কু ঝিক ঝিক কুরুমবেড়া

পলাশ মুখোপাধ্যায়

দুর্গ কিন্তু দুর্গ নয়। শুনেছিলাম এমন কথা অনেক দিন আগে আমারই এক সাংবাদিক বন্ধুর মুখে। বহুকাল আগে শোনা সেই কথাটা হঠাৎ করে কি করে যে মনে এল তা বলতে পারব না। তবে ভাগ্যিস মনে এল, না হলে তো এমন একটা জায়গার কথা বেমালুম গায়েব হয়ে গিয়েছিল মন থেকে। মনে পড়তেই আমি এবার তরতাজা। কলকাতা থেকে সামান্য দূর, তাই সঙ্গের ঝোলাটা একটু গুছিয়ে নিয়েই পরদিন সকাল সকাল দুগগা – দুগগা। গন্তব্য? কেশিয়াড়ির কুরুমবেড়া দুর্গ।

ভোর ভোর পৌঁছে গেলাম হাওড়া, খোঁজ নিতেই জানা গেল ইস্পাত এক্সপ্রেস দাঁড়িয়ে আছে আমাকেই নিয়ে যাওয়ার জন্য। চোখের নিমেষে টিকিট কেটে সেঁধিয়ে গেলাম ইস্পাতের পেটে। সকাল সাড়ে আটটা নাগাদ খড়গপুরে এনে উগরে দিল ইস্পাত। খড়গপুর থেকে ২৭ কিলোমিটার দূরে কেশিয়াড়ি। সেখান থেকে বাঁ দিকে বেলদা যাওয়ার রাস্তায় তিন কিলোমিটার যাওয়ার পরেই পড়বে কুকাই গ্রামের মোড়। কেশিয়াড়ি হয়ে বেলদাগামী সব বাসই কুকাই হয়ে যায়। খড়গপুরে প্রাতরাশ সেরে তেমনই একটা বাসে চেপে বসলাম জানালার ধার দেখে জুত করে। কুকাই মোড়ে যখন বাস নামিয়ে দিল তখন প্রায় পৌনে এগারোটা বাজে। স্থানীয়দের কাছ থেকে খোঁজ খবর করে জানা গেল ডানদিকে ওই লাল মোরামের রাস্তা আরও তিন কিলোমিটার দূরে চলে গেছে গগনেশ্বর গ্রামে। সেখানেই রয়েছে আমার গন্তব্য ৭০০ বছরের পুরানো কুরুমবেড়া দুর্গ।

বেড়াতে বেরলে আমি সব সময় হাঁটায় বিশ্বাসী হিউ এন সাং। তাই লাল মাটির পথ বেয়ে গগনেশ্বর এলাকায় পৌঁছতেই চোখে পড়ল একটা কচি বাজার, সেটিকে টপকে ডানদিকে ঘুরতেই চোখের সামনে আমার গন্তব্য। পাড়ার মধ্যে এমন একটা দুর্গ টাইপের বস্তু দেখে আমি তো থ। মাকড়া পাথরের মাঝে ইতিহাস নাকি এই দুর্গের আনাচে কানাচে ফিসফিস করে কথা বলে। গগনেশ্বর গ্রামে প্রাচীন ইতিহাসের বহু উত্থান পতনের সাক্ষী এই কুরুমবেড়া দুর্গ। বর্তমানে ভারতীয় পুরাতত্ব সর্বেক্ষণ বিভাগ এই দুর্গের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে। এই দুর্গের নির্মাণ নিয়েও বহু মত প্রচলিত। ইংরেজরা সেই আমলে জেলার গেজেটিয়ারে এটিকে দুর্গ বলেই উল্লেখ করেছে।

ওড়িশি স্থাপত্য রীতিতে নির্মিত আয়তাকার এই সৌধটির চার দিকেই প্রায় আট ফুট প্রশস্ত খোলা বারান্দা। এবড়ো-খেবড়ো ঝামা পাথরের উপর চুন-বালির পলেস্তারা। ১৪৩৮ থেকে ১৪৭০ সালের মধ্যে ওড়িশার রাজা কপিলেন্দ্র দেবের আমলে নির্মিত হয় এই দুর্গ বা মন্দির। ইতিহাসবিদ রাখালদাস বল্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, গজপতি বংশের রাজা কপিলেন্দ্র দেবের রাজত্ব বিস্তৃত ছিল বর্তমান হুগলি জেলার দক্ষিণ অংশ মান্দারণ থেকে দক্ষিণ ভারতের মাদ্রাজ পর্যন্ত। সেকালে কেশিয়াড়ি ও পাশাপাশি গগনেশ্বর ছিল তসর-সিল্ক উৎপাদনের বড় কেন্দ্র। ব্যবসা-বাণিজ্যের দৌলতে এটিকে ঘিরে একদা গড়ে উঠেছিল সমৃদ্ধ জনপদ। কপিলেন্দ্র দেবের রাজত্বকালে এমন বহু দেবালয় নির্মিত হয়েছিল। কুরুমবেড়া তার অন্যতম।

এই সৌধের পূর্ব দিকে রয়েছে একটি দেবালয়ের ধ্বংসস্তূপ। মন্দিরকে ঘিরে চারপাশে শরণার্থীদের থাকার জন্য ঘরও নির্মিত হয়েছিল। এই চত্বরে তিনটি মন্দির রয়েছে যার সিলিঙে পদ্মফুল খোদিত রয়েছে। ঠিক মাঝখানে রয়েছে একটি জলের কুয়া। মহারাষ্ট্রের বাওলি স্টাইলের গঠনপদ্ধতি। যেটুকু জানা গিয়েছে, উড়িষ্যার জগমোহন স্থাপত্যের সপ্তরথ শিখর দেউল নির্মাণশৈলীর মন্দির ছিল এটি। মূল মন্দিরটি ছিল প্রায় ৬০ ফুট উঁচু। সঙ্গে ছিল বিদ্যালয়।

শোনা যায় মুঘল যুগে আওরঙ্গজেব আসেন এই মন্দিরে। দাউদ খাঁ মোগলদের কর দেওয়া বন্ধ করে নিজেকে স্বাধীন নবাব বলে ঘোষণা করেন। সেই সময় মোগলরা যুদ্ধ ঘোষণা করলে দাউদ খাঁ এই দুর্গে আশ্রয় নিয়েছিলেন। সেই সময় দাঁতনের মোগলমারির কাছে সেনা ছাউনি থেকে মোগল সৈন্যরা এই দুর্গ ঘিরে ফেলে। মৃত্যু হয় দাউদ খাঁর। ওই এলাকা থেকে ঔরঙ্গজেবের সময়কার মুদ্রারও সন্ধান মিলেছে। মোগল সেনাপতি মহম্মদ তাহির মন্দির প্রাঙ্গণের পশ্চিম দিকে তিন গম্বুজ যুক্ত মসজিদ নির্মাণ করেন, নাম দেন কুরুমবেড়া দুর্গ। একদা জেলা গেজেটিয়ারেও লেখা হয়েছিল, সম্রাট আওরঙ্গজেবের রাজত্বকালে ১৬৯১ খ্রিস্টাব্দে জনৈক মহম্মদ তাহির এই মসজিদটি নির্মাণ করেন। এর কিছুকাল পরে আসে মারাঠারা। ভাস্কর রাও হোলকার এবং রঘুজি ভোঁসলে আবার দখল নেন এই মন্দিরের।

‘মেদিনীপুরের ইতিহাস’ গ্রন্থের প্রণেতা যোগেশচন্দ্র বসুর লেখা থেকেই জানা যায়, “…মন্দির গাত্রে উড়িয়া ভাষায় লিখিত যে প্রস্তর ফলকখানি আছে, তাহার প্রায় সকল অক্ষরই ক্ষয় হইয়া গিয়াছে, কেবল দু’একটি স্থান অপেক্ষাকৃত স্পষ্ট আছে, উহা হইতে ‘বুধবার’ ও ‘মহাদেবঙ্কর মন্দির’ এই দুইটি কথা মাত্র পাওয়া যায়।” আবার নৃতত্ত্ববিদ প্রবোধচন্দ্র ভৌমিক তাঁর ‘মেদিনীপুর কাহিনী’তে জানিয়েছেন, ‘ওই দুর্গের কাছে গেলে কত কথাই না মনে পড়ে – হিন্দু, মোগল, পাঠান, মারাঠা কত সৈন্য এখানে দিন কাটিয়েছে তার আর হিসাব নেই।’ সুতরাং এই সাংস্কৃতিক তথা ঐতিহাসিক মিলন ক্ষেত্র না দেখলে বোধ হয় অনেক কিছুই মিস করে যেতাম।

এমন একটা পরিবেশে এমন অদ্ভুত স্থাপত্য দেখে ইতিহাসের আলো আঁধারিতে যেন বুঁদ হয়ে ছিলাম। কখন যে ঘন্টা তিনেক কেটে গেছে খেয়ালই করিনি। হুশ ফেরালেন পুরাতত্ব বিভাগের পক্ষ থেকে দায়িত্বে থাকা মানুষটি। স্কুল ড্রেস পরা কয়েকজন ছাত্র স্কুলের সময়ে এখানে বেড়াতে এসেছে বলে তিনি তাদের স্কুলে যাওয়ার জন্য বোঝাচ্ছিলেন। তাদের কথা বার্তার আওয়াজেই ফিরে এলাম এ জগতে। মন্দির বা দুর্গ বা মসজিদ দেখা শেষ, এবার পেটের মধ্যে তো হুল বিদ্রোহ শুরু হয়ে গিয়েছে। এ গ্রামে মিলবে না কিছুই, ফিরে এলাম কেশিয়াড়িতে। এখানে বেশ কয়েকটা ভাতের হোটেল মিলবে। খুব খারাপ খাবার নয়।

সুবর্ণরেখার এত কাছে এসেও তাকে না দেখে চলে যাব এমন নির্দয় নির্মম আমি কোনদিন হতে পারব না। বিশালকায় একটি চারাপোনা সহযোগে মধ্যাহ্নভোজন সেরে এবার সুবর্ণরেখার সঙ্গে দেখা করার পালা। কেশিয়াড়ি মোড় থেকে দক্ষিনে নয়াগ্রামের দিকে কয়েক কিলোমিটার গেলেই জঙ্গলকন্যা সেতু। সে ভারি অপূর্ব জায়গা। প্রশস্ত বালু চর, মাঝে একে বেঁকে বয়ে চলেছে জলধারা। শরত চলে গেলেও এখনও রয়ে গেছে কাশের দল। তাদের চেহারায় বয়সের ছাপ পড়লেও শীতের হাওয়ায় মাথা দোলানোতে এখনও যেন যৌবনের ছন্দ।

জঙ্গলকন্যা সেতুর বয়স বেশি নয়, ওপারে নদীর ধারে একটি পার্ক বানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। রয়েছে রাত্রিবাসের ব্যবস্থাও। নয়াগ্রাম পঞ্চায়েত সমিতির সঙ্গে যোগাযোগ করলে সেখানে থাকার ব্যবস্থা করা যায় বলে শুনলাম। নির্জন সবুজে ঘেরা চারপাশ, দুপুর শেষে নরম রোদে বালির উপর দিয়ে হাঁটতে কিন্তু মন্দ লাগছিল না। জনহীন নদীর বুকে জলের সঙ্গে গল্পে মগ্ন নৌকার দল। সঙ্গে আনা বাদাম চিবোতে চিবোতে তারই একটার পরে বেশ জাঁকিয়ে বসলাম জলে পা ডুবিয়ে। গলা ছেড়ে গান ধরলাম একটা, কারন এটাই সঠিক পরিবেশ যেখানে আমার গান শুনে কানে আঙুল দেওয়ার কেউ নেই। এই সব ছেলেমানুষির মাঝেই নদীর জলে লাল সূর্যের প্রতিবিম্ব জানাল এবার তোমার যাওয়ার সময় হল।

ফেরার রাস্তা ওই একই। ফের সেতুর কাছে গিয়ে ওদিক থেকে আসা একটা বাস থামিয়ে সোজা খড়গপুর। স্টেশনে পৌঁছে শুনলাম লালমাটি এক্সপ্রেস আসছে এখুনি। ব্যাস লালমাটির পথের পর এবার লালমাটির ট্রেনে। লোকাল ট্রেনও আছে বটে তবে তাতে ভাড়া কম হলেও সময় লাগে আরও ঘন্টাখানেক বেশি। যাদের সময় আছে তারা তো লোকালেই যাতায়াত করতে পারেন। আমাকে আবার হাওড়া নেমে সুদূর দমদমে যেতে হবে কিনা, তাই আমাকে একটু গুনাগার বেশিই দিতে হল। ট্রেনে উঠে মুখ চালাতে চালাতে এসে গেল টিকিয়াপাড়া। তারপরের অভিজ্ঞতা অবশ্য মারাত্মক। সেখান থেকে হাওড়া ঢুকতেই ট্রেনটি সময় নিল প্রায় ৫০ মিনিট।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *