বাকসা চৌধুরী বাড়ির পুজো

শুভজিৎ দত্ত, আগড়পাড়া, উত্তর ২৪ পরগণা ##

বর্ষার বিদায় বেলা থেকেই প্রকৃতির বুকে কান পাতলেই শোনা যায় এক সাজো সাজো রবের গুঞ্জন,আকাশে পেঁজা তুলোর মতো মেঘেদের আনাগোনা ,শিউলি গাছে নতুন কুঁড়ির আগমন আর কাশের বনের ধীরে ধীরে মাথা দোলানো ;এ সবই যেন জানান দেয় মায়ের আগমনের ,ফিসফিসিয়ে যেন বলে যায় তোমার তৈরি হও ,মা যে এবার সপরিবারে এলেন বলে। তবে আজকাল পুজো মানেই ঝাঁ চকচকে রঙীন ব্যাপার ,একে অপরকে টেক্কা দেওয়ার খেলা, সেখানে আন্তরিকতা ও একাত্ম বোধের থেকে অনেক বেশি হয়ে ওঠে বাহ্যিক পরিবেশের সৌখিনতা। কিন্তু শহর ও শহরতলির রোশনাইকে পিছনে ফেলে কয়েক পা সবুজ গাঁয়ের দিকে বাড়ালেই পাওয়া যায় সাবেকিয়ানার মোড়কে এক অন্য পুজোর গন্ধ ,যেখানে হয়তো সৌখিনতার অভাব আছে কিন্তু অভাব নেই  পুজোর রীতি নীতি ও আন্তরিকতার। সেখানে ভিন্ন ভিন্ন বাড়ির পুজোর ভিন্ন ভিন্ন  ইতিহাস, নিয়ম ও আচার; এরকমই কিছু সাবেকিয়ানার রঙে রঙীন  পুজোর সন্ধান পাওয়া যায় হুগলী জেলার জনাই রোড স্টেশনের কাছে বাকসা গ্রামে ,যাদের মধ্যে অন্যতম হলো  চৌধুরী বাড়ির পুজো।

 ‘বাকসা’ এক বহু প্রাচীন বর্ধিষ্ণু গ্রাম। এই গ্রামের নামকরণের ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় দক্ষিণ দিকে  স্বরস্বতী(বতর্মানে ক্ষীণস্রোতা) নদীর তীরে পর্তুগীজরা এক বন্দর স্থাপন করেছিলেন।অনেকের মতে তাই পর্তুগীজ ‘baixel’ বা বজরার অপভ্রংশ থেকেই বাকসা নামটি এসেছে। চারশো বছর পূর্বের কবিকঙ্কন মুকুন্দরামের চন্ডীকাব্যেও এই গ্রামের উল্লেখ পাওয়া যায়।বর্ধমানের দেওয়ান রাজারাম চৌধুরী করহীন ৭৫ বিঘা জমি পেয়ে এখানেই নিজের জমিদারী শুরু করেছিলেন।বাংলায় যখন শাক্ত (শক্তি) ও বৈষ্ণব দের দ্বন্দ্ব চরমে,তখন এই দ্বন্দ্ব দূরীভূত করতেই তিনি শাক্তদেবীর দুর্গার সাথে বৈষ্ণবদের হৃদয়কমল রাধাগোবিন্দের প্রায় 250 বছর আগে একসাথে পুজো আরম্ভ করেন।তাই মায়ের চালচিত্রের একপাশে রাধা ও অন্যপাশে গোবিন্দ বিরাজমান।এই বাড়ির ঠাকুরদালানের পিছনেই আছে বাড়ির এই কুলদেবতা রাধাগোবিন্দ জিউয়ের অপূর্ব এক মন্দির।

বাড়ির সদস্য শ্রী অনির্বান চোধুরীর থেকে জানা গেল এই বাড়ির পুজোর কিছু রীতি-নীতি।জন্মাষ্টমীর দিন কাঠামোপূজোর মাধ্যমেই  শুরু হয় দেবীর আগমনীর প্রস্তুতি।ষষ্ঠীর রাতে বেলতলায় বিল্ববরণ ও সপ্তমীর দিন নবপত্রিকা স্নানের পর মায়ের প্রাণ প্রতিষ্টা করা হয়।অভয়ারূপী মা এখানে চতুর্ভূজা। পুজোর চারদিন লক্ষ্মীর হাঁড়ি মায়ের ঠাকুর দালানে রেখে পুজো করা হয়। তবে প্রতিদিনই বাড়ির কুলদেবতা রাধাগোবিন্দের পুজোর পরেই মায়ের পুজো হয়।

সাবেকি বাড়ির পুজো হলেও এখানে পকান্ন ছাড়াই দেবীর আরাধনা হয়। চাল, ফল, ও মিষ্টি দিয়ে তৈরি হয় মায়ের নৈবেদ্য। পূর্বে সন্ধিপূজো,নবমী ও দশমীতে পাঠাবলির রীতি থাকলেও বর্তমানে প্রতীকী বলি হয়। দশমীতে বাড়ির কুলদেবতা রাধাগোবিন্দ জিউয়ের আগে প্রথমে বাড়ির অপর কুলদেবতা ‘বিশালাক্ষী’ দেবী ও গ্রামের জাগ্রত দেবী বদ্যিমাতার আরাধনা করা হয়। এরপর রাধাগোবিন্দের পুজোর পর দেবীর ঘট বিসর্জন করা হয়। বিকেলে মহাসমারোহে  সরস্বতী নদীতে প্রতিমা নিরঞ্জন করা হয়। তবে এখানেই শেষ নয় একাদশীতে বর্ধমান রাজার নির্দেশে চালু হওয়া প্রথা অনুযায়ী সিয়াখালায় দেবী উত্তরবাহিনীকে নৈবেদ্য পাঠানোর মাধ্যমেই শুরু হয় আবার মায়ের আগমনের প্রতীক্ষার দিন গোনা। তবে দুর্গাপুজো ছাড়াও এই বাড়ির অন্যতম প্রধান উৎসব দোলযাত্রা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *