ভুতে খেল মাছ ভাজা (ছোটদের গল্প)

মিতালী মিত্র

উড়ন্ত মাছ ভাজা অথবা ভাজা মাছকে উড়তে দেখেছ কখনও? আমাদের তুন্না কিন্তু দেখেছে। এমনকি ভুতের গলায় গানও শুনেছে। তোমরা শোননি? তাহলে গল্পটা তুন্নার মুখ থেকেই শোনা যাক।
বছর পাঁচেক আগেকার কথা। সেবার গরমের ছুটিতে আমি আর দিদি ঝকর পাড়ায় আমাদের মামার বাড়ি গিয়েছিলাম। সেখানেই ঘটেছিল সেই অঘটন। বৃষ্টির এক ঘিনঘিনে সন্ধ্যায় দাদু নিয়ে এলেন এক গাদা পুঁটিমাছ।
এ সময় গরমাগরম পুঁটিমাছ ভাজা, ওহ্‌ সোয়াদই আলাদা – বললেন দাদু।
তবে মাছভাজা নিয়ে যতই আদিখ্যেতা থাকুক আর পড়াশোনা যতই খারাপ লাগুক – আমাদের পড়তে বসতেই হত প্রতিটি সন্ধে বেলা। সে গরমের ছুটিতে বেড়াতে গেলেও। এটাই ছিল আমার দাদুর নিয়ম। কাজেই মাছভাজার তোড়জোড় ফেলে আমাদের দু বোনকেই যেতে হল দাদুর ঘরে জানালার ধারে পড়ার টেবিলে। ইতিহাস বই খুলে শিবাজীর বীরত্ব চ্যাপ্টারটা একবার পড়তে না পড়তেই মাছভাজার জম্পেশ গন্ধ পেলাম। নাক দিয়ে ঢুকে একেবারে মাথায় সেঁধিয়ে গেল। বড়মামার দেওয়া বিদেশী কোলন কোথায় লাগে। এ সময় টিভিতে সিরিয়াল না দেখে দিদুভাই যে আমাদেরই জন্য মাছ ভাজছে – কৃতজ্ঞতায় একেবারে গলে গেলাম যেন।
জলদি আমাদের সামনে গরম গরম মাছভাজা চলে এল। দিদি ডিশটা তেবিলে রাখবে কি রাখবে না ভাবতে ভাবতেই আমি প্রথম রাউন্ড শুরু করে দিলাম। তাই না দেখে দিদিও ঝপাঝপ হাত চালিয়ে খাওয়া শুরু করল। আহা কি আনন্দ আকাশে বাতাসে। চোখ বুজে খাচ্ছে দিদি, খাচ্ছি আমি। বাড়ানো হাতে যেমন উঠছে তেমনই মুখে ঢুকছে। হঠাৎ মনে হল ঝুপ করে চোখটা যেন আরও অন্ধকার হয়ে গেল। যাহ্‌ কারেন্ট গেল – ওঘর থেকে দাদু বলে উঠলেন।

জনালার ধারে টেবিলের ওপর বইপত্রের মাঝে রয়েছে তাজা মাছভাজা। সামনে আমি ও দিদি আর এক থোকা অন্ধকার। চোখ খুলে আমার কেমন যেন গা শিরশির করে উঠল। মনে হল দিদিরও একই অবস্থা। তবে মাছ খাওয়া কি বন্ধ করা যায়? দুজনের হাতই এক সঙ্গে ফের গিয়ে পড়ল ডিশে। কিন্তু একি ! ডিশে মাছ কই? এই মাত্র অনেকগুলো তো ছিল। সবে গোটা দশেক মত খেয়েছি আমরা।
অন্ধকারটা চোখে সয়ে যেতেই চোখ গেল জানালার বাইরে। আবছা হলেও দেখা যাচ্ছিল সব কিছু। কি দেখলাম? বলতেও আমার গায়ের লোম খাড়া হয়ে উঠেছে। বুঝতে পারলাম আমাদের এপাশে ওপাশে ভাজা মাছগুলো কড়মড় করে চিবিয়ে খাচ্ছে কেউ। কারা খাচ্ছে তাদের দেখা যাচ্ছে না। কোথাও কিছু নেই কেবল আমাদের এদিকে-ওদিকে, ডাইনে-বাঁয়ে, উপরে-নিচে দেখছি ভাজা মাছগুলো কেমন মিলিয়ে যাচ্ছে। ঠিক যেমন করে আমরা চিবিয়ে খেলে খাবারটা কমে যায় ধিরে ধিরে। এমনকি সম্মিলিত কচর মচর আওয়াজটাও টের পাচ্ছি।


হেঁড়ে গলা, গোদা গলা, চিকন গলা, ফাটা গলায় নানান সুরে কারা যেন গানও গাইছে আমাদের কানের গোড়ায়। – ভাগ্যিস মাছ ভাজে মানুষে,
তাই খাই ঝপাঝপ
মৌরলা গপাগপ
আরও খাই পুঁটিমাছ, পার্শে।
বুঝতে পারছ অবস্থাটা। আমরা দুই বোন জাপটাজাপটি করে ঠকঠক করে কাঁপছি। ঘর থেকেও নড়তে পারছি না। যেমন হঠাৎ গিয়েছিল তেমন হঠাৎই আলো জ্বলে উঠল। তখন নো গান, নো মাছ ভাজা। আমরা দুই বোন বসে আছি শূণ্য ডিশ নিয়ে। বোধ হয় এক মিনিট মত আলোটা জ্বলেছিল, আবার নিভে গেল। তারই মধ্যে দিদুভাইয়ের চিৎকার কানে এল – এই মরেছে কাঁচা মাছগুলো গেল কোথায়?
আমরা তো জানি কি হয়েছে। কিন্তু আমাদের জানার আরও কিছু বাকি ছিল। হঠাৎ দিদি আঙুল তুলে দেখাল জানালার দিকে। ওর চোখ গোল্লা গোল্লা হয়ে গেছে, মুখে কথা নেই। আমি তাকিয়ে দেখ – ও বাবা এসব কি? সরু সরু লিকলিকে হাত পা, চিমসে চেহারার কতগুলি যেন ছায়া। ওদের হাতে হাতে ঘুরছে মাছভাজা। আমার বয়সী যে ছোট মেয়েদের দলটা রয়েছে, ওরা নাচছে, ধিনতা ধিনা,
আয় না সোনা,
মাছ ভাজাটা তুলে নেনা
– বৃষ্টি শুরু হয়েছে। বৃষ্টির ফোঁটা ওদের গায়ে পড়ে কেমন যেন পিছলে যাচ্ছে। ঠিক যেন গুপি বাঘার সেই ভুতের নাচ।

এবার ঠিক ভুতের রাজা আসবে। – বলল দিদি। ঝটপট ঠিক করে ফেল কি কি চাইব। – বললাম আমি। দু বোনে মাছ ভাজা ভুলে ভুতের রাজাকে দাকতে লাগলাম।
খানিক পরে দেখি একটা মস্ত কালো মুখ আমাদের জানালার গরাদের ওপাশে তার চোখদুটো বনবন করে ঘুরছে। কানদুটো কি লম্বা! আর দাঁত? যেমন বড়, তেমন সাদা। বর চাইব কি, আমরা দুই বোন ধপাস। দাঁতে দাঁত লেগে কুপোকাৎ।
এরপর থেকে মাছ ভাজা পেলে আমি দু হাতে শক্ত করে ধরে রাখি। যাতে উড়ে না যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *