‘কোথায় স্বর্গ কোথায় নরক’

কাকলি সরকার (নীপা), গোবরডাঙ্গা, উত্তর ২৪ পরগনা ##

স্কুল ছুটি হয়ে গেছে প্রায় তিনটে নাগাদ। বিশেষ কারণবশত একটু তাড়াতাড়িই ছুটি হয়েছে স্কুল। শিমুলপুর বালিকা আশ্রমিক বিদ্যালয়। কিন্তু আজ আশ্রমে ফিরবার যেন কোন তাড়া নেই ‘মধুমিতা মুখার্জীর’। ছোট এই আশ্রমিক মফঃস্বল বেসরকারী স্কুলটির প্রধান শিক্ষিকা তিনি। থাকেন স্কুল সংলগ্ন আশ্রমে। এই আ্শ্রমে গোটা ৩০ মেয়েও থাকে। ওরাই মধুমিতার দেবীর সব। সারা দিন ওদের ভালো মন্দ চিন্তা করে, খাওয়া দাওয়া পোষাক পরিচ্ছদ এবং শিক্ষার প্রতি নজর রাখতে রাখতেই তার রাত, দিন কখন অতিবাহিত হয়ে যায় তা মধুমিতা দেবীর খেয়ালই থাকে না। আজও সেই দিনটার কথা তার স্পষ্ট মনে আছে; স্বামী শাশুড়ীর লাঞ্ছনা সহ্য করতে করতে যেদিন নিরুত্তাপ হয়ে গিয়েছিল দরিদ্র পরিবারের এই শিক্ষিত মেয়েটি। হতাশার অন্ধকারে একেবারে তলিয়ে গিয়ে মৃত কন্যা সন্তান প্র্রসব করে বিতাড়িত হয়েছিল শশুর বাড়ী থেকে। মুহূর্তে সেদিন তার মনে হয়েছিল এ জীবনের একমাত্র পরিণতি ‘অকাল মৃত্যু’। সেদিন হঠাৎ ভোরের আলোর স্বপ্ন, শিউলি ফোটানো, শরৎ আকাশের দ্যূতি নিয়ে তার হাতে এসে পৌঁছেছিল একখানি চাকরির চিঠি। কাজটা প্রধান শিক্ষিকার। হোক না বেসরকারী বিদ্যালয়, বেতনও যৎসামান্য। কিন্তু একটা পেট চালিয়ে নেবার জন্য, একটা মানুষের জীবন ধারনের জন্য, সে যথেষ্ট। থাকার জন্য আশ্রমের একটি বড় কামরা। আর খাবার জন্য মোটা চালের ভাত। এই টুকুর হাতছানিই সেদিন স্বর্গ সুখ মনে হলো মধুমিতা দেবীর কাছে। সেই থেকেই এই ছোট্ট মফঃস্বল আ্শ্রমিক বিদ্যালয়টি তার প্রাণ। আর আ্শ্রমের ছোট বড় ৩০টি মেয়ে তার প্রাণ ভ্রমরা। যদিও মেয়েদের মধ্যে কেউ নুতন আসে, কেউ চলে যায়, আবার কেউবা থেকে যায় বেশ কিছু বছর। কিন্তু ওদের সঙ্গে ওর প্রতিনিয়তই চলে প্রাণের লেনাদেনা।

প্রতিদিন বিদ্যালয় ছুটি হবার সঙ্গে সঙ্গে মধুমিতা দেবী তার হাতের সমস্ত কাজ তাড়াতাড়ি সেরে ফেলে ফিরে আসেন আশ্রমে। মেয়েদের সঙ্গে খুনসুটি, কিছুটা খেলা করা, গাছে জল দেওয়া, ফুল গাছের পরিচর্যা করা, পাতা বাহারের পাতা ছাটা, এসব করে মেয়েরা যখন নিজ ঘরে যায়, তখন মধুমিতা দেবীও ফেরেন নিজের কামরায়। সন্ধ্যা তখন প্রায় সমাগত। তার পর নিজের কাজ কর্ম সেরে কিছুটা লেখালেখি করে, বই পড়ে, ডাইরি লেখা শেষ করে মেয়েদের সঙ্গে এক টেবিলে বসে আহার সেরে, শুয়ে পড়েন অন্য এক সকালের আকাঙ্খায়। যদিও মধুমিতা দেবীর এই বাঁচা কেবল বেঁচে থাকার জন্য বাঁচা। তবুও আশ্রমের মেয়েদের সেবা যত্নের মধ্যে তিনি যেন খুঁজে পান জীবনের অন্য এক মানে। অর্থহীন মনে হয় না তার নিজেকে। বরং মনে হয় মানুষের সেবায় নিয়জিত তার এ প্রাণ অন্য আর পাঁচটা সাধারণ মানু্ষের জীবনের চেয়ে অনেক দামী।

যাহোক এটাই মধুমিতা দেবীর প্রতিদিনকার রুটিন। এছাড়াও রয়েছে বিদ্যালয় সংক্রান্ত হাজারটা কাজও। কিন্তু মেয়েদের সঙ্গে কাটানো মুহূর্ত গুলো যেন তার একান্ত ব্যক্তিগত। একান্ত আনন্দের।

আজ শুক্রবার বিদ্যালয় ছুটির পরও এটা সেটা কাজ করতেই ব্যস্ত মধুমিতা দেবী। আজ আশ্রমে ফিরলেই যে তাকে বিচার সভা বসাতে হবে। তার প্রাণপ্রিয় মেয়েগুলোকে সন্দেহ করতে হবে। নির্যাতন করতে হবে তাদের। একথা ভাবলেই তার শরীর মন কেমন যেন অবসন্ন হয়ে পড়ছে। এমন ফুলের মতো ফুটফুটে মেয়ে গুলোকে শাসন করতে কিছুতেই তার মন সায় দেয় না।

কিন্তু এছাড়া অন্য কোন উপায় তো নেই। মনে পড়ে যায় অষ্টম শ্রেণীর মৌসুমীর কথা। আশ্রমের লাগোয়া বাড়িতে আসা ভাড়াটিয়া ছেলেটির সঙ্গে সেই যে পালালো। আর খোঁজ পাওয়া গেল না। তার পর থানা, পুলিশ। কত হ্যাপা পোহাতে হয়েছে তাকে। কত হেনস্থা হতে হয়েছে অভিভাবকদের কাছে, তার সাক্ষী সে নিজেই। এবার সে এমনটি কিছুতেই হতে দেবে না। সদ্য হাতে আসা প্রেম পত্রটি কার? তা সে খুঁজে বার করবেই। প্রয়োজনে নিষ্ঠুর হতে হবে বইকি? নবম শ্রেণীতে পড়ে আশ্রমের ৫টি মেয়ে। অমৃতাদি ওদের কাছ থেকে চিঠিটি উদ্ধার করেছে। কিন্তু ঐ মেয়েদের মধ্যে চিঠিটি কার হতে পারে? এরা সকলেই বেশ শান্ত প্রকৃতির। চিঠিতে নাম, ধাম, কিছু উল্লেখ না থাকায় এর প্রাপককে খোঁজা যেন পুঁটুলী থেকে ছড়িয়ে পড়া সর্ষে খোঁজার সামিল। তবুও সন্তর্পণে একাজ তাকে করতেই হবে।

এসব ভাবতে ভাবতে আশ্রমের দিকে পা বাড়ালো মধুমিতা। চৈত্র মাস। আশ্রমের গেটের সামনে পায়ে চলা পাকা রাস্তাময় ছড়িয়ে আছে ঝরে পড়া আমের মুকুল। ঘ্রাণে তার চারিদিক মৌ মৌ করছে। কিন্তু মাঠের মধ্যে আজ একটাও মেয়ে নেই। থাকবে কি করে? সকলকেই যে বলা হয়েছে; এই অপরাধীকে ধরিয়ে দিতে না পারলে সকলকেই শাস্তি প্রদান করা হবে। হলো প্রেম? তাও অসময়ে, অপাত্রে। অপরাধ তো বটেই। কারণ এর অনিবার্য পরিণতি যে জীবনের অকাল অবক্ষয়।

এরপর মধুমিতা নিজ ঘরে এসে পৌঁছালো। মেয়েদের ডেকে পাঠানো হলো। মেয়েরা এসে সার বদ্ধ হয়ে দাঁড়ালো। মধুমিতা দেবী চেয়ারে বসে। মনে মনে কেবলই ভাবছে এই সুন্দর কচি কচি মুখের মধ্যে কোন মুখটিকে আজ মলিনতায় ম্লান করবে সে? এই বড়বড় পল্লব বিশিষ্ট চোখগুলির মধ্যে কোন চোখ দুটো আজ ভরবে জলে। পদ্মকলির মতো এই কোন বাহুতনুতে আজ আঘাত হানবে সে? না কিছুতেই নয়। মা-বাবাহীন, সন্তান, স্বামীহীন মধুমিতার একমাত্র ভালোবাসার ধন যে এরাই। কিন্তু, না। শক্ত হতে হবে তাকে। আবার থানা পুলিশ সে চায় না। কিছুতেই না।

চিঠির মধ্যে কোন প্রমান পাওয়া যায় কি না এটা ভেবে মধুমিতা দেবী চিঠিটা খুলে পড়তে শুরু করলো।

প্রিয়া,

তোমার একটা ছবি আমি বোনের কাছে দেখেছি। দেখে তোমাকে ভালো লেগেছিল। সরস্বতী পুজোর সময় তোমাকে সরাসরি দেখেছি। ভালোবেসে ফেলেছি তোমাকে। ইত্যাদি ইত্যাদি; –

আর পড়তে ইচ্ছা করলো না মধুমিতার। মনে হলো হয়তো তার মেয়েরা কেউ দোষী নয়। একতরফা ছেলেটিই হয়তো এটা করেছে? কিন্তু মৌসুমীর ঘটনা, সে অভিজ্ঞতা দেয় না। গতকাল অষ্টম শ্রেণীর রীতা স্যান্যাল এসে গোপনে তাকে বলে গেছে এটি ‘সুতপার কাছে এসেছে’। কিন্তু তার সত্যতা কতটা? সুতপা ও বুবুন। নবম ও ৫ম শ্রেণীতে পড়ে। গত দু বছর হলো ওদের মা আত্মহত্যা করেছে। বাবা চাকুরীজীবি। সংসার সামলাতে না পেরে মেয়ে দুটোকে আশ্রমে রেখে গেছেন। তবে কি ‘মিঠু জানা’? ওর বাবা, মাকে ত্যাগ করে দ্বিতীয় বার বিবাহ করেছেন। অগত্যা ওর আশ্রম যাত্রা। না? মেয়েটি তেমন মনে হয় না। কিছুতেই এই ফুটফুটে মেয়েগুলোকে অপরাধী বানাতে মধুমিতার মন রাজি হয় না। – ঈশ্বরের কাছে কেবলই শক্তি চায় সে। তার পর মেয়েদের উদ্দেশে বলে – “তোমাদের মধ্যে এই চিঠিটি কার কাছে এসেছে? সৎ সাহস থাকলে সে আমার সামনে এসে দাঁড়াবে। আমি শুধু তাকেই শাস্তি দিতে চাই। এক জনের জন্য সকলেই শাস্তি পাক এটা হতে পারে না।

কিন্তু এ কি করলো মেয়েরা। মধুমিতা বিষ্ময়ে হতবাক্ হলো। সমস্ত বিচার বোধ ভুলে গেল সে। সে দেখলো একটি একটি করে ৩০টি মেয়ে তার সামনে এগিয়ে এলো। প্রত্যেকেই বললো –

– “ম্যাম চিঠিটা আমার কাছে এসেছে।”

এর পর মধুমিতা কিংকর্তব্য বিমূঢ় হয়ে পড়লো। কিন্তু আশ্চর্য হলো তাদের একাত্মবোধে। একতায়। খুশি হলো। আত্মতৃপ্ত হলো। মুহূর্তেই মনে হলো এ যেন এক অন্য পৃথিবী। মনে হল;

“কোথায় স্বর্গ, কোথায় নরক, কে বলে তা বহুদূর?
মানুষেরি মাঝে স্বর্গ নরক, মানুষেতে সুরাসুর!”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *