উলটী – একটি স্বতন্ত্র গোপনীয়তা  

 স্বর্ণকমল তপস্বী

উলটী। একটি বাচিক। বা বলাই বাহুল্য একটি স্বতন্ত্র গোপনীয়তা। বিভিন্ন ভারতীয় প্রদেশের আনচলিক বৈশিষ্ট্যের সমন্বয়ে সৃষ্ট সাংকেতিক প্রহেলিকা, যা চতুর্থ জগত অর্থাৎ সমকামী, উভকামী ও কিন্নর সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্যাপক ভাবে প্রচলিত। যদিও  এই “চতুর্থ জগত” কথাটি বাস্তবিক দিক দিয়ে  বিচার্য ভীষণ বিতর্কিত ভাবেই। সেই বিতর্ক এড়িয়ে চলার একটি যুদ্ধনীতি হিসেবেই এই উলটী নামক ভাষাটির সৃষ্টি। উলটী কথাটি উল্টো কথাটিরই অপভ্রংশ। উল্টো অর্থাৎ বিশেষ কলাকৌশলের মাধ্যমে সাধারণ শব্দ বা বাক্যবিন্যাসকেই একটু ঘুরিয়ে-পেচিয়ে নতুন পঙক্তির সৃষ্টি করা। তবে একটি বাক্যবিন্যাসে সবকটি শব্দ উলটী ভাষাতে পরিবর্তনের চল না থাকায়  এটি একটি  স্বতন্ত্র ভাষার স্বীকৃতি পায়নি। তবে এই সাংকেতিক শব্দ চয়নের  ধারা অনুযায়ী বোঝা যায় এগুলি প্রধানত দক্ষিণ ভারত, পশ্চিম ভারতের ও উত্তর ভারতের বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষারই অপভ্রংশিত রূপ। এতে হিন্দি ও মারাঠী ভাষার প্রভাব বিশেষ ভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। উলটীর  প্রয়োগ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে প্রান্তিক বৈশিষ্ট্যে বিশিষ্ট। উলটীর জন্মগত কারণ হিসেবে বলা যায় যে,  সমাজের এই কোণঠাসা মানুষেরা ঘরে বাইরে আজও  ব্রাত্য। বিশেষ করে ভারতের মত সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন দেশগুলিতে  তাদের অস্তিত্ব  উত্তরোত্তর বিপদসঙ্কুল সেই বৃটিশ আমল থেকেই। অর্থাৎ ইউরোপিয় শক্তির দিগ্বিজয়ের সময় থেকেই চতুর্থ জগতের পরাজয়ের সূত্রপাত। বিশেষ দৈহিক ও মানসিক বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন মানুষের জন্য ঘৃণ্য আইন প্রণয়নের সূত্র শুরু। সুতরাং সেই সময়ের প্রেক্ষাপটকেই উলটীর গোড়ার কথা হিসেবে ধরা যেতে পারে। যখন সমকামী, উভকামী ও কিন্নর সম্প্রদায় ভুক্ত মানুষদের জন্য প্রকাশ্য আদান – প্রদান ধীরে ধীরে বন্ধ হতে শুরু করল তখনই তারা উলটীর মাধ্যমে নিজেদের ভাললাগা,  খারাপ লাগা, মনের কথা তথা তথাকথিত গোপন কথার রহস্যময় বিনিময় শুরু করল। যা আজ এই স্বর্গীয় রংধনুর এক বেদনা বিধুর পরম্পরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *