সম্পাদকীয়, জুন ২০২১

মন খুব খারাপ, রাজামশাই বসে আছেন বিষন্ন চিত্তে। আশেপাশে তাকে স্তোক দেওয়ার জন্য জীবনপণ করেছেন মন্ত্রী সান্ত্রী চাটুকারের দল। কাজ হচ্ছে না। রাজার তাতেও মন খারাপ। এত কিছু করা দেশের ভালর জন্য তাতেও প্রজাদের মন পাওয়া ভার। কি অকৃতজ্ঞ মানুষের দল তার দেশে! সেই ছোট থেকে শুধু মানুষের কথাই ভেবে এসেছেন, যা কিছু করেছেন মানুষের ভালর জন্যই করেছেন, তাতেও কিনা মানুষের মন ওঠে না! আর ওদিকে হয়েছে কিছু খুচরো বিরোধী দল, তারা শুধু নিন্দে করেই গেল। এত ভাল ভাল কাজ তাদের আমলে না হয়েছে, না হবে। আরে বাবা, এসব করা কাদের জন্য? দেশের মানুষের জন্যই তো। হুহ্‌ এসব ভাল ভাল ব্যাপার কেউ বুঝলে তো… রাজার তাই মন ভাল নেই, মন ভাল নেই, মন ভাল নেই।

ছোট থেকে চা বিক্রি করা, পরে সন্ন্যাস নিয়ে নেওয়ার জন্য সেভাবে ঘোরা ফেরা হয়নি। রাজা আমাদের একটু বেড়াতে ভালইবাসেন। তাই ২০১৪ থেকে এখনও পর্যন্ত ৬০ বার বিদেশ যাত্রা করেছেন তিনি। না না বেড়াতে যাননি, আসলে গিয়েছিলেন বিদেশী লগ্নী আনতে, দেশের কল্যাণে নানা ব্যবস্থা করতে। কিন্তু ওই যে বললাম কিছু মূর্খ বিরোধী লোক, এসব ভাল কাজের মূল্য না দিয়ে বলছে তিনি নাকি শুধুই বিদেশ বেড়াতে যান। তাদের দাবি এতে নাকি ব্যাপক খরচ হয়েছে।  কি এমন খরচ? বিমান মেনটেন্যান্সে খরচ হয়েছে সতেরোশো কোটি টাকা ৷ চ্যাটার্ড ফ্লাইটের এয়ারক্রাফটের জন্য খরচ হয়েছে প্রায় ছশো কোটি টাকা ৷ হটলাইনের জন্য খরচ হয়েছে প্রায় দশ কোটি টাকা ৷ শেষ গিয়েছেন ২০২১ এর মার্চে বাংলাদেশে। যদিও তার বিল এখনও প্রধান মন্ত্রী, থুড়ি রাজার দফতরে এসে পৌছয়নি।  তা এটা কি কোনও খরচ হল? সাকুল্যে তেইশশো থেকে চব্বিশশো কোটি টাকা। তাও তো করোনার জন্য গত বছর সেভাবে কোথাও যেতেই পারেন নি, তাতে কত মন খারাপ। তা না… শুধু নিন্দে মন্দ। রাজার তাই মন ভাল নেই, মন ভাল নেই, মন ভাল নেই।

আমেরিকার স্ট্যাচু অফ লিবার্টি আছে। নানান হলিউড সিনেমায় কত বড় করে দেখায়। আমেরিকার শান। আমাদের এমন কিছুই ছিল না এতদিন। রাজা ঠিক দেশবাসীর দুঃখ বুঝেছেন। তাই তো তার চেয়েও বড় স্ট্যাচু তৈরি করে চমকে দিয়েছেন বিশ্বকে। স্ট্যাচু অফ ইউনিটি এখন আমাদের শান। এতেও অবশ্য নিন্দুকদের শান্তি নেই, তারা বলে বেড়াচ্ছে এতে নাকি তিন হাজার কোটি টাকা খরচ হয়েছে।  আরে বাবা, ওই সামান্য টাকার বিনিময়ে দেশটা যে কোথায় উঠে গেল তা যদি বুঝত মূর্খের দলগুলি! রাজার তাই মন ভাল নেই, মন ভাল নেই, মন ভাল নেই। 

আগের রাজাদের কোনও পছন্দই ছিল না। একটা ভাঙাচোরা বিচ্ছিরি প্লেনে চেপে এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াতো। দেশের নাম ডুবিয়ে ছেড়েছে। রাজার কিন্তু এদিকে খুব নজর, কোনও মতেই দেশের নাম ডোবানো চলবে না। তাই তো শুধুমাত্র দেশের ভালর কথা ভেবেই আমেরিকা থেকে এয়ার ইন্ডিয়া ওয়ান প্লেন কিনে আনা হয়েছে। দাম বেশি পড়েনি, মাত্র সাড়ে আট হাজার কোটি টাকা। ওই দ্যাখো, অর্বাচিনের দল এতেও ভ্রূ কোঁচকায়। আরে বাবা টাকা আগে, নাকি দেশের সম্মান, রাজার নিরাপত্তা আগে। এমন প্লেন আগে কেউ দেখেছে নাকি। হু হু বাবা, হলিউডের সিনেমায় দেখা যেত, এবার, দেশের মাটিতে দেখা যাবে। কেউ বোঝে না, রাজার তাই মন ভাল নেই, মন ভাল নেই, মন ভাল নেই।

আগেই বললাম আগের রাজাদের পছন্দই ছিল না। একটা মলিন, গোল মত বিচ্ছিরি বাড়িতে বসেই দেশ চালাত তারা। এভাবে হয় নাকি? আমাদের রাজার কিন্তু এসব দিকে খুব নজর। তাই তো তিনি  নতুন প্রাসাদ এবং প্রশাসন কক্ষ বানাতে দিয়েছেন। নামও দিয়েছেন গাল ভরা, সেন্ট্রাল ভিস্তা। আহা কি সুন্দর নামটা শুনেই মনে হয় সেন্ট্রালি ভেস্তে যাওয়া কোনও প্রকল্প বুঝি। তা এই প্রাসাদের খরচ মোটে কুড়ি হাজার কোটি টাকা। কিন্তু একদল লোকের তো শোনা ইস্তক শান্তি নেই। কেউ কেউ আবার এই টাকা করোনার টিকা দেওয়ার জন্য খরচ করতে বলছে। এ আবার কি কথা? এই সব ঐতিহাসিক কাজে এমন কেউ বলে নাকি। তাজমহলের টাকায় যদি হুপিং কাশির চিকিৎসা করা হত, তাহলে কি দেশবাসী সপ্তম আশ্চর্যের একটি পেত? বোঝে না সে বোঝে না… সেন্ট্রাল ভিস্তা হলে দেশটা যে কোথায় চলে যাবে এক লাফে তা বোঝার মুরোদটুকুই নেই এদের। রাজার তাই মন ভাল নেই, মন ভাল নেই, মন ভাল নেই।

রাজা এমনিতে ফকির মানুষ। না না, রানি থাকলেও তিনি প্রথম থেকেই দুয়োরানি। তাই খরচ পাতি নেই বললেই চলে। কিন্তু তাতেও কি শান্তি আছে? রাজার পোষাক নিয়ে তো নানান রটনা। কত লোকে কত কিছু পরে, কিন্তু তিনি সামান্য দশ লক্ষ টাকার স্যুট পরলেই ব্যাস সকলের গাত্রদাহ শুরু। কলম নিয়ে রাজার একটু শৌখিনতা আছে বটে। তা সে সব শিক্ষিত মানুষদেরই থাকে। রাজা সাধারণত মন্টব্ল্যাঙ্ক পেন ব্যবহার করেন। রাজার কাছে ওই পেনের একটা সম্ভার আছে যার মধ্যে ষাট হাজার থেকে শুরু করে এক লক্ষ তিরিশ হাজার টাকা দামেরও কলম রয়েছে। কিন্তু এ নিয়েও কটাক্ষ করতে ছাড়ে না ওরা… তাই তো রাজার মন ভাল নেই, মন ভাল নেই, মন ভাল নেই।

 রাজার নিরাপত্তার খরচেও রয়েছে মজার হিসেব। এর আগে চার জনের এসপিজি নিরাপত্তার জন্য যা লাগত রাজার একার জন্যই লাগে তার থেকে বেশি। বছর খানেক আগেও রাজার সঙ্গেই এসপিজি নিরাপত্তা পেতেন আগের রাজবাড়ির সদস্যরা, সনিয়া গাঁধী এবং রাহুল ও প্রিয়ঙ্কা গাঁধী। এদের চার জনের জন্য এসপিজি নিরাপত্তা বাজেট বরাদ্দ করা হয়েছিল ৫৪০.১৬ কোটি টাকা। গত বছরই সংসদে আইন সংশোধন করে তুলে নেওয়া হয়েছে রাহুল সোনিয়া এবং প্রিয়াঙ্কার এসপিজি নিরাপত্তা। এখন এসপিজি নিরাপত্তা পান শুধুমাত্র রাজামশাই। এ বার এক জনের জন্যই সেই বরাদ্দ বেড়ে হয়েছে ৫৯২.৫৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ চার জনের জন্য যা বরাদ্দ ছিল, এক জনের জন্য তার চেয়ে বরাদ্দ বাড়িয়ে দেওয়া হল ১০ শতাংশ বেশি! ২০১৯ সালে বাজেটে বরাদ্দ ৫৪০ কোটির হিসেব ধরলে মাথাপিছু খরচ দাঁড়ায় ১৩৫ কোটি। সেটা মাথায় রাখলে শুধু রাজার জন্যই বাজেটে বরাদ্দ বেড়েছে ৩৪০ শতাংশ! কিন্তু যে দেশের জন্য নাওয়া খাওয়া ভুলে প্রাণপাত করছেন, সেই রাজার নিরাপত্তার মত জরুরী বিষয়েও মানুষের এই হিসেব চাওয়াটা খুব মর্মান্তিক। খুব স্বাভাবিক ভাবেই, রাজার তাই মন ভাল নেই, মন ভাল নেই, মন ভাল নেই।

দেশ এমন একটা খাঁটি হিরে পেয়েও তার মর্ম বুঝল না। এই রাজ্যকে সোনার বাংলা করে দিতে চাইলেও মূর্খের দল তার গুরুত্বই দিল না। গতবার তো থালা বাজিয়ে, প্রদীপ জ্বালিয়ে করোনাকে দেশ থেকে তাড়িয়েই দিয়েছিলেন। বিরোধীরা চক্রান্ত করে ফের এদেশে করোনাকে ডেকে এনেছে। দেশ তো বটেই বিদেশের সংবাদমাধ্যমগুলিও তার এহেন কৃতিত্বকে অপদার্থতা বলে তোপ দাগছে। নাহ, আর ভাল্লাগে না। তাই তো রাজার, মন ভাল নেই, মন ভাল নেই মন ভাল নেই। 

পলাশ মুখোপাধ্যায়

প্রধান সম্পাদক, অবেক্ষণ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *