রথযাত্রা লোকারণ্য মহা ধূমধাম

চিন্ময় ভট্টাচার্য

দুর্গাপুজো, কালিপুজো, দোল,ভাইফোটা, ১৫ই আগস্ট একদিনের বড় রবারের বল প্রতিযোগিতার মত ছোটবেলায় রথযাত্রা উৎসবও ছিল আমার জীবনে, আমাদের জীবনে । তবে সেটা বেশ ছোটবেলায় । যখন রঙিন কাগজ দিয়ে মোড়া রথ, রথের ধ্বজা, রথের গায়ে টুনি বাল্বের জ্বলা-নেভা আর ভেতরে কৃষ্ণ, বলরাম, সুভদ্রার হুমড়ি খেয়ে একে ওপরের গায়ে পড়ে যাওয়ার মত মামুলি ঘটনাতেও বিষ্ময় ছিল, চমকে ওঠা ছিল । আর ছিল জগন্নাথের মাসীর বাড়ি যাওয়া, মাসীর বাড়ি গিয়ে জ্বরে পড়ার রোমাঞ্চকর গল্প । প্রতি বছর নতুন রথ আসত না । আগের বছরের রথটাই মা বেশ গুছিয়ে যত্ন করে কোথায় একটা তুলে রাখত, পরের বছর রথযাত্রার ঠিক আগের দিন আবার রথ কোথা থেকে একটা নেমে আসত । কখনো জমিয়ে রাখা, কখনও বা নতুন কিনে আনা রঙিন কাগজ আঠা দিয়ে মুড়ে দিব্যি সেজে উঠতো আমাদের সাধের রথ । তারপর বন্ধুদের সঙ্গে একসঙ্গে পাড়া ঘোরা । তবে এ সবই ছিল আসলে উপলক্ষ। আসল লক্ষ্য ছিল সন্ধ্যে হয়ে এলে পটলার দোকানের পাপড় আর জিলিপি ভাজা । সারা বছর শম্ভুদা আলুর চপ, বেগুনি, সিঙাড়া,লড়াইয়ের চপ ভাজত। অনেক দোকানে ভেজিটেবল চপ খেয়েছি কিন্তু শম্ভুদার মত ভেজিটেবল চপ আর কেউ ভাজে নি । ভেজিটেবল চপকে লড়াইয়ের চপ বলাটাও শম্ভুদার দোকানেরই বিশেষত্ব । কেন বলা হত, তাঁর কারণ এখনও জানতে পারি নি । শুধু বছরের দুটো দিন রথ এবং উল্টোরথেই পাপড় আর জিলিপিতে উপচে উঠতো বড় ডেকচি । কাজেই এই দিনটা স্পেশাল । সন্ধেয় একটু আধটু ছাড় দিয়ে বাড়ি ঢুকে পড়তে হতো বটে, তবে বই নিয়ে বসতে হতো না । পড়াশোনার পাটই ছিল না রথের দিন । এখন বলতেই পারি রথ ছিল আমাদের কাছে উৎসবের দিন ।
রথ মানেই উৎসব- এই আবহটা অবশ্য চলে গেল অল্প বড় হবার পড়েই । মাকে কাশীরাম দাসের রামায়ন পড়ে শোনাতে গিয়ে জানলাম রথ দিয়ে সীতা হরণও করা যায়। সে রথের গতি এমন যে জটায়ূ,সম্পাতির মত বড় বীররাও রাবনের সঙ্গে যুদ্ধে এটে উঠতে পারেন না । রথে চড়ে যুদ্ধ করা যায় । যে যত বড় বীর তাঁর রথে তত গতি, সে রথ এমন সাই সাই করে এদিক ওদিক ঘুরে যায় যে কেউ তাকে ধরতে পারে না । মেঘনাথের রথ তো আরো রোমাঞ্চকর, মেঘের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে সেই রথ, সে রথের সঙ্গে পেরে ওঠেন না স্বয়ং দেবরাজ ইন্দ্রও । সেই জানা রথ মানে শুধু উৎসব নয় । পুরাণের সঙ্গেই জানা হল রথ মানে বিশ্বাসভঙ্গের গল্পও । কুরুক্ষেত্র ময়দানে আমার ছোটবেলার হিরো কর্ণের রথের চাকা বসে যাবার পরেও নিরস্ত্র কর্ণকে বধ করেন মহাবলী অর্জুন । কর্ণযখন মাটিতে নেমে বসে যাওয়া রথের চাকা তুলতে ব্যস্ত সেই সময়, সেই সময়েই তাকে হত্যা করার পরামর্শ দেন কৃষ্ণ । রথের গল্প জানতে গিয়ে সেই প্রথম জানা দেবতারাও অন্যায় করেন । সেই জানা প্রেমে আর যুদ্ধে কোন অন্যায়ই অন্যায় নয় । বড় হওয়ার পর সব কিশোরের মত আমারও পূরাণে অবিশ্বাস জন্মাল । তখন সবকিছুতেই নিজের মত জাহির করার দিন । সে যতোই বিশ্বাসীরা বলুন না কেন পূরাণের রথের ভাবনা থেকেই আজকের বিজ্ঞানীরা বিমানের রসদ পেয়েছেন, আমাদের কাছে তখন পূরাণ উড়িয়ে দেওয়ার দিন । কাজেই রথ যে নিছকই গল্পকথা, নেহাতই দেবতাদের মহত্ব প্রমাণের চেষ্টা তথ্যপ্রমাণ দিয়ে বাড়িতে, কোচিং ক্লাসে, পাড়ার রকে তা প্রমাণ করে দিতে কোনরকম কার্পণ্য বোধ করলাম না । বেশ রূপকথা হয়ে রথ এরপর চাপা পড়েই থাকে আমাদের জীবনে, যতদিন না আদবানি হাজির হন ।রথ হয়তো সেই প্রথম রাজনীতির হাতিয়ার । রথে চেপে লালকৃষ্ণ আদবানি এক এক রাজ্য ঘোরেন আর দাবানলের মত সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়তে থাকে । যারই ফলশ্রুতিতে ১৯৯২ সালের ৬ই ডিসেম্বর ভেঙে পড়ল বাবরি মসজিদ । শান্তির বাণি সামনে রেখে আদবানির পালটা রথে সওয়ারও হন বিরোধী রাজনৈতিক নেতারা । রথের সে নতুন যুগে প্রবেশ করা । এনটিআর, এমজিআর, করুনানিধি- প্রধানত দক্ষিণের নেতারা নিজেদের মহামানবিক ভাবমূর্তি তুলে ধরতেই পূরাণ ধার করে হাতিয়ার করলেন আজকের রথকে ।
সময় চলে গেছে । শুধু আমার মানসিকতা পাল্টেছে তাই নয়, পাল্টেছে রথের ব্যবহারও । রথ এখন আর শুধু ছোটদের টানার নয়, শুধু ভক্তিপ্রাণ মানুষদেরও নয় । সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পাল্টাচ্ছে রথের ব্যবহারও । রথের কথা লিখতে গিয়ে মনে পড়ে গেল বহু পরিচিত কবিতার সেই লাইনটা । ছাড়ালে না ছাড়ে কি করিব তারে.. . । পুরাতন স্মৃতি হয়েই রথ রয়ে গেছে আমার জীবনে নানা সময়ে,নানা রূপে ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *