প্রাপ্তি

অমিয় আদক 

আমার মন ভালো করার বারান্দা। আমাদের বাড়ির উপর তলার দক্ষিণের বারান্দা। একেবারে অল্প পরিসরের। নিতান্তই আটপৌরে বারান্দা। তবুও ওই বারান্দা আমাকে ভীষণ টানে। থাকে আমার মন জুড়ে। ওই বারান্দায় দাঁড়িয়ে পূর্ব-পশ্চিমে তাকালে আমাদের বাড়ির দক্ষিণে মাঝারি চওড়া পিচ রাস্তার দৌড় কতটা, তা সহজেই টের পাওয়া যায়। সেটা অনেকটা দূরে গিয়ে হঠাৎ বাঁক নিয়ে ওই দিগন্তের সঙ্গে কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। আমি বুঝতে পারিনা। আর বোঝার চেষ্টাও করিনা।
আমাদের বাড়ির দক্ষিণদিকে ওই রাস্তা ছুঁয়ে খেলার মাঠ। মাঠের উত্তর সীমা বরাবর বেশ কয়েকটা ঝাঁকড়া মাথার ঢাউস ছাতার মত ছাতিম, আম ইত্যাদির গাছ। গাছগুলো আমাদের বাড়ির দক্ষিণের রাস্তার ছাতা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সেই গাছগুলো তে নাম জানা, না জানা পাখিদের কিচির মিচির সহযোগে মিটিং সারাদিন। সকালেই কাক তার চাঁছা গলায় ‘কাকা’ রবে জানান দেয় ‘আমরা পাড়ায় আছি।’ কখনো পাতার আড়ালে থেকে কোকিলের স্লোগান ‘কুহু’। ছাতার দোয়েল শালিকরাও প্রয়োজন মত তাদের আওয়াজ দিয়ে উপস্থিতি জাহির করে। সকালে বুলবুলির ‘ট্যুইট্যুই’ রেওয়াজও শোনা যায়। এক ফাঁকে বৌ কথা কও কয়েকবার ডেকে চলে যায়।
আর বিকেলে এই মাঠটা কচি-কাঁচাদের খেলার ছুটোছুটি হুল্লোড়ে দারুণ প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। বিকেলে এই বারান্দায় একবার না এলে মনটা পারদ ঘনত্ব পেয়ে যায়। অথচ এখানে কয়েক মিনিট কাটালেই মনটা কেমন বোশেখি বাতাসে ওড়া শিমুল তুলো। আজ বড় জোর মিনিট দশেক দাঁড়ানোর সুযোগ পাবো, ওই মন ভালো করা বারান্দায়।
আমাদের পাড়ার পশ্চিমের আকাশকে আমাদের পাড়ারই দু-একটা ঢাউস বাড়ি শুকোতে দেওয়া শাড়ির মত খানিক আড়াল করে আছে। এখন বিকেল। আজকের বিকেলটা অবশ্যই কনে দেখা বিকেল। কারণ আজ কোন এক পাত্র-পক্ষ আমাকে কনে হিসাবে দেখতে আসছেন। যাঁরা শো-কেসে সাজানো শাড়ির মত মেয়েদের দেখতে আসেন, তাঁদের প্রতি আমার কেমন যেন ঘেন্না মেশানো মায়া হয়। বড়মামা খোঁজ খবর নিয়ে পাঠাচ্ছেন। আমার আপত্তি জানিয়ে ছিলাম ফোটা ফুলের মত পরিষ্কার করেই। তা সত্ত্বেও বাবার পক্ষে কোন ভাবেই না করা সম্ভব হয়নি। সে কথায় পরে আসছি।
এখন দেখছি কয়েকটা হালকা মেঘের ফালি দিগন্তের গা ছুঁয়ে রোদ পোয়াচ্ছে। তাদের ফাঁক দিয়ে কমলা কোয়া রঙের উদ্ভাস ঠিকরে বেরিয়ে আসছে। নীল আকাশকে চুমো দেওয়ার প্রতিযোগিতায় যেন তারা অংশ নিয়েছে। অজস্র পাখিদের ভিড় আম আর ছাতিমের গাছগুলোতে। তারা শেষবেলার বকেয়া কথাবার্তাগুলো সেরে নিচ্ছে। ছেলেগুলো ধুলো মাখামাখি হয়ে খেলছে। সবাই যেন আনন্দের রঙ-মশাল। খেলার ক্লান্তি মাখা শরীর থেকে হাসি উচ্ছ্বাসের রঙ ফুলঝুরির মত ঝরে পড়ছে। এইমাত্র দুধ সাদা দামি বিদেশি একটা গাড়ি আমাদের বাড়ির সামনে মিষ্টি আওয়াজ করে থামে। মিষ্টি আওয়াজটা অবশ্যই উপস্থিতি জানান দেওয়ার। বুঝতেই পারছেন আমার এখানে দাঁড়ানোর সময় শেষ। আমি নিচে চলি।
আমার একুশ বসন্ত ছোঁয়া জীবন। আমি প্রথম পাত্রপক্ষের সামনা সামনি হব। বড় মামার বড় মেয়ে টুলুদিকে ভিজে চোখে পাত্রপক্ষের সামনে বসতে দেখেছিলাম। তখন তো আমি সবে কিশোরী। সে ঘটনার আবছা স্মৃতি খানিক মনের মধ্যে লুকিয়ে আছে। সাবেকি সাদা-কালো টিভির ম্যাড়ম্যাড়ে ছবির মত। নিজের অভিজ্ঞতা নেই। ধার করা অভিজ্ঞতা আছে। এক সহপাঠির কাছ থেকে শুনেছি তার অভিজ্ঞতার কথা। দেখি আমার ওই ধারকরা অভিজ্ঞতা কতটা কাজে লাগে।
একবার তো বসতেই হবে ওদের সামনে। আমার চাঁদ বদনটা দেখনোর জন্যে। জানি আমাকে পছন্দ হবেই। তাই ওদেরকে নিরাশ করার একটা কৌশল আমাকে বের করতেই হবে। সাপুড়ের ঝাঁপি খুলে দুব্‌লা সাপ বের করার মত। তবুও মামার সম্মান রক্ষা করতে আমাকে সেজেগুজে অধোবদনে বসতেই হবে। সুশীলা বালিকার মত। এমন ভাব মুখে ছড়িয়ে রাখতে হবে, যেন ভাজা মাছ উল্টে না খেতে পারা মার্জারী আমি। তাই নিচের বসার ঘরে একটিবার মাথা গলাতেই হবে। এছাড়া বিকল্প কোন উপায় নেই।
আমার সাজা না সাজা নিয়ে মায়ের সঙ্গে আগেই হয় বিস্তর বিতর্ক। মা শাড়ি বেছে দেন। আমি সেই শাড়িগুলো ইচ্ছা করেই আমার পছন্দের তালিকা থেকে ছাঁটি। মা যে গয়না পরতে বলেন, আমি তেমন পরতে রাজি নই। আগেই ঘটে মা মেয়ের পছন্দ অপছন্দের মুরগী লড়াই। শেষে মা বিরক্ত হয়ে বলেন, যা ভাল বুঝিস কর। আমি তোকে বুঝিয়ে পারব না। আমিও এই সুযোগের অপেক্ষায় থাকি। মা আমার ঘর থেকে অল্প রাগ দেখিয়ে বেরিয়ে যান। আর আমিও সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করি। একটা সাধারণ শাড়ি পরি। অল্পকিছু গয়না পরি। চটপট রেডি হয়ে উপরের বারান্দায় দাঁড়াই। আর হিসেব করি আমার উত্তরগুলো কেমন ভাবে পাত্রপক্ষের কান গরম করতে পারবে।
এবার ডাক পড়ে। মা বলেন, চল্‌, ওদের চা-জলখাবার খাওয়া হয়েছে। আমি মায়ের পিছু নিই অনুগত পোষ্যের মত। যথা নিয়মে নমস্কার পর্ব সমাধা হয়। তার সঙ্গে পারস্পরিক পরিচয় পর্ব। আমি বসার অনুমতি পাই। আমাকে প্রথাগত ভাবে পাত্রের মা নাম জিজ্ঞাসা করেন। উত্তর না দিয়ে আমি গোখরো সাপের মত ফোঁস করে উঠি। ‘আমাকে দেখতে এলেন আমার নাম, পরিচয়, শিক্ষাগত যোগ্যতা কিছু না জেনেই? এটা কিন্তু আপনারা ঠিক করেননি।’ আমার কথা ওনাদের খানিক অস্বস্তিতে ফেলেছে বুঝতে পারি। তাই প্রসঙ্গ পরিবর্তনের জন্য বলি, ‘এক কাজ করুন আমায় প্রশ্ন না হয় নাই করলেন। আসুন আমরা পারস্পরিক কথাবার্তার মধ্যে দিয়ে নিজেদের সুবিধে অসুবিধেগুলো জেনে নিই। আশা করি আপনারা না করবেন না। সেই বয়স্কা মহিলাই আবার আমার কথায় প্রথম সায় দেন। খানিকটা অপ্রস্তুত ভাবেই। এবার সুযোগ বুঝে কথাগুলো আমিই ছুঁড়ে দিই।
-আমার নাম পরিচয় এখানে আসার আগেই পেয়েছেন। আমার শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পর্কে আপনাদের জানাটা হয়ত অসম্পূর্ণ থাকতে পারে। আমি নিজেই জানিয়ে দিচ্ছি। মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক দুটোতেই হাই ফার্স্ট ডিভিশন। অনার্সে ফার্স্ট ক্লাস, পোস্ট গ্র্যাজুয়েশনে জাস্ট ভর্তি হয়েছি। তবে ডিগ্রিতে ওই ফার্স্ট ক্লাস। ওর বেশি কিছু নয়। র্যা ঙ্ক ট্যাঙ্ক আমার ছিল না। আমার শিক্ষাগত যোগ্যতা আপনাদের পছন্দ কিনা একটু দয়া করে বলবেন। সম্ভবত পাত্রই হবেন। জানতে চাইলেন, শেষ পরীক্ষাটার রেজাল্ট কতদিন আগে হাতে পেয়েছি।
আমি জানাই,মাস খানেক আগে।
-তাহলে এস এসসি বসার অভিজ্ঞতা নেই?
-না, তাছাড়া হাই বা হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলের শিক্ষিকা হওয়ার ইচ্ছাও আমার নেই।
-ডিগ্রিতে ফার্স্ট ক্লাস রেজাল্ট নিয়ে ওই অ্যাটেমপ্টা করবেন না কেন?
-সব মানুষের চিন্তা-ভাবনা, টার্গেট এক রকম হয় কি? আমারও সে রকম ইচ্ছা নেই।
-তাহলে ভবিষ্যত ভাবনা হিসাবে কি করবেন ভাবছেন?
-এম এস সি করে রিসার্চের সুযোগ পেলে করবো।
-কলেজে পড়ানোর ইচ্ছা প্রবল?
-ঠিক তাও নয়। আগে আরও পড়াশোনা। তারপর অন্যকিছু।
-তাহলে দেখাশোনায় বসলেন কেন?
-এই অবান্তর প্রশ্নটার উত্তরে বলবো, শুধুমাত্র মামার সম্মান রক্ষা করতে। আপনাদের সামনে আমি বসেছি। বিয়ে ব্যাপারটায় আমি আদৌ আগ্রহী নই।
-আমরা সম্মতি দিলে যদি আপনাদের পরিবার চায় বিয়েটা হোক। তাহলে কি করবেন?
-আপনারা সম্মতি দিলেই আমাদের পরিবার সম্মতি দেবেই, এমন ধারণা আপনারা পেলেন কিভাবে? উল্টোটাও তো হতে পারে?
-ধরুন আমরা আপনাকে পছন্দ করলাম।
-আপনাদের অপছন্দ না হওয়াই স্বাভাবিক। তবুও বলছি আপনারা আমাকে পছন্দ না করলেই বেশি খুশি হব।
-কেন?
-এই ‘কেন’র উত্তরটা খুবই সোজা। আগেই বলেছি এই বিয়ে নামের সামাজিক ঘটনায় আপাতত আমার আদৌ আগ্রহ নেই। আমি আরোও পড়াশোনা করতে চাই।
-বিয়ের পরেও যদি আপনাকে পড়াশোনার সুযোগ দেওয়া হয়। তাহলে কি বলবেন?
-দেখুন, আমি যখন যে কাজটা করতে চাই। সেই কাজটা মনপ্রাণ ঢেলেই করতে চাই। বিয়ে করে ঘর সংসার করবো আবার পড়াশোনাও তার সাথে চালিয়ে যাব। সেটা কি করে সম্ভব?
-অনেকেই তো করছেন। আপনি করলে দোষ কোথায়?
-দোষ অপরাধ ইত্যাদি কথার মধ্যে না গিয়ে আমার সাফ কথা, আমি দু’নৌকায় পা দিয়ে চলার পক্ষপাতী নই। আমাকে ক্ষমা করবেন। আমি বিয়ে এখন করব না, এটাই শেষ কথা।
পাত্রের মা তো রাগে গালের রঙ সিঁদুর করে ফেলেন। এবার তিনি একটু ফোঁস দেখিয়ে বলেন, সত্যি যদি মা বিয়ের পিঁড়িতে বসবেনা, তাহলে দেখাশোনায় বসলে কেন? আগেই জানিয়ে দিতে পারতে। আমরা আসতাম না। আমাদেরও সময়ের দাম আছে।
-আপনার কথাকে সম্মান জানিয়েই বলি। আমি আমার কথা স্পষ্ট করেই আমার বাবাকে বলেছি। বাবাও স্পষ্ট করেই বড়মামাকে বলেছেন। কিন্তু তিনি সাবেকি মানসিকতার ব্যক্তি। কোন কথা শুনতে নারাজ। বাবার পক্ষে বড়মামাকে এড়িয়ে কিছু করাও অসম্ভব। তাই এই পরিস্থিতি। আপনারা এবং আমি, আমার বাড়ির পরিজনেরা সকলেই এই একটা বাজে পরিস্থিতির শিকার। তাই আপনাদের কাছে আমার একান্ত অনুরোধ, আপনারা দয়া করে যাই হোক একটা কারণ দেখিয়ে আমাকে অপছন্দ করুন। না হলে আমার বিয়ে আটকানো যাবেনা। আপনারা হ্যাঁ বললেই বড়মামা আমাকে বিয়ের পিঁড়িতে অবশ্যই বসিয়ে ছাড়বেন।
একটা ভারি মাপের দীর্ঘশ্বাস ফেলে পাত্রের মা বলেন, ঠিক আছে। আমাদের পছন্দ নেই, সেটাই তোমার মামাকে জানাব। পড়াশোনায় তোমার ভীষণ আগ্রহ। সেটাকে সম্মান জানাতেই তোমাকে আমাদের পছন্দ থেকেও ইচ্ছাকৃত ভাবেই অপছন্দের কথা আমি অন্তত জানাব। কেন জানো? আমিও পড়াশোনা করতে চেয়েও পাইনি। তাই তোমার সুযোগটা নষ্ট হবে এটা ভেবেই আমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। আমার ছেলের জন্যে মেয়ে কি আর ভূ-ভারতে পাওয়া যাবেনা? পেয়ে নিশ্চয় যাবো। আসি মা। আশীর্বাদ করি বড় হও। এতো বড় প্রাপ্তি আমি আশা করিনি।
তাই কোন ভাবেই আমি আর একটুও দেরি করিনি। ওই ভদ্রমহিলার পা ছুঁয়ে আমার আন্তরিক শ্রদ্ধা জড়ানো প্রণাম করি। তাঁরা সবাই খানিক ভারাক্রান্ত মনে বেরিয়ে যান। গাড়িটা মুরুব্বিয়ানার আওয়াজ শুনিয়ে বেরিয়ে যায়। আমি আবার আমার মন ভালোর বারান্দায় আসি। দেখি পশ্চিম আকাশের কাস্তে চাঁদটা সামান্য উজ্জ্বল। দু-একটা তারা সেই চোখে আসে। দখিণা বাতাসের মন ভালো করা মৃদু বেগটা আমার শাড়ির আঁচলটা নিয়ে খেলা করে। সেও যেন আমার বড় প্রাপ্তিটাকে সেলিব্রেট করে। আর আমার মনের ভিতর কাস্তে চাঁদটা পূর্ণিমার দিকে হাঁটতে থাকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *