সম্পাদকীয়

দমদম ক্যান্টনমেন্টের নরেন্দ্র সিনেমার সামনে একটি দোকানে বেশ ভাল ধোসা পাওয়া যায়। মাঝে মধ্যে ওই দোকানে ধোসা বা দইবড়া খেতে যাই আমি। সেদিন সপরিবারে ধোসা খেতে গিয়ে কেমন যেন চেনা ছন্দটা মিলছিল না। খাবারের স্বাদ অপরিবর্তিত, কিন্তু পরিবেশটা কেমন যেন অচেনা। এমনিতে বাজারের মধ্যে বলে এই জায়গাটা সব সময়েই গমগম করে, কিন্তু ভরা সন্ধেতে এমন শুনশান লাগছে কেন! খোঁজ নিতেই জানা গেল আগের দিনই নরেন্দ্র সিনেমাহল বন্ধের নোটিশ ঝুলিয়ে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। মানে বন্ধ হয়ে গেল আরও একটা সিনেমা হল? ধোসাটা কেন যেন আর খেতে ভাল লাগল না। একটা অন্য রকমের কষ্ট তার বদলে গলা দিয়ে নামতে থাকল। না, নরেন্দ্র সিনেমা হল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আমার কোন চেনাজানা নেই। আমি ফি সপ্তাহে সিনেমা দেখার লোকও নই। আট বছর দমদমে আছি সাকুল্যে দুবার হয় তো এই হলে ছবি দেখতে গিয়েছি। তাহলে এই কষ্ট কেন?
গত দেড় দশক ধরে একের পর এক সিনেমা হল বন্ধ হয়ে যেতে দেখছি। তার মানে কি সিনেমার দর্শক কমে গিয়েছে? এ কথা তো জোর দিয়ে বলা যায় না, কারন যখন দেখি সেই সিনেমা হল বন্ধ হয়ে গিয়ে সেখানে একের পর এক মাল্টিপ্লেক্স গড়ে উঠছে। সব জায়গার কথা তো এই স্বল্প পরিসরে আলোচনা করা যায় না। একটা উদাহরণ দিই, এই শতকের গোড়ার দিকে আমি দুর্গাপুরে যাই চাকরি সূত্রে। তখন দুর্গাপুরে বিভিন্ন সিনেমা হলের রমরমা। বয়স কম, একা থাকি, সন্ধের পর সেভাবে কাজ না থাকলে সিনেমা দেখতে গিয়েছি বিভিন্ন হলেই। ষ্টেশনের কাছে চিত্রভানু হোক বা বি জোনের চিত্রালয়া। বেনাচিতির অনুরাধা হোক বা আমার তৎকালীন বাড়ির কাছের দুর্গাপুর সিনেমা। দুর্গাপুর সিনেমা তো সেই আমলেই মাল্টিপ্লেক্স, কারন ওর নিচে ঝুমুর বলে ছিল আরও একটা সিনেমা হল, যদিও সেখানে মূলত বয়স্কদের সিনেমাই দেখানো হত। কিন্তু এই ছবিটাই বদলে গেল কয়েক বছরের মধ্যে। একে একে বন্ধ হয়ে গেল চিত্রভানু, চিত্রালয়া, অনুরাধা। খুব সম্ভবত ঝুমুরও এখন চলে না। পুরনোদের মধ্যে টিকে আছে কেবল দুর্গাপুর সিনেমা। তাহলে কি দুর্গাপুরে সিনেমাপ্রেমী মানুষ এক লহমায় সব গায়েব হয়ে গেল। তাই বা বলি কি করে, যখন দেখি এই দুর্গাপুরের একের পর এক গড়ে উঠল আইনক্স, আরতি সিনেমাস, বায়োস্কোপের মত মাল্টিপ্লেক্স। আসলে আমাদের সংস্কৃতি বদলেছে, বিশ্বায়ন ধাক্কা দিয়েছে বড় শহরে, বড় শহরের ঢেউ ক্রমশ ছড়িয়ে পড়েছে এই সব মফঃস্বলে।
আমার শৈশব কৈশোর কেটেছে গোবরডাঙ্গায়। মনে আছে গোবরডাঙ্গায় স্মৃতি সিনেমা হলের কাছাকাছি ছিল আমাদের বাড়ি। শো শুরুর আগে মাইকে গান বাজাতো সিনেমা হল কর্তৃপক্ষ। সেই গান শুনে আশপাশের মানুষ বুঝতে পারতেন এবার যাওয়ার সময় হয়েছে। সেই যাওয়াটাও রীতিমত পিকনিকের সামীল। পাড়ার মহিলারা সারাদিন নানা কাজ সেরে, রান্না বান্না করে সব গুছিয়ে রেখে নাইট শোয়ে সিনেমা দেখতে যেতেন। বাড়ির বড়রা কেউ গিয়ে আগেভাগে টিকিট রাখার কথা বলে আসতেন হলের কাউকে। মাকেও দেখেছি আমাকে বাবার জিম্মায় করে দিয়ে পাড়ার মাসিমা কাকিমাদের সঙ্গে নাইট শোতে সিনেমায় যেতে। আমি বাবার কাছে বসে সেই সময় নানা ধরণের গল্প শুনতাম। ফিরে আসার পর মায়েদের সেই ঘোর থাকত প্রায় সপ্তাহখানেক ধরে। পুকুর ঘাটে, বিকেলের গল্পের আসর কিম্বা ডালের বড়ি দেওয়ার আসরে তার চর্চা চলত সোৎসাহে। এখনও অনেকেই সিনেমায় যান, যে যার পরিবার নিয়ে টুক করে গিয়ে সিনেমা দেখে চলে আসেন। স্ট্যাটাস থাকে ফেসবুকে, চর্চাও হয় ফেসবুকেই।
পাড়ায় বা বাড়িতে কারও বিয়ে হলে একটা বড় আকর্ষণ থাকত নতুন জামাই অথবা নতুন বৌ এলে তাকে নিয়ে সিনেমা দেখতে যাওয়া হবে। পাড়াতুতো শালা বা দেওর হিসেবে এই অধিকার বহুবার উপভোগ করেছি। এখন ঘরে ঘরে সিনেমার চ্যানেল সেখানেই বসে গেলে হয়, আর তাছাড়া মাল্টিপ্লেক্সে নতুন সিনেমা দেখতে গেলে টিকিট পিছু প্রায় আড়াই শো তিনশো টাকা লাগবে। ১৫ – ২০ জনের গুষ্টি নিয়ে সিনেমা দেখতে গেলে নতুন জামাই বা বৌদির কি হাল হতে পারে ভেবেই সিনেমা দেখার পরিকল্পনা বাতিল। এর সঙ্গে যদি খাওয়া দাওয়া যোগ হয় তবে তো কথাই নেই। মাল্টিপ্লেক্সের ভুট্টার খই ভাজাই (পপকর্ণ) ন্যুনতম আশি টাকায় বিক্রি হয়। অন্যান্য খাবারের তো কথাই নেই। আমাদের মা মাসিরা তো বাড়ি থেকেই নানা মুখরোচক খাবার বানিয়ে নিয়ে যেতেন, বাইরে থেকেও চপ সিঙ্গাড়া কাটলেট নিয়ে হলে ঢোকা যেত বা যায়। কিন্তু মাল্টিপ্লেক্সে বাইরের খাবার এলাউ নেই। এমন কি জলও নিয়ে যেতে দেয় না অনেকে। ‘পানীয় জল নিয়ে প্রবেশ আটকানোর কোন অধিকার’ নেই এই কথা বলে রীতিমত প্রতিবাদ করে এবং সংবিধান দেখানোর পর আমাকে ছাড় দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অনেকেই সিনেমা দেখতে গিয়ে এই সব নিয়ে ঝামেলা করতে চান না। ফলে জলেরও বোতলও বেশি দাম দিয়ে কিনে মাল্টিপ্লেক্সে সিনেমা দেখার মাশুল গুনতে হয়।
তবুও ভিড় উপচে পড়ে। মাল্টিপ্লেক্সে ছবি দেখাটা স্ট্যাটাস। লোকে সিনেমা দেখতে দেখতে ছবি তুলে পোস্ট করে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামে। তারপর ছবি দেখার চেয়ে সেই ছবি দেখার ছবিতে কতগুলি লাইক, কমেন্ট এল তাই নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়ে অনেকেই।
দমদম দিয়ে শুরুটা করেছিলাম তো, ফিরে আসি আবার এই এলাকাতেই। এই অঞ্চলে রমরমিয়ে চলা বেশ কয়েকটি সিনেমা হল এখন ইতিহাস। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি হলের নামেই সেখানকার বাসস্টপের নাম ছিল। মৃণালিনী, রাধাশ্রী, শেলি তার মধ্যে অন্যতম। এগুলি এখন ইতিহাস। ছবিটা শুধু কলকাতা বা অন্যান্য বড় শহরের নয়, এখন মাল্টিপ্লেক্স হচ্ছে রাজ্যের বিভিন্ন জায়গাতে। সেখানকার সিনেমা হল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, গজিয়ে উঠছে সিনেমা দেখার নতুন ঠিকানা। এটা ভাল না মন্দ? সে তো তর্কের বিষয়, আবেগের বিষয়। মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্তরাও এখন বিনোদনের জন্য কিছু টাকা সরিয়ে রাখেন। কিন্তু গরিবের তো বিনোদনের কোন জায়গা থাকতে পারে না, সেই অধিকারও বোধ হয় নেই। তাই তো কুড়ি বা তিরিশ টাকার সিনেমা হল আজকের দিনে অচল। গরিবের জন্য? এক ঝাঁক টিভি চ্যানেল আছে না!
অন্যান্য বারের মত এবারেও ব্যক্তিগত আবেগ শেয়ার করলাম সকলের সঙ্গে। সিনেমা শিল্পই ক্রমশ ধুঁকছে। সিঙ্গল স্ক্রিনের সংখ্যা কমতে থাকলে শুধুমাত্র মাল্টিপ্লেক্স যে গোটা সিনেমা শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে পারবে না, তা কিন্তু কলা কুশলীরাও জানেন। শুধু জেনেও জানি না আমরা। ভাল থাকবেন সকলে। বইমেলা সংখ্যায় আমরা মূলত কবিতার উপরে জোর দিই একটু বেশি, এবারেও ব্যতিক্রম নয়। নতুন পুরনো নানান কবির লেখা এবারের সংখ্যায় ঠাঁই পেয়েছে। পাশাপাশি রিয়েছে দেশ বিদেশের নানা লেখকের বিভিন্ন ধরণের, বিভিন্ন বিভাগের লেখাও। পড়ে মতামত জানাবেন। কথা হবে পরের সংখ্যায়।

পলাশ মুখোপাধ্যায়
সম্পাদক, অবেক্ষণ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *