিগণিত হত। ১৬১১ সালে এক রোববার বিকেলে কিছু ব্রিটিশমেন চার্চ এ যাওয়ার বদলে মনোরঞ্জনের জন্য ক্রিকেট খেলাকেই বেছে নেন এবং সেই থেকেই এই খেলা প্রাপ্তবয়স্ক দের খেলা হিসেবে রুপ নেয়। আঠারোশো শতাব্দী তে ক্রিকেট খেলা ছড়িয়ে পরে ওয়েস্ট-ইন্ডিজ, ভারত এবং অস্ট্রেলিয়া তে। উনিশ-শ শতাব্দীর শুরুর দিকে নিউজিল্যান্ড এবং সাউথ আফ্রিকা পরিচিত হয় ক্রিকেটের সাথে। ১৭২৮ সালে তৈরি হয় ক্রিকেটের প্রথম পর্যায়ের যাবতীয় নিয়ম। ১৭৭২ সাল থেকে ক্রিকেটের স্কোরবোর্ড সংরক্ষণ করা শুরু হয়। উনিশ-শ শতকে সমস্ত আধুনিক কাউন্টি ক্লাবের সূচনা হয়। প্রথম আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচ খেলা হয় “আমেরিকা” এবং “কানাডা”র মধ্যে ১৮৪৪ সালে নিউ ইয়র্কের “সেন্ট জর্জ ক্রিকেট ক্লাব”এ। ঘরোয়া ক্রিকেটে সবথেকে বড় পরিবর্তন দেখা যায় ১৮৯০ সালে যখন ইংল্যান্ডে “কাউন্টি চ্যাম্পিয়নশিপ” শুরু হয়। ১৮৯২-১৮৯৩ সালে অস্ট্রেলিয়ায় শুরু হয় “শেফিল্ড শিল্ড”। এরপর ধীরে ধীরে ঘরোয়া ক্রিকেটের প্রসার লাভ করে “কারি কাপ”(সাউথ আফ্রিকা), “প্লাঙ্কেট শিল্ড”(নিউজিল্যান্ড) এবং “রঞ্জি ট্রফি”(ভারত) এর হাত ধরে। অতীতে প্রত্যেক ওভারে খেলা হত চার বল করে, ১৮৮৯ সালে এই প্রথা ভেঙে প্রত্যেক ওভারে ৫ বলের নিয়ম ধার্য হয়। এরপর ১৯৯০ সালে শুরু হয় ছয় বলের ওভার। ১৯২২ সাল থেকে নতুন পরীক্ষা-নিরিক্ষার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে শুরু হয় প্রতি ওভারে ৮ বল করে খেলা। ১৯৮০ সালে অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড এর খেলায় পুনরায় ছয় বলের ওভার শুরু হয়। ১৯৭১ সালে অস্ট্রেলিয়ার “মেলবোর্ণ ক্রিকেট গ্রাউন্ড” এ অনুষ্ঠিত একটি টেস্ট ম্যাচ বৃষ্টিবিঘ্নিত হওয়ার দরুন প্রথম দিনের পরেই তা ভেস্তে যায়। এরপর খেলোয়াড়দের অনুশীলনের উদ্দেশ্যে এবং উত্তেজিত দর্শকদের সামলাতে একটি সীমিত ওভারের(৪০ ওভার) খেলা হয়, যা পরবর্তীকালে জনপ্রীয়তা লাভ করে এবং বিশ্বদরবারে একদিনের খেলা হিসাবে পরিচিত হয়। অতীতে রান আউট কিংবা স্টাম্পিং এর ক্ষেত্রে মাঠে উপস্থিত আম্পায়ারদের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হত। এক্ষেত্রে খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দরুন আম্পায়ারদের অনেক ভুল-ত্রুটিও প্রকাশ পায়। যার ফলস্বরুপ ১৯৯২ সালে নতুন সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় এবং দক্ষিণ-আফ্রিকা ও ভারত এর মধ্যে একটি টেস্ট সিরিজ চলাকালীন প্রথম “থার্ড আম্পায়ার” প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়। নতুন এই প্রযুক্তিতে মাঠে উপস্থিত দু-জন আম্পায়ার এর সাথে আরেকজন আম্পায়ার যুক্ত হন, যিনি মাঠের বাইরে উপস্থিত থেকে মাঠের ভিতরের আম্পায়ারদের সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করেন। পরবর্তীকালে এই প্রযুক্তির আমূল পরিবর্তন ঘটে এবং বর্তমানে খেলোয়াড়েরা আম্পায়ারের সিদ্ধান্তকে পুনরায় পরীক্ষা করার সুযোগ পান ডিআরএস(Decision review system) এর মাধ্যমে।


বিশ্বকাপ ক্রিকেটের গল্প- ১৯৭১ সালে অনুষ্ঠিত হওয়া প্রথম সীমিত ওভারের আন্তর্জাতিক ম্যাচের জনপ্রিয়তা এবং ঘরোয়া ক্রিকেটে একদিনের ম্যাচ আয়োজনের প্রেক্ষিতে আইসিসি(International cricket council) কতৃপক্ষ বিশ্বকাপ ক্রিকেট আয়োজনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। ১৯৭৫ সালে ইংল্যান্ডে প্রথমবার বিশ্বকাপ ক্রিকেট অনুষ্ঠিত হয়। “প্রুডেন্সিয়াল প্রাইভেট কোম্পানি”র আর্থিক সহযোগিতায় প্রথম তিনটি প্রতিযোগিতা “প্রুডেন্সিয়াল কাপ” নামে পরিচিতি পায়। এই টুর্নামেন্টের খেলাগুলি ছিল ৬০ ওভারব্যাপী এবং সাদা পোশাক ও লাল বলে খেলা হত। ১৯৭৫ এবং ১৯৭৯ সালের বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন হয় ওয়েস্ট-ইন্ডিজ। ১৯৮৩ সালে ধারাবাহিক ভাবে বিশ্বকাপ ফাইনালে ওঠে ওয়েস্ট-ইন্ডিজ, কিন্তু ৪৩ রানে তাঁদের হারিয়ে প্রথম বিশ্বকাপ জেতে ভারত। ১৯৮৭ সালের বিশ্বকাপ ক্রিকেট অনুষ্ঠিত হয় যৌথভাবে ভারত ও পাকিস্তানে। এই বিশ্বকাপেই প্রথম ৬০ ওভারের বদলে ৫০ ওভারের আন্তর্জাতিক ম্যাচের সূচনা হয়। ১৯৯২ সালের ক্রিকেট বিশ্বকাপে ঘটে আমূল পরিবর্তন। যৌথভাবে অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ড এ অনুষ্ঠিত এই বিশ্বকাপে শুরু হয় দিন রাতের খেলা এবং রঙিন পোশাক ও সাদা বলের ব্যবহার। এখনও পর্যন্ত সর্বাধিক পাঁচবার বিশ্বকাপ জয়ী দেশের নাম অস্ট্রেলিয়া। তাঁরা ১৯৮৭, ১৯৯৯, ২০০৩, ২০০৭ এবং ২০১৫ সালে বিশ্বকাপ জিতে নেয়।


ভারতীয় ক্রিকেটের গল্প- ভারতের প্রথম ক্রিকেট ক্লাবের নাম “ক্যালকাটা ক্লাব”, যা ১৭৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৪০ বছর পর ১৯৩২ সালে ভারতীয় জাতীয় দল প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে “লর্ডস”এ। এই ম্যাচে তাঁরা ১৫৮ রানে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে পরাজিত হয়। আরও ২০ বছর পর ১৯৫২ সালে ভারত তাঁদের প্রথম আন্তর্জাতিক টেস্ট ম্যাচে জয়লাভ করে মাদ্রাজে। এই বছরই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে একটি টেস্ট সিরিজেও জয়লাভ করে ভারত। ১৯৭৫ এবং ১৯৭৯ সালের বিশ্বকাপে ডিফেন্সিভ ব্যাটিং এর মনোভাব এর কারনে প্রথম রাউন্ড থেকেই বিদায় নেয় ভারত। এরপর ১৯৮৩ সালে তৎকালীন অধিনায়ক “কপিল দেব” এর নেতৃত্বে বিশ্বকাপ ফাইনালে প্রবল শক্তিশালী দেশ এবং গত দুবছরের চ্যাম্পিয়ন ওয়েষ্ট-ইন্ডিজ কে হারিয়ে প্রথম বিশ্বকাপ জেতে ভারত।

২০০০ সালে প্রথম বিদেশি হিসাবে “জন রাইট” কে বিসিসিআই(Board of control for cricket in India) তাঁদের কাচ নিযুক্ত করে। জন রাইট এর প্রশিক্ষনেই ২০০১ সালে কলকাতার “ইডেন গার্ডেনস” স্টেডিয়ামে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে একটি টেস্ট ম্যাচে ভারত তাঁদের স্মরণীয় জয়টি তুলে নেয়। প্রথম ইনিংসে ফলো-অনের পরেও, “ভিভিএস লক্ষণ”, “রাহুল দ্রাবিড়”, “হরভজন সিং” প্রমুখ ক্রিকেটারদের দুর্দান্ত অবদানে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে দেয় ভারত। ২০০৩ সালে “সৌরভ গাঙ্গুলি”র নেতৃত্বে বিশ্বকাপ ফাইনালে পৌঁছায় ভারত, কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার কাছে পরাজিত হয় তাঁরা। “মহেন্দ্র সিং ধোনি”র নেতৃত্বে ২০০৭ সালে দক্ষিণ-আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত হওয়া প্রথম টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন হয় ভারত। ২০১১ সালে ধোনির নেতৃত্বেই দীর্ঘ ২৮ বছর পর ভারত-বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিত ৫০ ওভারের আন্তর্জাতিক বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন হয় ভারত। ২০০৭ সালে ভারতে সূচনা হয় “আইপিএল”(Indian premier league)এর, যা বর্তমানে বিশ্বের ক্লাব টুর্নামেন্ট গুলির মধ্যে সবথেকে বেশি জনপ্রিয়তা লাভ করেছে।
এবার আসা যাক পৃথিবীর সবথেকে প্রাচীন খেলার গল্পে-
অলিম্পিক গেমসের গল্প- অলিম্পিক গেমসের ইতিহাস নিয়ে কৌতুহল রয়েছে অনেক মানুষেরই। প্রাচীন লিপি অনুসারে গ্রীসের দেবতা “জিউস” এর আবাসস্থল অলিম্পিয়ায় ধর্মীয় রীতি রেওয়াজের সাথে অলিম্পিক গেমস ও অনুষ্ঠিত হত। মূলত প্রাচীন গ্রিক নগরের প্রতিনিধিরাই এই ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতেন। মল্লযুদ্ধ, ঘোরদৌড়, রথ প্রতিযোগিতার মত অনেক প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হত। জনপ্রিয় একটি গল্পকথা মতে, দেবতা “জিউস” এবং তাঁর পুত্র “হেরাক্লিস” বা “হারকিউলিস” এই অলিম্পিক গেমসের জনক এবং এর সূচনা ঘটেছিল প্রায় খ্রিষ্টপূর্ব ৭৭৬ সালে। অলিম্পিক এর বিজয়ীরা বিভিন্ন সম্মানে ভূষিত হতেন, তাদের উদ্দেশ্যে গান ও কবিতাও লেখা হত। এই অনুষ্ঠান প্রতি চার বছর অন্তর অনুষ্ঠিত হত এবং এই চার বছরকে বলা হত এক অলিম্পিয়াড। খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ এবং পঞ্চম শতকে অলিম্পিক গেমস জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছালেও রোমের ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং গ্রীস এর উপর এর প্রভাব বিস্তারের সাথে সাথে অলিম্পিকের কার্যকারিতা হ্রাস পেতে শুরু করে। জানা যায় ৪২৬ খ্রীষ্টাব্দে যখন “দ্বিতীয় থিওডিয়াস” সমস্ত গ্রিক মন্দির ধ্বংস করার আদেশ দেন, তখনই এই গেমসের বিলুপ্তি ঘটে।

আধুনিক অলিম্পিক গেমস- আধুনিক যুগে অলিম্পিক গেমস বলতে সতেরো-শ শতাব্দীর দিকে শুরু হওয়া আধুনিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতাকেই বোঝায়। এই ধরনের প্রথম অনুষ্ঠান হল ইংল্যান্ডে শুরু হওয়া “কোটসউল্ড অলিম্পিক গেমস”। ১৬১২ থেকে ১৬৪২ সালের মধ্যে এই গেমসের প্রধান আয়োজক ছিলেন “রবার্ট ডোভার”। ফ্রান্সে ১৭৯৬ থেকে ১৭৯৮ সালের মধ্যে অনুষ্ঠিত “এল অলিম্পিয়েড ডি লা রিপাবলিক গেমস”ও অলিম্পিকের ঐতিহ্য বহন করে। ১৮৫০ সালে ইংল্যান্ডের মাক ওয়েলনকে “ডঃ উইলিয়াম পেনি ব্রুকস” নতুনভাবে অলিম্পিক গেমসের সূচনা করেন। ডঃ ব্রুকস এর সূচনা করা অলিম্পিক গেমসই ধারাবাহিক ভাবে আজও চলে আসছে। ১৮৯০ সালে “পিয়ের দ্য কুবেরত্যাঁ” এবং ডঃ ব্রুকস এমন একটি অলিম্পিক কমিটি গঠনের পরিকল্পনা করেন যা প্রত্যেক চার বছর অন্তর বিভিন্ন দেশে অলিম্পিক গেমস আয়োজন করবে। আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির তত্ত্বাবধানে প্রথম অলিম্পিক গেমস অনুষ্ঠিত হয় ১৮৯৬ সালে এথেন্সের “প্যানাথেনেইক” স্টেডিয়ামে। এই গেমসে ৪৩ টি প্রতিযোগিতায় ১৪ টি দেশের প্রায় ২৪১ জন ক্রীড়াবিদ অংশগ্রহন করেছিলেন। ১৯০০ এবং ১৯০৪ সালের অলিম্পিক গেমস অনুষ্ঠিত হয় ফ্রান্সের “প্যারিস” এবং যুক্ত্ররাষ্ট্রের “সেন্ট লুইস” শহরে। প্যারিসে অনুষ্ঠিত গেমসে প্রথমবার মহিলারা অংশগ্রহন করায়, এই প্রতিযোগিতা স্মরণীয় হয়ে থাকে।
শীতকালীন অলিম্পিক- তুষার এবং বরফের বিভিন্ন খেলা (ফিগার স্কেটিং, আইস হকি ইত্যাদি) গ্রীষ্মকালে আয়োজন করা ছিল প্রায় অসম্ভব। ফলস্বরুপ ১৯২৮ সালে সূচনা হয় শীতকালীন অলিম্পিকের।
প্যারা অলিম্পিক- ১৯৪৮ সালে “স্যার লুডউইক গ্র্যাডম্যান” দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আহত সৈনিকদের পুনর্বাসনের জন্য কয়েকটি হাসপাতালের মধ্যে সেই বছরই অনুষ্ঠিত হওয়া লন্ডন অলিম্পিকের মত করে মাল্টি ইভেন্ট প্রতিযোগিতা চালু করেন। গ্যাটম্যানের এই ইভেন্টটি “স্টোক মেন্ডিভেল গেমস” নামে পরিচিত হয়। রোমে অনুষ্ঠিত ১৯৬০ সালের অলিম্পিকে প্রায় ৪০০ জন ক্রীড়াবিদ অংশগ্রহন করেন। এটিই ছিল অলিম্পিক ইতিহাসের প্রথম প্যারালিম্পিক। ১৯৮৮ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার “সিউল”এ প্রথমবার গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক এবং প্যারালিম্পিক একসাথে অনুষ্ঠিত হয়। ২০০১ সালে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি এবং আন্তর্জাতিক প্যারালিম্পিক কমিটি একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে, যাতে স্থির হয়- যে দেশ অলিম্পিক গেমসের আয়োজক হবে একই সাথে প্যারালিম্পিক গেমসও আয়োজক করতে হবে তাদেরই।
যুব অলিম্পিক- ১৪ থেকে ১৮ বছর বয়সী ক্রীড়াবিদদের সুযোগ করে দেওয়ার জন্য ২০১০ সালে মূল অলিম্পিক গেমসের সাথে যুব অলিম্পিক গেমসের সংযোজন করা হয়। এই বছরই সিঙ্গাপুরে প্রথম যুব অলিম্পিক গেমস অনুষ্ঠিত হয়, এর শীতকালীন আসর বসে দু-বছর পর অস্ট্রিয়ার “ইন্সব্রুকে”
একবিংশ শতাব্দীতে অলিম্পিক- ১৮৯৬ সালের আসরে ১৪ টি দেশের মাত্র ২৪১ জন ক্রীড়িবিদকে নিয়ে যে অলিম্পিক গেমসের যাত্রা শুরু হয়েছিল, ২০১২ সালের অলিম্পিকে তা ২০৪ টি দেশের ১০৫০০ জন ক্রীড়াবিদের একটি মহান প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়। গেমস চলাকালীন খেলোয়াড় এবং আধিকিরিকদের যে স্থানে থাকতে দেওয়া হয় তাকে “অলিম্পিক ভিলেজ” বলা হয়। এখানে ক্যাফেটেরিয়া, স্বাস্থ্য কেন্দ্র এবং ধর্মীয় আচার পালনের স্থান সহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধাও দেওয়া হয়।

অলিম্পিক প্রতীক- মূলত পাঁচটি বলয় অলিম্পিক এর প্রতীক হিসাবে পরিচিত। এই পাঁচটি বলয় আফ্রিকা, আমেরিকা, এশিয়া, ওশিয়ানিয়া এবং ইউরোপ মহাদেশকে নির্দেশ করে। পাঁচটি বলয়ের পাঁচটি রঙ নীল, হলুদ, কালো, সবুজ ও লাল চয়ন করার মূল কারণ হল এই পাঁচটি রঙের অন্তত যে কোনো একটি বা একাধিক রঙ প্রত্যেক দেশের পতাকায় ব্যবহৃত হয়েছে। অলিম্পিকের এই প্রতীক ১৯১৪ সালে গৃহীত হয়। ১৯৩৬ সাল থেকে অলিম্পিকের আরও একটি অন্যতম প্রতীক হিসাবে “মশাল দৌড়” এবং “ম্যাস্কট” এর সংযোজন করা হয়। এই ম্যাস্কট মূলত আয়োজক দেশের কোনো সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের দ্যোতক জন্তু বা মানুষের মূর্তি।
পুরস্কার বিতরনী- অলিম্পিক গেমসের প্রতিটি বিভাগের প্রতিযোগিতার শেষে প্রথম, দ্বিতীয় এবং তৃতীয় স্থানাধিকারিদের যথাক্রমে স্বর্ণ, রৌপ্য এবং ব্রোঞ্জ পদক প্রদান করা হয়। বিজয়ী দেশের সর্বাধিক পদক জয়ীকে তাঁর দেশের প্রতিনিধি হিসাবেও মেডেল প্রদান করা হয়। এখনও পর্যন্ত অলিম্পিকে সাফল্যের বিচারে প্রথম তিনটি সফল দেশের নাম হল “আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র”, “সোভিয়েত ইউনিয়ন” এবং “গ্রেট ব্রিটেন”।
অলিম্পিকে ভারত- ১৯০০ সালের প্যারিস অলিম্পিকে প্রথমবার অংশগ্রহণ করে ভারত। তৎকালীন ব্রিটিশ শাসিত ভারতবর্ষ থেকে একমাত্র “নরম্যান প্রিচারড” এই গেমসে অংশগ্রহণ করেন এবং অ্যাথেলেটিক্স এ দুটি রৌপ্য পদক জিতে নেন। ১৯২০ সালের অলিম্পিকে ভারত প্রথমবার দল পাঠায় এবং ১৯২৮ সাল থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত ভারতীয় জাতীয় হকি দল মোট ১১ টি পদক জয়লাভ করে, যার মধ্যে ৮ টি স্বর্ণ পদক জেতে তাঁরা। ভারতের অলিম্পিক ইতিহাসে সবথেকে বড় নাম “ধ্যাঁন চাঁদ”। ইনি ভারতকে হকিতে ৩ টি স্বর্ণ পদক এনে দেন। অলিম্পিক গেমসে এখনও পর্যন্ত ভারত মোট ৯ টি স্বর্ণ, ৭ টি রৌপ্য এবং ১২ টি ব্রোঞ্জ পদক জিতেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *