চুপি চুপি চোরকাঁটাতে

পলাশ মুখোপাধ্যায় ##

নদী আমার খুব প্রিয়, সাগর আমার বেশ পছন্দের। তা বলে পাহাড়কে আমি ভালবাসি না একথা মোটেই সত্য নয়। আমার লেখায় নদীর আধিক্য দেখে আমাকে অনেকেই নদীপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন করেছেন। তাদের জন্যই এবারে যাব চমৎকার একটি; না না দুটি পাহাড়ের কাছে। আর সব চেয়ে বড় কথা হল, পাহাড়ের কাছেই রয়েছে আমার প্রেয়সী, সুন্দরী ময়ূরাক্ষী।

যাত্রাপথ খুব কাছে নয়, তাই ভোর ভোর বেরনোর পালা। আমি যাব চোরকাঁটা পাহাড়ে। নামটা নিশ্চয় পরিচিত নয়। বীরভূম ঝাড়খণ্ড সীমানায় এই পাহাড়টি পাশে আরও একটি ছোট্ট পাহাড় নিয়ে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে। ভোর বেলা বাস ধরেছি। প্রথম গন্তব্য সিউড়ী। বাসে যাওয়াই ভাল, ঘন্টা চারেক মত সময় নেবে। করুনাময়ী বা ধর্মতলা থেকে প্রচুর বাস। সকাল দশটা নাগাদ পৌঁছে গেছি সিউড়ীতে। নেমেই বাস স্ট্যান্ডের একটি হোটেল থেকে প্রাতরাশ সারা হল। আগেই শুনেছি চোরকাঁটার আশেপাশে খুব ভাল হোটেল নেই। তাই একটু পেট ভরেই সেরে নিলাম সকালের খাওয়া দাওয়া। এবার আবার বাসে ওঠার পালা। সিউড়ী বাস স্ট্যান্ড থেকেই ছাড়ছে দুমকা যাওয়ার বাস। উঠে পড়লাম সেই বাসে। মিনিট চল্লিশ পরে সেই বাস নামিয়ে দিল রাজুডিহির মোড় বা কুলুবন্দি মোড়ে। সেখান থেকে এবার হাঁটা পথ প্রায় দেড় কিলোমিটার। যারা গাড়িতে আসবেন তারা সিউড়ী, তিলপাড়া ব্যারেজ পার করে সাহারাকুড়ি বা শেওড়াকুড়ি মোড় থেকে বাঁ দিকে অর্থাৎ ম্যাসানজোড়ের দিকে যাবেন। মিনিট পনেরো পরে বাংলা সীমানা পেরিয়েই পড়ে রাজুডিহি মোড়। ফাঁকা মাঠের মধ্যে মোড়, জিজ্ঞাসা করবার জন্য সামান্য এগিয়ে একটি ধাবা পাবেন। বলতে হবে নান্না/ নান্‌হা পাহাড় যাব।

আমার তো হাঁটা শুরু, গ্রাম পেরিয়ে একটা ছোট্ট কালভার্ট, সেখান থেকে বাঁ দিকে পিচের রাস্তা। নির্জন প্রান্তরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বড় বড় বোল্ডার। এবার ধীরে ধীরে ভাল লাগতে শুরু করল জায়গাটিকে। লাল মাটি, বোল্ডারগুলিকে ছায়া দিয়েছে ইউক্যালিপটাস এবং আকাশমণির দল। বড় সুন্দর, দূর থেকেই দেখে নিয়েছি দুই পাহাড়কে। পাহাড় বলা যায় কিনা আমি জানি না, সাকুল্যে দেড়-দুশো ফুট উচু হবে দুই ভাই। প্রথমেই পড়বে চোরকাঁটা পাহাড়। এমন নাম কেন? স্থানীয় এক রাখাল বালককে জিজ্ঞাসা করে জানলাম পাহাড়ের ঠিক নিচেই আদিবাসী গ্রাম চোরকাঁটা। তার নামেই পাহাড়ের নামকরণ। পাহাড়ের পরিবেশটি কিন্তু ভারি চমৎকার।

সভ্য মানুষেরা এখনও সেভাবে বোধহয় হদিশ পায়নি। তাই কোথাও এতটুকু নোংরা বা আবর্জনা নেই। হাঁটতে হাঁটতে পাহাড়ের নিচে একটা ছায়া মোড়া উপলখণ্ডে গিয়ে বসলাম। ঝির ঝির হাওয়ায় পথের ক্লান্তি ভুলে বসেছিলাম বেশ খানিকক্ষণ। হঠাৎ কার ডাকে ঘোর ভাঙল। “কুথা থেকে এসেছেন বাবু”? কলকাতা বলতেই অবাক লোকটি। খালি গা, খাটো ধুতি পরমেশ্বর মাঝির বাড়ি পাশেই। আমাকে বসে থাকতে দেখে একটু গল্প গুজব করবার সাধ জাগল। বলল শীতের সময় কাছেপিঠে থেকে দুচার জন পিকনিক করতে আসে বটে কিন্তু কলকাতা থেকে এত দূরে এখানে আর কাউকে আসতে সে দেখেনি। আমাকে বোধহয় পাগলই ভাবল।

এবারে একটু ঘোরাঘুরির পালা। যাদের পাহাড়ে ওঠার শখ আছে অথচ পায়ে, হাঁটুতে ব্যাথা, তাদের জন্য কিন্তু চোর কাঁটা পাহাড় দারুণ জায়গা। ধীরে ধীরে পাথরের উপর দিয়ে ওঠা যায় একদম চুড়ায়। চারিপাশ দেখতে মন্দ লাগেনা। পাহাড়ে প্রচুর গাছপালা তাই ছায়ায় ঘেরা পাহাড়ে রোদ গরমের ঝামেলাও কম। সব মিলিয়ে কষ্টও কম, আবার পাহাড়ে চড়ার মজাও আছে। তাই বয়স্কদের জন্য এটা ঠিকঠাক ডেস্টিনেশন। যার পাহাড়ে চড়বার ইচ্ছে নেই তিনি নিচে ছায়ায় ঘেরা ঘাসে মোড়া এলাকায় হাঁটাহাঁটি করতেই পারেন। পাশেই আছে দুটি ছোট ছোট পুকুর।

 সামনেই নান্না বা নানহা পাহাড়। চোরকাঁটার মত এর অবশ্য অত গাছপালা নেই। প্রায় নেড়া বললেই চলে। উচ্চতা খুব বেশি নয়, কিন্তু নেড়া বলে একটা আলাদা সৌন্দর্য আছে নান্নারও। নান্নাতে ওঠাও বেশ সোজা। চোরকাঁটায় যেমন বড় বড় বোল্ডার বা পাথর ছিল এখানে কিন্তু তা নেই। উঠে যাওয়া যায়, তবে ছোট ছোট নুড়িতে অবশ্য পা পিছলে যাওয়ার ভয় থাকে। আমি অবশ্য রোদের মধ্যে আর নান্নায় ওঠার উদ্যোগ নিইনি।

এবার ফেরার পালা। আবার চোরকাঁটা হয়ে পিচ রাস্তা ধরে রাজুডিহির মোড়ে। সেখান থেকে ট্রেকার পেলাম রাণিশ্বরের। রাণিশ্বর নাম শুনেই বুঝেছিলাম এখানে একটি মন্দির থাকার বিপুল সম্ভাবনা। ছিলও তাই, ছোট কিন্তু গ্রাম্য পরিবেশে শিব মন্দিরটি খারাপ লাগে না। রাণিশ্বর মোড়ে কিছু দোকানপাট আছে, আছে দু একটা ভাতের হোটেলও। খুব বড় নয় তবে চলে যায়।

এখান থেকে এক কিলোমিটার দূরেই অবস্থান ময়ূরাক্ষীর। সুন্দরী ময়ূরাক্ষী আমাকে সব সময় টানে। এত কাছে এসে তার সঙ্গে দেখা না করে চলে যাওয়ার মত বেরসিক আমি নই। একটা টোটো যাচ্ছিল ওই দিকে, দর দাম করে উঠে বসলাম। সেও আমি কলকাতা থেকে এখানে বেড়াতে এসেছি শুনে ভারি অবাক। বলল ম্যাসানজোর যাবেন? আমি না বলাতে তার মুখের হাঁ বন্ধ হয় না। নামার সময় কিছুতেই সে টাকা নেবে না। আমি এত দূর থেকে তাদের ওখানে বেড়াতে এসেছি শুনেই খুশি সে। জোর করে কিছু টাকা দিয়ে এবার আমি প্রেয়সী পানে।

এখানে একটি খুব সুন্দর সেতু বানিয়েছে ঝাড়খণ্ড সরকার। এটা আগে ছিল না। খুব বড় না হলেও ভালই। সেতুর পাশ দিয়ে নেমে গেলাম নদীর দিকে। এখানেও নির্জন, সুন্দর পরিবেশ। সবুজ ঘাসের গালিচা পেরিয়ে নদীর বালুকাময় বুকে নেমে একটু হেঁটে যেতেই জলের ধারা। বেশ খানিকটা দূরে ম্যাসানজোড় হওয়াতে এখানে জল খুব বেশি থাকে না। বালির চরের মধ্যে দিয়ে আঁকা বাঁকা জলের স্রোত। মনোমুগ্ধকর দৃশ্য।

আর থাকতে পারলাম না। নেমেই পড়লাম জলে। হাঁটু জল, পা দিতেই সরে সরে যাচ্ছে বালিকনাগুলি, শিরশিরে অনুভূতি। সব মিলিয়ে সে এক অপূর্ব অভিজ্ঞতা। সারাদিনের ক্লান্তি যেন এক লহমায় ধুয়ে দিল ময়ূরাক্ষী। সাধে কি সে আমার প্রেয়সী? খানিক ক্ষণ জলকেলি করে এবার উঠে এলাম। ফিরতে হবে। সিউড়ী থেকে চারটেয় কলকাতা ফেরার বাস। এখন প্রায় সোয়া দুটো বাজে। তাই মন না মানলেও প্রেয়সীকে বিদায় দিয়ে ফের পথে।

সিউড়ী বাস স্ট্যান্ডে যখন পৌঁছলাম তখন সাড়ে তিনটে বাজে। সামান্য নাকে মুখে গুঁজেই ছুটে সরকারী বাস টার্মিনাসে। নেমেই ফেরার টিকিট কেটে রেখেছিলাম, তাই নিশ্চিন্তে গিয়ে বসে পড়া বাসে। এর পর তো কাজ একটাই… আরাম করে একটা নিদ্রা দেওয়া। একে ভোরে ওঠা, তার পরে সারা দিনের ক্লান্তি। একটু হাওয়া লাগতেই বুজে এল চোখ। আমি ফের স্বপ্নে আমার প্রেয়সীর কাছে।         

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *