রাজনগরের রাজ্যপাট

পলাশ মুখোপাধ্যায় ##

ইতিহাসের সঙ্গে যখন প্রকৃতি মিশে যায় তখন বেড়ানোর মজাটা যেন বেশ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। আজ যেখানে বেড়াতে যাওয়ার গল্প বলব সেখানে ইতিহাস আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মিলে মিশে একাকার। রাজবাড়ির কিয়দংশের অবশেষের আনাচে কানাচে কথা বলে রাজকীয় ইতিহাস। মৃদু বাতাস সেখানে সবুজের সঙ্গে করে খুনসুটেমি। এসব দেখে খিলখিলিয়ে হেসে চলে যায় তিরতিরানো নদীদুটি।

সেই বছর কুড়ি আগে চাকরি সূত্রে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল রাজনগরে। আলাপ হয়েছিল রাজা রফিকুল আলম খান সাহেবের সঙ্গে। রাজবেশ পরে আমাদের সঙ্গে কথা বলেছিলেন তিনি। চোখের সামনে রাজাকে দেখার সেই স্মৃতি এখনও ভাসে চোখে। কদিন ধরেই মনে হচ্ছিল রাজনগরে একবার যাওয়া দরকার। রাজপরিবারের বর্তমান প্রজন্ম সফিউলের সঙ্গেও আলাপ হয়েছিল তখন। সফিউল সেই সময় যুবক। ইতিমধ্যে প্রায় বছর কুড়ি পার। সম্প্রতি ফের রাজনগরে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করতেই উচ্ছ্বসিত সফিউল। তার সাদর আগ্রহ এবং নিমন্ত্রণেই এবার পা বাড়ালাম রাজনগরের দিকে।

রাজনগরের পথে…

আমার এবারের বেড়ানো সপরিবারে, তাই সঙ্গে গাড়ি রয়েছে। গাড়িতে সিউড়ি পার করে বক্রেশ্বরের দিকে এগোতেই বদলে গেল দৃশ্যপট। সবুজের বুক চিরে কালো পিচ ঢালা পথ। চন্দ্রপুর মোড় থেকে বাঁ দিকে গেলে বক্রেশ্বর, সোজা এগোলেই পড়বে রাজনগর। প্রায় বীরভূম ঝাড়খণ্ড সীমান্তে অবস্থান রাজনগরের। বহু বছর পরে আসা, পথ ঘাট শহরের চেহারা সবই বদলে গিয়েছে। সফিউলের দেওয়া পথ নির্দেশ মেনে পৌঁছলাম রাজনগর হাইস্কুলের সামনে। এখানেই আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল সফিউল। সেদিনের সেই যুবক আজকে মধ্যবয়স্ক। আমারও উপরিভাগে আফ্রিকার জঙ্গল এখন সাহারা মরুভূমি।  ফেসবুকের দৌলতে আমাদের বর্তমান চেহারা দুজনেরই চেনা থাকায় অসুবিধে হল না মোটেই।

রাজবাড়ির উপর থেকে

সবুজের মাঝে ছোট্ট জনপদ রাজনগর ছিল বীরভূম জেলার প্রাচীন রাজধানী। রাজনগরের ইতিহাস বেশ চিত্তাকর্ষক। সুদূর আফগানিস্তান থেকে এসে বীররাজাকে মল্লযুদ্ধে পরাজিত করে, মতান্তরে গুপ্তহত্যা করে জোনেদ খান ও রনমস্ত খান এখানে রাজমহল প্রতিষ্ঠা করেন যার ধ্বংসাবশেষ এখনও বিদ্যমান। পরবর্তী বংশধর আলিনকি খান বাংলার নবাব সিরাজোদৌলাকে কলকাতা দখলে সহায়তা করেছিলেন। বর্তমান আলিপুর নাকি তাঁরই নামানুসারে। তারও আগে লক্ষণ সেন, বল্লাল সেনদের বংশের প্রতিনিধিরা এখানে রাজত্ব করেছেন৷ লক্ষণ সেনের নামানুসারে এমন নামকরণ বলেও মনে করেন কেউ কেউ। এক সময় ওড়িশার রাজা নরসিংহ দেবও রাজকার্য পরিচালনা করেন এখানে।  ইংরেজ আমলের প্রথম দিকেও রাজনগরের মুসলিম রাজারা স্বাধীন রাজাদের মতই রাজত্ব করেছেন। পরে ইংরেজের বিরুদ্ধে মীরকাশিমের হয়ে অস্ত্র ধরে রাজাসহ রাজ্যপাট ধ্বংস হয়। শেষ রাজবংশের অধস্তন পুরুষেরা বর্তমান আছেন এখনও। চার-পাঁচটি গ্রামের লোক এখনও রাজা সম্বোধন ও সম্মান করে থাকেন। গ্রামের দুপাশ দিয়ে তিরতিরিয়ে বয়ে চলেছে সিদ্ধেশ্বরী আর কুশকর্নিকা নদী।

রাজবাড়ি সামনে থেকে

সফিউলের সঙ্গে সামান্য এগোতেই চোখের সামনে রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষ। খুব বেশি কিছু নেই। কিছুটা অংশ স্কুলের মধ্যে পড়েছে। পাশে কিছুটা ইমামবাড়া। মাঝে রয়ে গিয়েছে রাজনগরের রাজবাড়ির কিয়দংশ। সেই অংশটা অবশ্য পরিচ্ছন্ন।

ওঠা যায় দোতলাতে। উপলব্ধি করা যায় সেদিনের সেই রাজ কাহিনীর বলা না বলা অনেক কথা। উপর থেকে রাজবাড়ির কাঠামোটা দেখে এক অন্য অনুভূতি হয়। সফিউল নিজেই দাঁড়িয়ে থেকে আমাদের সব বোঝাচ্ছিল। শুনতে শুনতে মাঝে মধ্যেই হারিয়ে যাচ্ছিলাম ইতিহাসের পাতায় পাতায়।

কালীদহে হাওয়া মহল

এই রাজবাড়ি চত্বর থেকেই নজরে আসবে কালীদহের জলে ভাসমান হাওয়ামহলের ধ্বংসাবশেষ। কাজল কালো জলে একাকী দাঁড়িয়ে হাওয়া মহলের স্মৃতি।কথিত আছে, রাজবাড়ি থেকে সুড়ঙ্গপথে দিঘির নীচে দিয়ে ওই দ্বীপে ওঠা যেত। শেষ হিন্দু বীর রাজের পতনের পর যখন রাজনগরে মুসলমান ফৌজদারগণের শাসন প্রতিষ্ঠা হয় তখন ফৌজদার বাহাদুর খাঁর পুত্র দেওয়ান খাজা কামাল খাঁ বাহাদুর কালীদহের মাঝখানে একটি হাওয়াখানা এবং রাজপ্রাসাদের উত্তরে একটি হামাম নির্মাণ করিয়েছিলেন। হাওয়ামহলের বর্তমান অবস্থা দেখে মন খারাপ হয়। এমন সব ঐতিহাসিক সৌধ রক্ষণাবেক্ষণে নজর নেই কারও। একই খেদ ঝরে পড়ল সফিউলের গলাতেও।

মঙ্গল মাঝির ফাঁসির স্মৃতি বয়ে চলা গাব গাছের অংশ

এই রাজনগরই  কিন্তু ইংরেজ আমলে সাঁওতাল ও চুয়াড় বিদ্রোহের জন্মভূমি। বিদ্রোহী নেতা মঙ্গল মাঝিকে একটি গাবগাছে ঝুলিয়ে ফাঁসি দেওয়া হয়  এখানেই। রাজবাড়ির পাশেই খানিকটা এগোলে কালিদহের লাগোয়া একটি জায়গায় সেই গাবগাছের শুষ্ক ডাল আজও ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে। শুনলাম এই গাছে ফুল হয় কিন্তু ফল হয় না কোনও এক অজ্ঞাত কারনে।

হামাম ( স্নানঘর )

এবার সফিউল আমাদের নিয়ে চলল হামামে। অর্থাৎ রাজাবাবুদের শৌচ বা স্নানাগারে। সেটি হাই স্কুলের পিছন দিকে। বাইরে থেকে জল নিয়ে এসে কিভাবে তারা স্নান সারতেন তা দেখার মত বিষয়। স্নানের পরে পোশাক পরিবর্তন এবং বিশ্রামের জায়গা সবই রয়েছে সেভাবে। রাজা রাজরার কথা, হামামের চেহারাটাই একটা রাজমহলের সমান প্রায়। দেখেশুনে তো আমরা সকলে অবাক। রাজনগরের আরও একটি জায়গা দেখার মত, তা হল মতিচূর মসজিদ। মসজিদের গায়ে টেরাকোটার কাজ দেখার মত।

রাজবাড়ির অন্দরে

বাংলার পর্যটন মানচিত্রে চরম অবহেলিত রাজনগর। যথাযথ রক্ষনাবেক্ষন না হলে এই জায়গা হয়ত অচিরেই কালের গ্রাসে হারিয়ে যাবে। রাজবাড়ির সামনের মাঠে এখন গরুর হাট বসে, সেটাও দেখার বিষয়। মহরমের সময় তো আনন্দে মেতে ওঠে রাজনগর। রাজবাড়ি সংলগ্ন মাঠে পরপর তাজিয়া সাজান হয়। হয় দুর্গাপুজোও। বেলা পড়ে আসছে। এবার বিদায় নেওয়ার পালা। সফিউলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমরা এগোলাম সামনে।  

ভদ্রকালী মন্দির


এর পরে আমাদের গন্তব্য  রাজা নৃসিংহদেব প্রতিষ্ঠিত ভদ্রকালী মন্দির। রাজা মন্দির প্রতিষ্ঠার সময় ভারতী পদবির ব্রাহ্মণদের এখানে নিয়ে আসেন। তারাই পুজোর দায়িত্বে ছিলেন।  একসময় ঘন জঙ্গলের মধ্যে নাকি ছিল এই মন্দিরের অবস্থান। এখন অবশ্য জঙ্গল তেমন না থাকলেও। মন্দিরের চার পাশে শুধুই সবুজ ক্ষেত। জায়গাটি ভারি চমৎকার। আমার দেব দ্বিজে তেমন ভক্তি না থাকলেও ভদ্রকালী মন্দিরের পরিবেশটি বেশ পছন্দ হয়েছে।

নতুন মন্দির তৈরি হচ্ছে দেখলাম। বিরাট এক বটগাছ তার প্রাচীনত্বের সাক্ষী। ছোট্ট একটা সাঁকো পেরিয়ে যেতে হয় মন্দিরে। পুরোহিত মন্দিরের পাশেই থাকেন। দুপুরে খাওয়ার ব্যবস্থাও আছে শুনলাম। তৈরি হচ্ছে দর্শনার্থীদের থাকার জন্যও ছোট ব্যবস্থা। সব মিলিয়ে শান্ত, ছায়া ঘেরা জায়গাটি মনকে আরাম দেবে।

রাজনগরের আশেপাশে প্রচুর জঙ্গল। পথে আসতে গিয়েও পড়বে কাজু, ইউক্যালিপটাস এবং সোনাঝুরির সারি। শহুরে মন খুব প্রশান্তি পায়, আরাম পায় শহুরে চোখও। ইচ্ছে হলে কাছেই বক্রেশ্বর সেটা দেখে নিতে পারেন আসার পথে।

রাজনগরের পথে…

এবার বলি যাতায়াতের ব্যাপারটা। কলকাতা থেকে সিউড়ি অজস্র বাস এবং ট্রেন আছে। তাতে চড়ে সকাল সকাল পৌঁছে যান সিউড়ি বাস স্ট্যান্ডে। সিউড়ি থেকে রাজনগরের বাস মিলবে। রাজনগর বাস স্ট্যান্ড থেকে রাজবাড়ি হেঁটেই যাওয়া যায়। ভদ্রকালী মন্দিরে গেলে টোটো নিয়ে নেবেন। বক্রেশ্বর গেলে চন্দ্রপুর মোড় থেকে বেঁকে যেতে হবে। থাকার জন্য সিউড়িতে প্রচুর হোটেল আছে। রাজনগরে থাকার তেমন জায়গা নেই। দু’একটা অনুষ্ঠান ভবন আছে। সেখানে থাকা যায়। সিউড়ি থেকে গাড়ি ভাড়া করে একদিনেই সব ঘুরে আসা যায়, পকেট সায় দিলে সেটাও করতে পারেন।     

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *