দুই বাংলায় বিমল মিত্র-সাহিত্য সমীক্ষা

সুনীল দাশ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রমেশচন্দ্র মজুমদার প্রেক্ষাগৃহে অনুষ্ঠিত হল বিমল মিত্র বিষয়ক সাহিত্য সভা। বাংলাদেশের ‘সময়ের কারুকাজ’ পাক্ষিক পত্রিকা, বাংলা সাহিত্যে শরৎচন্দ্রের পর সর্বাধিক পাঠকপ্রিয় কথাকারের চব্বিশতম প্রয়াণ দিবসে এই সাহিত্য সমাবেশের আয়োজন করেছিলেন। বাংলাদেশে বিমল মিত্রের লোকান্তরের পরে শ্রোতাদের মধ্যে শতকরা আশিভাগ তরুণ প্রজন্মের সাহিত্যানুরাগীদের সমাবেশে এমন সাহিত্যসভা দিল্লি,বিলাসপুর ইত্যাদি ভারতের বিভিন্ন স্থানসহ পশ্চিমবঙ্গের কোথাও অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে আমার জানা নেই।
১৯৩৩ সালের কবিপক্ষের নাট্যানুষ্ঠান ‘ডাকঘর’ ঢাকায় মঞ্চায়ন থেকে শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বরে গত একুশ বছরে সাত বার বাংলাদেশের আমন্ত্রিত সফরে প্রতিবারই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে বার বার আসা যাওয়াটা আমার অনিবার্য আকর্ষণের থেকেছে। পশ্চিমবঙ্গে বাংলা আকাদেমি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে থেকে বাংলাদেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে বাংলা একাডেমির কাজের সূচনা। আমার প্রথম সফরের সময় কথাকার সেলিনা হোসেন ছিলেন বাংলা একাডেমির উপপ্রধান। পরে সেলিনা প্রধান হয়েছেন যখন তখনও বার বার ওই বাংলা একাডেমির কার্যালয়ে গিয়েই সাক্ষাৎ করেছি শক্তিময়ী লেখিকার সঙ্গে। বিমল মিত্রের দুবার বাংলাদেশ সফরের বিষয়ে সেলিনা হোসেনের সঙ্গে আমার যাবতীয় আলোচনা বাংলা একাডেমির কার্যালয়ে বসে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর.সি.মজুমদার হলে এর আগে আমি কোনদিন আসিনি। ১৯৩৭ সাল থেকে ১৯৪২ সাল পর্যন্ত আর.সি.মজুমদার ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা বিভাগে প্রথম ডিন। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁর নামাঙ্কিত এই আর্টস অডিটোরিয়াম। সুব্যবস্থার এই সভাকক্ষটি কলকাতার বাংলা আকাদেমির মত লম্বাটে নয়, বর্গাকার, গ্যালারির আঙ্গিকে গড়া। সমাবেশের প্রথম দিকে শ্রোতার সংখ্যা কম ছিল। অনুষ্ঠান শুরু হয়ে যাওয়ার পর ধীরে ধীরে প্রেক্ষাগৃহের অনেকটাই ভরে গেল। ন’বছর পর শ্রোতার আসনের প্রথম সারিতে সাহিত্য, সিনেমা আর থিয়েটার দুনিয়ার পাশাপাশি আঁকার জগতের অক্লান্ত মানুষ দিলদার হোসেনকে দেখে ভাল লাগল। কলকাতার টাউন হলে প্রেমেন্দ্র মিত্র জন্মশতবর্ষের অনুষ্ঠানে সেলিনা হোসেন, নাশরিন জাহানের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হয়ে দিলদার এসেছিলেন।
আর্ট অডিটোরিয়ামের অনুচ্চ প্রসারিত মঞ্চে ছজন বক্তার আসনের সামনের দুটি টেবিলের উপর ফুলের সাজ। পেছনে আলোচনাসভার শেষাংশে ‘কথাপুরুষ বিমল মিত্র’ তথ্যচিত্রটি দেখানোর জন্য বিশেষ স্ক্রিনের আয়োজন।

পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক সাইফুল ইসলাম তালুকদার আমন্ত্রণপত্রে আলোচক যে চার বক্তার নাম দিয়েছেন প্রধান আলোচক হিসেবে কলকাতার থেকে আসা লেখকের সঙ্গে তাঁরা প্রত্যেকেই উপস্থিত হয়েছেন ঠিক সময়ে। সম্পাদক জনাব আমিরুল ইসলাম মুকুল নিজে গিয়ে আমায় হোটেল ভিক্টরি থেকে নিয়ে এসেছেন তাঁর গাড়িতে। অনুষ্ঠানের চার-পাঁচ দিন পরে প্রকাশিত পত্রিকার প্রথম বর্ষের ১৪ সংখ্যক পত্রিকায় সাইফুল ইসলাম তালুকদার লিখেছেন, “বাংলা ভাষাভাষী মানুষের কাছে বিমল মিত্র’র আবেদন কখনোই ফুরোবার নয়। পাক্ষিক সময়ের কারুকাজ পুলক বোধ করছে এই ভেবে, যে এমন একজন মহান স্রষ্টার স্মরণসভার আয়োজক হয়েছি আমরা। এ তো শুরু মাত্র। আমাদের চেষ্টা থাকবে এই ধারাবাহিকতা রক্ষা করার”।
আলোচকদের মধ্যে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের দুই অধ্যাপক ডক্টর মিল্টন বিশ্বাস এবং রাহেল রাজীবের সঙ্গে এসেছিলেন ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির অধ্যাপকবন্ধু এবং বাংলা স্নাতকোত্তরের বেশ কিছু ছাত্রছাত্রী। এই দুই অধ্যাপক সাহিত্যিকের প্রিয় প্রাক্তন ছাত্র পত্রিকার সহকারী সম্পাদক সোলাইমান হোসেন আসায় পরের সন্ধ্যায় নিয়ে গিয়েছিলেন ধানমুন্ডির ঝিলপাড়ের এক রেস্তোঁরায় সাহিত্যের আড্ডায়। প্রবন্ধকার সোলাইমান হোসেন গবেষণা করছেন ছোটগল্পের প্রেক্ষিতে পুরোনো ঢাকা শহরের আজব রুপান্তরের ইতিবৃত্ত। পত্রিকার সম্পাদকীয় কার্যালয় ২৭, বিজয় নগর থেকে আমায় ধানমন্ডির আড্ডায় এবং তারপর আবার আমায় হোটেলে ফিরিয়ে দিতে দিতে সবটুকু সময় লেখার নগরমনস্কতার জন্মগত এবং চর্চাসাপেক্ষ দৃষ্টিকোণ প্রসঙ্গে আলোচনা হল টুকরো টুকরো। আড্ডায় অধ্যাপক রাহেল রাজীব ছিলেন আমিরুল ইসলাম মুকুলের সঙ্গে। রাহেল রাজীব তার প্রবন্ধ সংকলন-পাঠ উন্মোচনের খসড়া উপহার দিলেন আমায় ওর কবিতারই ‘জুইদি ও মাতাল প্রেমিক’ শিরোনামের বইটির সঙ্গে। পাশাপাশি ওই সন্ধ্যায় সাহিত্যের আড্ডার দ্বিতীয় পর্বটি ছিল কিছুটা দূরে আর একটি রেঁস্তোরায় শামীম রফিকের আপ্যায়নে। সাহিত্যপত্র ‘অরণ্য’এর সম্পাদক শামীম রফিক কর্মজীবনে ব্যাঙ্ক ম্যানেজার। একই সঙ্গে জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পি.এইচ.ডি গবেষণা কোর্সে গবেষণা করছেন।
বিমল মিত্র স্মরণ সন্ধ্যার বক্তারা প্রত্যেকেই মোটামুটি বিমল মিত্র রচিত সাহিত্য বিষয়ক পড়াশোনা করে এসে বক্তব্য রেখেছেন। ছড়াকার ও শিশুসাহিত্যিক আনজীর লিটন বললেন বিমল মিত্র রচিত কিশোর সাহিত্যের গুরুত্ব সম্পর্কে। আর কবি ও সাংবাদিক সৈকত হাবিব বিমল মিত্রের পাঠকপ্রিয়তাকে বিষয় করে। সভাপতির ভাষণে আমিরুল ইসলাম মুকুল জানালেন বাংলা কথাসাহিত্যের ধ্রুপদী ধারার সঙ্গে আজকের তরুণ প্রজন্মের পরিচয় হওয়া একান্ত প্রয়োজন।

আমার আলোচনাকে আমি সীমাবদ্ধ রেখেছিলাম ব্যক্তি বিমল মিত্র এবং কথাশিল্পী বিমল মিত্রের সৃষ্টসাহিত্যে অসাম্প্রদায়িক মানসিকতার প্রসার বিষয়ে।
বিমল মিত্রের ছেলেবেলায় তাঁদের চেতলার ১৬নম্বর সবজি বাগান লেনের বাড়িতে বিমল মিত্রের গৃহশিক্ষক ছিলেন মহম্মদ বশির নামের এক সজ্জন ব্যক্তি। সে সময়টায় ধর্মীয় ভেদবুদ্ধি হিন্দুমুসলমানের মধ্যে আরোপিত পার্থক্যকে প্রশ্রয় দেয়নি। পাড়ার ক্লাবে যেমন হিন্দুমুসলমান নির্বিশেষে ছেলেরা ফুটবল খেলতো, তেমনই সারাদিন চেতলা স্কুলে দুই সম্প্রদায়ের ছাত্ররা বেঞ্চে বসে ক্লাস করতো। কোনো বিরূপ মনোভাব বা বিশ্লেষপূর্ন আচরণ দুই সম্প্রদায়ের ছাত্রদের মধ্যে ছিল না। স্কুলের সারা দিনের মধ্যে কেবল একটিমাত্র পিরিয়ডে তরুণ বিমলেরা যখন সংস্কৃত ভাষা শিখতেন সেই সময় মুসলমান ছাত্ররা অন্য ক্লাসঘরে পাঠ নিত উর্দু ভাষার। গৃহশিক্ষক মহম্মদ বশির ছাত্র বিমল মিত্রের পরিবারের যাবতীয় উৎসবে আমন্ত্রিত হয়ে আসতেন। ঈদ ইত্যাদি মুসলিম উৎসবে বিমলেরা সানন্দে যেতেন মাষ্টারমশাই এবং মুসলমান বন্ধুদের বাড়িতে।গত শতাব্দীর তিনের দশক থেকে শাসক ইংরেজ সুকৌশলে বিভেদের বিষবাষ্প ঢুকিয়ে দিতে শুরু করে বাঙালীর স্বাধীনতা আন্দোলনকে দুর্বল করার জন্য।
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিমল মিত্র যখন ক্রমশঃ হতাশায় ডুবে যাচ্ছিলেন, সেই বিষাদপর্বে ১৯৮৫ এবং ১৯৮৭ তে বাংলাদেশ সফর তাঁকে উজ্জীবিত করেছিল। মানিকগঞ্জে এক চাষীর মেয়ের দেওয়া তাদের গাছের চারটে গন্ধলেবু লেখকের জীবনে পাওয়া শ্রেষ্ঠ উপহার হিসেবে মনে রেখেছিলেন।
দ্বিতীয়বার বাংলাদেশ সফরের পর লিখেছিলেন ‘ভগবান কাঁদছে’ উপন্যাসটি। আমাকে উৎসর্গ করা এই উপন্যাসে যশোর জেলার সুলতান আহমেদ-এর ‘চরিত্র গঠন শিবির’ স্বাধীনতা সংগ্রামে অন্য মাত্রা দিয়েছে। ‘ভগবান কাঁদছে’ উপন্যাসের প্রধান চরিত্র দেবব্রত সরকারের কথা লিখতে গিয়ে বিমল মিত্র লিখেছেন, “…যখন দেশ ভাগ হয়নি তখনই সেই তাদের ‘চরিত্র গঠন শিবিরে’ সুলতান আহমেদ সাহেবের কাছে যা দেবব্রত শিখেছিল তাতেই তার চরিত্র গঠন সম্পূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। জীবনে যা সে শিখেছিল তাতেই তার চরিত্র গঠন সম্পূর্ণ হয়ে গিয়েছিল”।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর.সি.মজুমদার হলে বিমল মিত্রের অসাম্প্রদায়িক জীবনবোধ বলার প্রসঙ্গে ‘ভগবান কাঁদছে’ উপন্যাস লিখতে লিখতে বিমল মিত্রের পরম শান্তির কথা উল্লেখ করেছিলাম। বাংলাদেশে গিয়ে বাংলা সাহিত্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে আর উদ্বেগ ছিল না লেখকের। ১৯৮৮ সালে ভারতের স্বাধীনতা দিবসে প্রকাশিত এই উপন্যাস বিমল মিত্র রচনাবলীর নবম খন্ডের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাকক্ষে বিমল মিত্র স্মরণে আমি যখন এই কথাগুলো বলছি ঠিক তখনই কলকাতায় লেখকের বাসভবন বিমল মিত্র আকাদেমিতে প্রকাশিত হচ্ছে বিমল মিত্র রচনাবলীর নবম খন্ড। ভাবতে ভাল লাগছে যে দুই বাংলার রাজধানীতে মহাকাব্যিক উপন্যাসের অপ্রতিম জননন্দিত কথাকারের প্রয়াণ দিবসে, ঠিক একই সময়ে বিমল মিত্র স্মরণে সমবেত হয়েছেন দুই বাংলার সাহিত্যানুরাগী মানুষেরা তাদের ‘মোদের গরব,মোদের আশা’র ভাষাশিল্পীর প্রতি শ্রদ্ধায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *