দেখার আগে দেখা

সুনীল দাশ 

রোমের আকাশে শীতের সকালের এই আলোর হাসি দেখলে সত্যি মনটা ভরে যায় বেশ।রোদ নয় রোদের আভা জেগেছে সর্বত্র। শুধু রোমান্টিক ইতালিই তো নয়, য়ুরোপ আমেরিকার বছরের প্রায় প্রান্তের এই দিনটা ডিসেম্বরের পঁচিশ তারিখটা অন্য আর পাঁচটা দিন থেকে আলাদা। রোম শহরের মধ্যেই বিশেষ করে ভাটিক্যান সিটিতে আজকের যীশুদিনের তো জাঁকজমকের অন্ত নেই।
আলোর হাসি মাখা এই সকালকে আরও ভালো লাগছে, গোটা রোম শহরটাই এমন উদ্যানময় – এখানে যাকে বলে ‘পিয়াৎসা’ (Piazza) – সেই প্রাসাদ দিয়ে ঘেরা বেরাবার বাগানগুলো থাকায়। বাগান বানানোর ঝোঁক রয়েছে য়ুরোপের নতুন পুরনো সব শহরেই। পাথরের সৌধ শ্রেণীর পাশাপাশি খুব যত্ন করে নিসর্গ প্রকৃতিকে এরা সাজিয়ে তোলে জায়গায় জায়গায় বাগানের বাহারে। ইটকাঠপাথরের চোখ ধাঁধানো চাকচিক্যের অশেষ ছাপ থেকে মুক্তি পেতে, উদার উন্মুক্ত আকাশের নিচে হাঁপ ছেড়ে বাঁচতে – গাছগাছালি, ফোয়ারা, জলাশয় আর ফুল পাখিকে লতা পাতার নাগালে এনে এইসব উদ্যান বা পিয়াৎসা সাজানোর উদ্যোগ।
‘স্বামীজি, আজ আমরা বেরিয়েছি আপনার সঙ্গে এই বিশেষ দিনে রোমের ভাটিক্যান সিটির মধ্যে সেন্ট পিটার ব্যাসিলিকা গির্জা দেখতে।’ স্বামীজি নরেন্দ্রনাথের পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে কথাটা বললেন শ্রীমতী আলবার্তা।
‘সেন্ট পিটার দেখার হলে তো আজ আর কোথাও যাওয়ার সময় পাওয়া যাবে না। বাইরে, ভেতরে, নিচে, ওপরে সবটা মোটামুটি দেখতে শুরু করলে তো সারাটা দিনেও প্রতিটি পাথরের মূর্তির পাশাপাশি ধাতব মূর্তির ভাস্কর্য আর বিশাল ওই গির্জার প্রকোষ্ঠের পর প্রকোষ্ঠ জুড়ে স্থাপত্যকলার অনুপম শিল্প সম্ভার।’
‘ঠিক বলেছেন স্বামীজি। মিস্টার ম্যাকলিওড আমায় জানিয়েছেন যে রোম শহরে আপনি থাকবেন এক সপ্তাহ। তার মধ্যে আজকের দিনটা – একটা সম্পূর্ণ দিন সেন্ট পিটার চার্চ দেখার জন্যে তো লাগবেই। শুধু এক ঝলক দেখাই তো নয়। সব কিছু ব্যাখ্যা করে না বলে দিই যদি তো সে দেখার আস্বাদ তো পুরোপুরি পাওয়া যাবে না।’

বিবেকানন্দ ভাটিক্যান সিটিতে যাওয়ার সোজা বেশ চওড়া রাজপথটার প্রাসারিত পেভমেন্ট ধরে অনুগামী অনুরাগীদের দলটার সঙ্গে এগোতে এগোতে বলে গেলেন ‘আমার সাত দিনের মোটামুটি হিসেবের মধ্যে গোটা একটা দিন ধরাই আছে সেন্ট পিটার দেখার জন্য। গতকালই মিস্টার এডওয়ার্ডকে বলছিলাম যে কতকাল আগে স্কুল জীবনের ইতিহাসের বই থেকে জেনে আসছি এই শহরটার এই সব বিশ্বখ্যাত দর্শনীয় শিল্পকীর্তির কথা। আমি আমার স্বদেশে লেখা পত্রলেখায় জানিয়েছে যে আমাদের ফ্লোরেন্সে থাকার সময় সৌভাগ্য জোরে দর্শন মিলেছে ফাদার পোপের। আর সেখানে মাদার চার্চটিও দেখা হয়ে গেছে’।
রোম দর্শনে বিবেকানন্দের সঙ্গী দলটির মধ্যে অনেকেরই মোটর গাড়ি রয়েছে। কিন্তু সারাক্ষণ চার চাকায় চেপে ঘোরা, জায়গা বিশেষে দর্শনীয়টির প্রতি খানিকটা সময় নজর দিয়ে নিয়ে আবার মোটরের মানুষ হয়ে সাত দিন ধরে বিত্তবান ট্যুরিস্টদের মত দেখা পছন্দ নয় স্বামীজির। পায়ে হেঁটে শুধু আয়ুকালের পরম প্রাপ্তিই হয় না। প্রজ্ঞার প্রাপ্তিযোগও কত প্রসারিত – তা উপলব্ধি করেছেন স্বদেশে বিদেশে। কপিলাবস্তুর রাজার ছেলে সিদ্ধার্থ কিংবা নবদ্বীপের নীতিশাস্ত্রে প্রগাঢ় পণ্ডিত নিমাই-এরও পদব্রজে বিচরণ তাদের বোধকে বিশেষ মাত্রা দিয়েছিল – সে কথাও পাশ্চাত্যে তাঁর অনুরাগী সাহেব মেমদের শুনিয়েছেন কখনও কখনও।
ভাটিক্যান সিটিতে এই সেন্ট পিটার ব্যাসেলিকা চার্চে ঢোকার আগে য়ুরোপ আমেরিকায় নরেন্দ্রনাথ দত্ত যে কতগুলো গির্জার ভেতরে ঢুকেছেন, তাঁর মানে তো শুধুমাত্র ধর্মধাম দেখার সংখ্যাটা বাড়িয়েছেন তা নয়। দেশের ইতিহাস, তাঁর স্থাপত্য, ভাস্কর্য, চিত্রকলা, সঙ্গীত, ভাষা, সাহিত্য – মায় রাজনৈতিক পতন অভ্যুদয়ের কত বন্ধুর পথও অতিক্রম করা যায় ওই সব দেখার মধ্যে দিয়ে। স্বামীজি এর আগে কি কখনও য়ুরোপের অর্কেস্ট্রার বিবর্তনের ইতিহাসটা জানার জন্যে খুব আগ্রহী হয়েছেন? গির্জার প্রার্থনা সঙ্গীতের সঙ্গী বাদ্যযন্ত্র এক একটি বিশাল পিয়ানো যেন ইতিহাসের এক একটা অধ্যায়। মিস মারির চিঠিটা পড়ার পর থেকেই প্রশ্নটা ঘুরে ঘুরে আসছে স্বামীজির মাথার মধ্যে।

রোমে পৌঁছে লন্ডন থেকে ফরোয়ার্ড করা মিস মারির চিঠিটা হাতে পেয়েছেন। চিঠিটা পড়ে ভালো লাগলো। য়ুরোপের সঙ্গীত জগতে অর্কেস্ট্রা বাদ্যযন্ত্রের গুরুত্ব যে বেশ বেশি সেটা তাঁর অজানা নয়। গির্জার বড় বড় পিয়ানোগুলোতে যেমন বহুযুগের ওপার থেকে সুরময় ইতিহাস বেজে ওঠে, তেমনই য়ুরোপে অর্কেস্ট্রার বিবর্তনের কাহিনী তাঁর জানা কথার মধ্যেই অন্য মাত্রা এনে দেবে নিশ্চয়।
স্বামীজিকে এই সাত দিন রোম শহরটা ভালো মত দেখানোর জন্য মিসেস এডওয়ার্ড এবং মিসেস আলবার্তাকে ঠিক করে দিয়েছেন স্বামীজির এক আমেরিকান শিষ্য – মিস্টার ম্যাকলিউড। তিনি গৃহকর্ত্রীদের ঠিকানা দিয়ে, তাঁদেরকে চিঠি দিয়ে, জানিয়েছেন। তেত্রিশ বছর বয়সের এই ভারতীয় সন্ন্যাসীর পড়াশোনার গভীরতা ও বিস্তার কত যে কত ব্যাপক যত দেখেছেন, প্রতিদিন যেন আরও বেশি করে বুঝতে পারছেন শ্রীমতী সেভিয়ারও। শ্রীমতী সার্‌লোটে এলিজাবেথ সেভিয়ার হলেন ব্রিটিশ ইন্ডিয়া আর্মির ক্যাপ্টেন জেমস্‌ হেনরি সেভিয়ারের স্ত্রী। আগের বছর লন্ডনে এই সেভিয়ার দম্পতির সঙ্গে প্রথম দেখা বিবেকানন্দের। সেই প্রথম দেখা থেকেই স্বামীজির অনুগামী হয়ে গেছেন দুজনেই।
হিন্দু সন্ন্যাসী খ্রিষ্টধর্ম সম্পর্কে যে যথেষ্ট জানেন, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। তবু বিদগ্ধ ওই সুদর্শন তেজদীপ্ত মানুষটির জানার আগ্রহের কথা মনে রেখে তাঁর রোম পরিভ্রমণের গাইড হিসেবেও শ্রীমতী সেভিয়ার নিজেকে তৈরি করে নিয়েছেন। আজ এই রোম শহরের মধ্যে রোমান ক্যাথলিকদের স্বতন্ত্র শহর তথা দেশ, সর্বাত্মক স্বাধীন ভাটিক্যান সিটির মধ্যে প্রিথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ গির্জা সেন্ট পিটার ব্যাসেলিকায় প্রবেশের আগে এর নির্মাণের ইতিহাস থেকে শুরু করে শিল্পগত যাবতীয় তথ্য সব বইয়ের পাতা থেকে পড়ে – ভালো রকম ঝালিয়ে নিয়েছেন।
পৃথিবীর নানা বিষয়ে এত খুঁটিনাটি খবর রাখেন যে অধ্যাত্মজগতের মানুষটি তিনি য়ুরোপের অর্কেস্ট্রার বিবর্তনের ইতিহাসটা জানেন না বলে পরিতাপও করেন। ভাবলেও অদ্ভুত লাগে তার মানে এরপর নিশ্চয় স্বামীজি য়ুরোপে অর্কেস্ট্রার বিবর্তনের ইতিহাসটি জানার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকবেন। মানুষের তো জানার সীমা আছে একটা! এমন প্রাজ্ঞকে আর সেন্ট পিটারের সমাধির ওপর গড়ে ওঠা পৃথিবীর বৃহত্তম গির্জার নির্মাণ ও সৃষ্টিকর্মে মাইকেল অ্যাঞ্জেলো, র্যা ফেল, টিশিয়ান, বার্‌ত্তিচেল্লি কিংবা বারনিনির কথা বলতে চাইলেন না ভদ্রমহিলা।

এতো কিছু জানেন যে ভারতীয় সন্ন্যাসী তাঁকে আর নতুন করে কোন কথা জানাতে পারবেন আলবার্তা ? নিউ ক্যাসেলে কয়লা বয়ে নিয়ে যাওয়ার কোন মানে হয় না। যদিও এখনও ওই প্রজ্ঞাপুরুষের কোনকিছু না জানা থাকলে সেই ব্যাপারে নিজে অজ্ঞ বলে পরিতাপ করেন।
সেন্ট পিটার ব্যাসেলিকা গির্জার বিশাল অভ্যন্তরে স্বামীজির সঙ্গে জগতের সেরা শিল্পীদের হাতে গড়া অসামান্য মূর্তিগুলো দেখতে দেখতে , মানবদেহের নরনারীর দেহকোষের প্রত্যেকটি রেখাকে কি অনুপম মুন্সিয়ানায় পাথর খোদাই করে প্রাণের স্পন্দন জাগিয়ে তুলতে পারেন য়ুরোপের ওই অতুলনীয় শিল্পীরা, ভাবছিলেন স্বামীজি।
তখনই মনে পড়ল তাঁর এত কাল তিনি নিজের দেশের মূর্তিশিল্পী সম্পর্কে সঠিক তথ্যটা জানতেন না। মেধাবী নরেন্দ্রনাথ দত্তর নির্ভুল জানা ছিল না ভারতীয় ভাস্করদের সম্পর্কে। তাঁর ধারণা ছিল মানব দেহ নিয়ে য়ুরোপে যেমন যুগযুগান্তর ধরে অনুশীলন হয়েছে, তেমন চর্চা ভারতীয় উপমহাদেশে হয় নি। এই ভুল ধারনা থেকেই এদেশে তাঁর আর এক অনুগামিনী নারী – মিস লককে ভুল কথা বলেছিলেন ভারতীয় ভাস্করদের সম্পর্কে। বলেছিলেন যে গ্রিক ভাস্কর্যে যেমন মানবদেহ নিয়ে অনুশীলন এবং তার ফলে ওই বিষয়টাতে বিবর্তনের যেমন ধারা রয়েছে – তেমনটা ভারতীয় ভাস্কর্যে নেই। ফারগুসন সাহেবের একটা বই পড়ে স্বামীজির ধারণা বদলে গেল। তিনি ওড়িশার ভাস্কর্য মালা দেখেননি। ফারগুসন গ্রিসের পার্থেনন ভাস্কর্যের সমতুল্য বলেছেন ভারতের বনভূতিতে ধ্বংস হয়ে যাওয়া ভাস্কর্যমালাকে। স্বামী বললেন যে তিনি মিস লককে চিঠি লিখে নিজের ভুল ধারনাটা সংশোধন করে নেবেন।
সেন্ট পিটার গির্জার ভেতরে ঘুরে ঘুরে দেখাতে দেখাতে পরমুহূর্তে শ্রীমতী আলবার্তার মনে হল আচ্ছা, এখানে বিভিন্ন সময়ের যে সব রোমান ক্যাথলিক সন্তদের, আমাদের পার্সোনাল গডদের পূর্ণ বা আবক্ষ মূর্তি রয়েছে, – স্বামীজি তো আগে তাঁদের দেখেননি, ওঁদের কথা তো ভারতীয় সন্ন্যাসীর জানা নেই। এই সব পার্সোনাল গডে বিশ্বাস না থাকলে তো তাঁদের প্রতি কোনওরকমের শ্রদ্ধা নেই স্বামীজির। তাহলে এখন ওঁকে ওঁর না দেখা মূর্তিগুলো দেখাই, অজানা নামগুলো জানাই। উনি নাই বা সম্মান করলেন আমাদের পার্সোনাল গডদের, তাঁদের নাম তো শোনা হবে।
মিসেস আলবার্তা স্বামীজিকে দেখাতে শুরু করলেন – পৃথিবীর বৃহত্তম গিরজায় ওইসব খ্রিস্টান সন্তদের ঘিরে যাবতীয় রত্নরাজি, তাঁদের গায়ে অতি সুন্দর ঝালর দেওয়া পোশাকাদি দৃষ্টিনন্দন আলাদা একটা মাত্রা এনেছে, আর দেখাতে দেখাতেই তিনি স্বামীজিকে বলতে শুরু করলেন তাঁদের পার্সোনাল গডদের কথা, পাশাপাশি রোমান গির্জার প্রতীকাদির কথা।
কিন্তু বলা শুরু হতে না হতেই বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন তিনি।
শুনলেন স্বামীজির মুখ থেকে ওই সন্তদের প্রতি স্বামীজির শ্রদ্ধার্পণ। মিসেস আলবার্তা অবাক হয়ে বললেন মিসেস সেভিয়ারকে, ‘স্বামীজি কি দেখার আগেও দেখতে পান’?
তারপর তিনি এগিয়ে এসে স্বামীজিকে বললেন, ‘স্বামীজি আপনার তো এখানকার পার্সোনাল গডে বিশ্বাস করবার কথা নয়; অথচ আমরা দেখে অবাক হচ্ছি, শুঞ্ছি – আপনি এঁদের সম্বন্ধে শ্রদ্ধা প্রকাশ করছেন বেশ আন্তরিকতার সঙ্গে। আজ এই সব দেখার আগে আপনার তো কিছু জানার কথা নয়।’
বিবেকানন্দ হেসে বললেন, ‘দেখুন আপনি যদি পার্সোনাল গড-এ বিশ্বাস করেন, তা হলে তো আপনার যা কিছু শ্রেষ্ঠ – তাই নিবেদন করবেন তাঁকে। তাই না? শুনুন কারোর বিশ্বাসকে অবিশ্বাস করবার অধর্ম আমাদের ধর্মে নেই।’
রোম পর্যটনের গাইড ভদ্রমহিলাদ্বয় এবং আজকে তাঁর যারা সঙ্গী হয়েছেন, সকলেই সেই মুহূর্তে মুগ্ধ শ্রদ্ধাবনত দৃষ্টিতে ভারত সন্ন্যাসীর দিকে তাকিয়ে কোন কথা বলতে পারলেন না।

পুনশ্চঃ সঙ্গের ছবিগুলি অন্তর্জাল থেকে নেওয়া। লেখনীর সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত নাও হতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *