আর্থিক স্বাবলম্বিতার লক্ষ্যে স্বল্প খরচে চুই চাষ


অগ্নিভ হালদার, বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, উদ্যানবিদ্যা অনুষদ, নদীয়া ##

চই বা চুই লতা এক ভেষজ গুণ সম্পন্ন এক উদ্ভিদ। চুই গ্রীষ্ম অঞ্চলের লতা জাতীয় ফসল। দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশে খুব ভালো ভাবে জন্মায়। বিশেষ করে ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান, মায়ানমার, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সিঙ্গাপুর, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড চুই চাষের জন্য উপযোগী। বর্তমানে বাংলাদেশের কিছু আগ্রহী চাষি এটিকে এখন প্রাত্যাহিকতার আবশ্যকীয় উপকরণের মধ্যে নিয়ে এসেছেন। আমাদের দেশের পশ্চিমবঙ্গ এবং ত্রিপুরা রাজ্যে চুই খাওয়ার চল আছে। অন্য গাছের সাথে আশ্রয় নিয়ে এরা বেড়ে উঠে। মোটামুটি সব গাছের সাথেই বাড়ে। এর মধ্যে আম, মেহগিনি, সুপারি, শিমুল গাছে ভালো হয়। তবে আম গাছে বেড়ে ওঠা চই সবচেয়ে বেশি ভালো মানের (স্বাদের) হয়।

চুই গাছের বোটানি :

চুই গাছ অনেকেরই অচেনা, চুইয়ের বোটানিক্যাল নাম পেপারচাবা(Piper chaba), পরিবার পিপারেসি(Piperaceae), জেনাসপিপার(Piper) এবং স্পেসিসহলো পিপারচাবা(Piper chaba)। লতা সুযোগ পেলে ৪০ থেকে ৫০ ফুট পর্যন্ত বাড়ে। পাতা হার্টের মতো আকারের ২ থেকে ৩ ইঞ্চি লম্বা হয়। আর পিপুলের(Piper longum) পাতার লতার সাথেও বেশ সামঞ্জস্য পাওয়া যায়। পুরুষ স্ত্রী ফুল আলাদা লতায় জন্মায়। পরাগায়ন প্রাকৃতিক ভাবেই সম্পন্ন হয়। ফুল লম্বাটে দূর থেকে দেখতে অনেকটা লংকার মতো। ফলের ব্যাস ১ ইঞ্চির মতো। ফল সাধারণত লাল রঙের হয়। তবে পরিপক্ব হলে বাদামি বা কালো রঙের হয়ে যায়। বর্ষায় ফুল আসে, শীতের শুরুতে ফল আসে। চুই লতা জাতীয় অর্থকরী ফসল। এর কাণ্ড ধূসর এবং পাতা পান পাতার মতো সবুজ রঙের। এর কাণ্ড, শিকড়, শাখা, প্রশাখা সবই মসলা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। চুই সাধারণত দুই প্রকার, একটির কাণ্ড আকারে বেশ মোটা ২০ থেকে ২৫ সেন্টিমিটার, অন্যটির কান্ড চিকন, আকারে ২.৫ থেকে ৫ সেন্টিমিটার। চুই গাছ ১০ থেকে ১৫ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়, দীর্ঘদিন পর্যন্ত বেঁচে থাকে।

রাসায়নিক উপাদান :


চুই ঝালে ০.৭ শতাংশ সুগন্ধি তেল রয়েছে। অ্যালকালয়েড ও পিপালারটিন আছে ৫ শতাংশ। তা ছাড়া ৪ থেকে ৫ শতাংশ পোপিরন থাকে। এ ছাড়া পোলার্টিন, গ্লাইকোসাইডস, মিউসিলেজ, গ্লুকোজ, ফ্রুক্টোজ, সিজামিন, পিপলাসটেরল এসব থাকে পরিমাণ মতো। এর কাণ্ড, শিকড়, পাতা, ফুল, ফল, সব ভেষজগুণ সম্পন্ন। শিকড়ে থাকে ০.১৩ থেকে ০.১৫ শতাংশ পিপারিন। এসব উপাদান মানব দেহের জন্য খুব উপকারী।

ঔষধিগুণ :


চুই ঝালে আছে অসাধারণ ঔষধি গুণ।

চুই ঝাল-
১.     গ্যাস্ট্রিক সমস্যার সমাধান করেও কোষ্ঠ কাঠিন্য দূর করে;
২.     খাবারের রুচি বাড়াতে এবং ক্ষুধা মন্দা দূর করতে কার্যকর ভূমিকা রাখে;
৩.     পাকস্থলী ও অন্ত্রের প্রদাহ সারাতে চুই ঝাল অনেক উপকারী;
৪.     স্নায়ুবিক উত্তেজনা ও মানসিক অস্থিরতা প্রশমণ করে;
৫.     ঘুমের ওষুধ হিসেবে কাজ করে এবং শারীরিক দুর্বলতা কাটাতে এবং শরীরের ব্যথা সারায়;
৬.     সদ্য প্রসূতি মায়েদের শরীরের ব্যথা দ্রুত কমাতে অব্যার্থ মহৌষধ হিসেবে চুই ঝাল কাজ করে;
৭.     কাশি, কফ, হাঁপানি, শ্বাসকষ্ট, ডায়রিয়া ও রক্তস্বল্পতা দূর করে;
৮.     মাত্র এক ইঞ্চি পরিমাণ চুই লতার সাথে আদা পিষে খেলে সর্দি সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়


বংশ বিস্তার :


বীজ ও লতার কাটিং দিয়ে বংশ বিস্তার করা যায়। বীজ থেকে বংশ বিস্তার জটিল ও সময়সাপেক্ষ,তবে লতার কাটিংয়ে বৃদ্ধি তাড়াতাড়ি হয় এবং ফলন দ্রুত পাওয়া যায়। পশ্চিমবঙ্গের সামান্য কিছু নার্সারিতে চুই ঝালের চারা (কাটিং)পাওয়া যায়।

জমি ও মাটি :


দো-আঁশ ও বেলে দো-আঁশ মাটি এবং জলনিষ্কাশনের সুবিধাযুক্ত ও ছায়াময় উঁচু জমিতে সাধারণত চুই চাষ করা হয়। চুই ঝালের জন্য আলাদা কোনো মাটি জমির প্রয়োজন নেই সাধারণ ফল বাগান বা বৃক্ষ বাগানের মাটি জমির উপযুক্ত তাই চুইয়ের জন্য উপযুক্ত। শুধু খেয়াল রাখতে হবে বর্ষায় বা বন্যায় যেন চুই ঝাল গাছে গোড়ায় জল না জমে।
রোপণের সময় :
বৈশাখ জ্যৈষ্ঠ (এপ্রিল-মে) এবং আশ্বিন-কার্তিক (অক্টোবর-নভেম্বর) মাস এই দুইবার হলো চুই ঝালের লতা রোপণের উপযুক্ত সময়।
অঙ্গজ প্রজনন বা লতা কাটিং পদ্ধতিতে এর কাণ্ড বা শাখা ৫০ থেকে ৭৫ সেন্টিমিটার লম্বা করে কেটে সরাসরি মাটিতে রোপণ করা হয়। স্থানীয় ভাবে কাটিং বা শাখাকে পোড় বলা হয়। একটি পোড়ে কমপক্ষে ৪-৫ টি পর্বসন্ধি থাকে। বাণ্যিজিক ভাবে পলিব্যাগে চারা তৈরি করা হয়। তারপর ২০-২৫ দিন পর পলিব্যাগ থেকে চারা নিয়ে মূল জমিতে রোপণ করা হয়।

কাটিং শোধন :


ভালো রোগমুক্ত চাষের জন্য চুইঝালের চারা তৈরির আগে কাটিং রোপণের সময় অবশ্যই শোধন করে নিতে হবে। ১ লিটার জলে ২-৩ গ্রাম কারবানডাজিন/ব্যাভিস্টিন বা অন্য কোনো উপযুক্ত ছত্রাক নাশক মিশিয়ে কাটিং ৩০ মিনিট চুবিয়ে রাখার পর পরিষ্কার জল দিয়ে ধুয়ে ফেলে কাটিং রোপণ করতে হবে। এতে পরে রোগ পোকার আক্রমণ হয় না বা অনেক কম হয়। ফলে লতা ভালো ভাবে বেড়ে উঠে।

সার ও সেচ ব্যবস্থাপনা :


চুই চাষে চাষিরা সাধারণত কোনো রাসায়নিক সার ব্যবহার করেন না। শাখা রোপণের আগে গর্তে পচা আবর্জনা বা ছাই বা গোবর ব্যবহার করেন। তবে কেউ কেউ কোথাও কোথাও কৃষি বিভাগের পরামর্শ অনুযায়ী সাধারণ হারে ইউরিয়া, এস এস পি, এমওপি বর্ষার আগে ও পরে গাছের গোড়া থেকে ১ হাত দূরে প্রয়োগ করেন। শুকনো মৌসুমে সেচের ব্যবস্থা করতে হয়। অন্তত সপ্তাহে ১ বার গাছের গোড়ায় সেচ দিলে গাছের বৃদ্ধি স্বাভাবিক থাকে। আর বর্ষা কালে চুই ঝালের গোড়ায় যাতে জল না জমে সেদিকে বিশেষ খেয়াল রাখতে হয়।

লতার আরোহনের উপযুক্ত ব্যবস্থাপনা :

চুই ঝাল যেহেতু লতা জাতীয় তাই এর জন্য আরোহণের সাপোর্ট লাগে। চুই ঝালের জন্য আলাদা জমির প্রয়োজন হয় না। বিভিন্ন আরোহী গাছের সাথে আরোহণের ব্যবস্থা করে দিলেই হয়। এতে মূল গাছের বাড়বাড়ন্তে বা ফলনে কোনো সমস্যা হয় না। সে ক্ষেত্রে আম, কাঁঠাল, জাম, সুপারি, নারিকেল, মেহগনি ও জিয়ল গাছ বাউনি হিসেবে চুই চাষের জন্য ব্যবহৃত হয়। বাউনি না দিলেও মাটিতে বাড়তে পারে। এক্ষেত্রে বর্ষা মৌসুমে গাছের লতার বেশ ক্ষতি হয়। কৃষকদের মতে আম, কাঁঠাল ও জিয়ল গাছে চাষকৃত চুই খুব সুস্বাদু হয়। তবে অন্যান্য গাছের  চুই ঝাল গুণেমানে কিন্তু কম নয়।


ফসল সংগ্রহ ও ফলন :

চুই লাগানোর বা রোপণের ১ বছরের মাথায় খাওয়ার উপযোগী হয়। তবে ভালো ফলনের জন্য ৫-৬ বছর বয়সের গাছই উত্তম। হেক্টর প্রতি ২.০ থেকে ২.৫ মেট্রিক টন ফলন পাওয়া যায়। ৫-৬ বছরের একটি গাছ থেকে বছরে প্রায় ১৫ থেকে ২৫ কেজি পর্যন্ত চুই ঝাল লতার ফলন পাওয়া যায়।


চুইয়ের ব্যবহার :


কাণ্ড খাওয়ার জন্য ব্যবহৃত হয়, বড় বড় মাছ বা যে কোনো মাংসের সাথে রান্না করে খাওয়া যায়। আঁশ যুক্ত নরম কাণ্ডের স্বাদ ঝাল যুক্ত। কাঁচা কাণ্ড ও অনেকে লবণ দিয়ে খান। ছোলা, ভাজি, আচার, হালিম, চটপটি, ঝালমুড়ি, চপ ও ভর্তা তৈরিতে চুই ঝাল ব্যবহৃত হয়। মোট কথা লংকা, গোলমরিচ ঝালের বিকল্প হিসেবে যে কোনো কাজে চুই ঝাল ব্যবহার করা যায়।


অর্থনৈতিক গুরুত্ব :


নার্সারি শিল্পে চুই ঝাল একটি মূল্যবান উপকরণ উপাদান হিসেবে বিশেষ বিবেচনা করা যায়। শুকনো এবং কাঁচা উভয় অবস্থায় চুই বিক্রি হয়। বর্তমানে প্রতি কেজি কাঁচা চুই ঝাল লতা অঞ্চল ভেদে ৭০০ থেকে ১৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। তবে শাখা ডাল থেকে শিকড়ে ডালে ঝাল বেশি হয় বলে এর দামও একটু বেশি। শুকনো চুইয়ের দাম কাঁচার চেয়ে আরও ২-৩ গুণ বেশি। ১৫০০ টাকা থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত। 


পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ও দক্ষিন ২৪ পরগনা, নদীয়া এবং উত্তরবঙ্গের কিছু জেলায় খুব সহজেই এই ফসলের চাষ করা সম্ভব। এক জন সাধারণ কৃষক নিজের ২-৪ টি গাছে চুইয়ের চাষ করে নিজের পারিবারিক চাহিদা মেটাতে পারেন অধিকন্তু অতিরিক্ত ফলন বিক্রি করে পারিবারিক অন্যান্য আবশ্যকীয় চাহিদা মিটাতে পারেন অনায়াসে। লংকার বিকল্প হিসেবে চুইকে যুক্ত করতে পারলে ঝালের প্রয়োজন যেমন মিটবে, তেমন ভেষজগুণ থাকার কারণে অনেক রোগব্যাধির আক্রমণ থেকেও রক্ষা পাওয়া যাবে।


এ জন্য দরকার সুষ্ঠ পরিকল্পনা, গবেষণা, প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন, বিপণন, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং বহুমুখী ব্যবহারের প্রচার। তবেই চুই নিয়ে আমরা অনেকটা এগিয়ে যেতে পারবো। সংশ্লিষ্ট কৃষি বিভাগ যদি এর দিকে পরিকল্পিতভাবে কার্যকর পদক্ষেপ নেন এবং সুনজর দেন তবে আমাদের দেশে চুই ঝাল থেকে অনেক কৃষক বিকল্প আয়ের রাস্তা খুঁজে পাবেন৷

3 thoughts on “আর্থিক স্বাবলম্বিতার লক্ষ্যে স্বল্প খরচে চুই চাষ

  • July 19, 2020 at 10:43 am
    Permalink

    North bengal a pawa ta chap ar bapar. Coochbihar district a pawa jete pare. Kachakachi nursery te khoj nia dekte paren.

    Reply
  • July 24, 2020 at 1:41 pm
    Permalink

    Sir,
    আমার ৫০ টা ঝার চৈ-চারা চাই দক্ষিণ দিনাজপুর। আমার WhatsApp no : 9775428838 -এ জানান। আর আপনার WhatsApp no : টা দিন।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *