নিখুঁত সফর নিখুঁতির শহরে

পলাশ মুখোপাধ্যায়

##

শারদীয়ার আবহে উচাটন মন। না, পুজো ঘিরে আমার কোনও উন্মাদনা না থাকলেও এই সময়ে বাড়িতে টেকে না মন। কেমন যেন পালাই পালাই সুর গুনগুনিয়ে ওঠে ভিতরে ভিতরে। সেই তাগিদেই সেদিন সকাল সকাল চড়ে বসলাম শান্তিপুর লোকালে। কলকাতা থেকে ৯৩ কিলোমিটার, ঘন্টা আড়াইয়ের পথ শান্তিপুর। শুধুমাত্র স্থাপত্য বা ঐতিহাসিক কারণেই নয়, ভৌগলিক অবস্থান ও যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণেও পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে গড়ে ওঠার সব সুবিধাই রয়েছে শান্তিপুরের। শহরের পাশ দিয়ে বয়ে গিয়েছে ভাগীরথী। শহরের গা ঘেঁসে চলে গিয়েছে ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়ক। শান্তিপুর-শিয়ালদহ শাখার রেল চলাচল এই শহরকে কলকাতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করেছে।

এবারে আমার সফরসঙ্গী মহাদেব কুণ্ডু। সাংবাদিক মহাদেবের বাড়ি শান্তিপুরে। আমি আসব শুনে স্টেশনেই হাজির মহাদেব। এই লেখার বেশ কিছু ছবি মহাদেবের, যদিও স্থানাভাবে অনেক ছবিই দেওয়া গেল না। মহাদেব থাকাতে বেশ সুবিধাই হয়েছে আমার, কারন শান্তিপুরে এত কিছু দেখার আছে তা সত্যিই আমার জানা ছিল না। একদিনে এত কিছু ভালভাবে দেখে ওঠা সম্ভব নয়। প্রাচীন কাল থেকে শান্তিপুর শহরে নানা সময়ে নানা ধর্মের মানুষ বসবাস করছেন। রেখে গিয়েছেন তাঁদের ধর্মচর্চার নিদর্শন। মন্দির, মসজিদ কিংবা ব্রাহ্মসমাজের এই মেলবন্ধন শান্তিপুর শহরকে অন্যদের তুলনায় আলাদা করেছে। সন্ন্যাস গ্রহণের পরে গঙ্গা পেরিয়ে প্রথম শান্তিপুরেই এসেছিলেন চৈতন্য। এই শহরেই বাস করতেন চৈতন্যের শিক্ষক অদ্বৈতাচার্য। মুণ্ডিতমস্তক উর্ধ্ববাহু নৃত্যরত চৈতন্যের যে বিগ্রহ পরের পাঁচশো বছরে বাংলায় প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছে, তার প্রথম দর্শন মিলেছিল এই শহরেই অদ্বৈতাচার্যের বাড়িতে। অদ্বৈতাচার্যের বংশের ৯টি শাখার যে বিগ্রহবাড়ি আছে সেগুলি শুধু বৈষ্ণব ভক্তদের কাছেই নয়, সমস্ত বাঙালির কাছে আকর্ষণীয় বিষয়। এই শহর বৈষ্ণবদের তীর্থক্ষেত্র।

শান্তিপুরের রাস বিখ্যাত। শোনা যায় অদ্বৈতাচার্য প্রায় সাড়ে পাঁচশো বছর আগে বাবা মা মারা যাওয়ার পর ভারতভ্রমণে গিয়ে নেপালের গণ্ডকী নদী থেকে একটি শিলা নিয়ে এসে নিত্যসেবা শুরু করেন। সেই থেকে সেই শিলা পূজিত হয় বড় গোঁসাই বাড়ির মন্দিরে। এছাড়া এখানে আছে হাজার বছরের পুরনো রাধারমণ বিগ্রহ। অদ্বৈতাচার্যের পৌত্র মথুরেশ গোস্বামী সেই বিগ্রহ এনে এখানে স্থাপন করেন। আনুমানিক তিনশো বছর আগে এই কৃষ্ণ বিগ্রহের সঙ্গে শ্রীমতী বিগ্রহের প্রতিষ্ঠা অনুষ্ঠানের শোভাযাত্রাই শান্তিপুরের বিখ্যাত ভাঙ্গা রাসের শোভাযাত্রা নামে খ্যাতি লাভ করে। রাসযাত্রার পাশাপাশি এখানে আচার্যদেবের আবিরভাব তিথি মাকড়ি সপ্তমী উপলক্ষে হয় অদ্বৈত উৎসব। এ ছাড়াও রয়েছে শান্তিপুরের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে আরও প্রায় ২৩টি বিগ্রহবাড়ি। তার মধ্যে ৯টি গোস্বামীবাড়ি বলেই পরিচিত।

মতিগঞ্জ-বেজপাড়ায় অষ্টাদশ শতকের গোড়ার দিকে প্রতিষ্ঠিত নিপুণ হাতের পোড়ামাটির কারুকাজযুক্ত জল্পেশ্বর শিবমন্দির রয়েছে। বউবাজার পাড়ায় আছে দক্ষিণাকালীর পঞ্চরত্ন মন্দির। শ্যামচাঁদ পাড়ায় ১৭২৬ খ্রিস্টাব্দে তন্তুবায় সম্প্রদায়ের রামগোপাল খাঁ চৌধুরী প্রতিষ্ঠিত কোষ্ঠীপাথরের কৃষ্ণমূর্তি শ্যামচাঁদের আটচালা মন্দির আছে। শোনা যায় মন্দিরটি তৈরী করতে সেই সময় ২ লক্ষ টাকা খরচ হয়েছিল।

সেই সঙ্গে আছে একাধিক শিব ও কালী মন্দির। যেমন আগমেশ্বরী মন্দির, সিদ্ধেশ্বরী কালীবাড়ি, গোকুলচাঁদ মন্দির, বংশীধারী শিবমন্দির, সূত্রাগড়ে গণেশ। এই সব মন্দির ও বিগ্রহবাড়ির সঙ্গে শুধু যে ইতিহাস জড়িয়ে আছে তাই নয়, এই সব মন্দিরের গায়ে পোড়ামাটির কাজ বাংলার অন্যতম দর্শনীয় বিষয়। আবার কারও কারও দাবি, এই শহরে ছিল বৌদ্ধস্তূপও। কিন্তু কালের নিয়মে তাও নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে। শান্তিপুরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অজস্র স্থাপত্য আর ইতিহাসের নানা উপকরণের তালিকায় রয়েছে মোগল সম্রাট ঔরঙ্গজেবের নামের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে থাকা তোপখানার মসজিদ। শান্তিপুরে ১৭০৩-০৪ খ্রিস্টাব্দে (১১১৫ হিজরী) তখনকার স্থানীয় ফৌজদার গাজী মহম্মদ ইয়ার খাঁ নির্মিত ‘তোপখানা মসজিদ’ বিখ্যাত।এখনো অক্ষত এর গম্বুজ ও মিনার।এছাড়াও ১৭৯৬ সালে তৈরি দানবীর মরহুম শরিবত সাহেবের তৈরি সুদৃশ্য মসজিদ, ওস্তাগর পাড়ার মসজিদ-সহ প্রায় ২৬টি মসজিদ রয়েছে এখানে। শৈশব তলা, সৈয়দ সাহেবের মাজারের পাশাপাশি ব্রাহ্মসমাজের বাড়িটিও সম্প্রীতির মেলবন্ধনের কথাই বলে।

বৈষ্ণবতীর্থ শান্তিপুরের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ বাবলা। শান্তিপুর বাইপাসের ধারে বাবলা, যা অদ্বৈতপাট নামেও পরিচিত। ছায়া ঘেরা আমবাগানের মধ্যে দিয়ে পথ। বড় মনোরম সে পথ ধরেই যেতে হয় নিমাইয়ের শিক্ষাগুরু অদ্বৈতাচার্যের সাধনপীঠে। অদ্বৈতাচার্যকে নিমাইয়ের শিক্ষাগুরু বললে অবশ্য কম বলা হয়। কঠোর সাধনায় নিমাইকে মর্ত্যে এনেছিলেন অদ্বৈতাচার্য, এই কাহিনি শান্তিপুরের লোকের মুখে মুখে ফেরে। এ কারণেই অদ্বৈতাচার্যকে বলা হয় গৌর-আনা ঠাকুর। গৌরাঙ্গ, নিত্যানন্দ ও অদ্বৈতাচার্যের মিলন ঘটেছিল এই বাবলায়। সন্ন্যাস গ্রহণের পর এখানেই নিমাইয়ের সঙ্গে দেখা হয়েছিল শচীমায়ের। এই সাধনপীঠে দশ দিন থেকে সন্ন্যাসীপুত্রের সেবা করেছিলেন শচী মাতা। অদ্বৈতাচার্যের বংশেই জন্ম আরেক বৈষ্ণবসাধক বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীর তথা জটিয়াবাবার। তাঁরও স্মৃতিমন্দির রয়েছে এখানে।

শান্তিপুরের গঙ্গার ধারটিও মনোরম। এখানে অবশ্য গঙ্গাকে ভাগিরথী বলা হয়। বেলা পড়তে এক ফাঁকে চলে যাওয়া যায় সেই গঙ্গার পাড়ে। মেঘের আড়াল থেকে আসা সূর্যের আলোছায়ার খেলা, দূরে মাঝিদের নৌকা। গঙ্গার জলে তার অপূর্ব প্রতিবিম্ব, যেন এক মায়ার খেলা। মহাদেবের ক্যামেরায় চটপট বন্দি হল সেই অসাধারণ মুহূর্ত। সন্ধে হয়ে আসছে এবার ফেরার পালা। গঙ্গার ধার থেকে বেরিয়ে এবার বড় বাজারের দিকে রওনা দিলাম আমরা।


বাজার কেন? শান্তিপুরে আসার অন্যতম প্রধান কারণ তো বাজারেই। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের যে সমস্ত লোভনীয় খাবার ভোজনরসিকদের আকর্ষণ করে আসছে তার মধ্যে অন্যতম শান্তিপুরের নিখুঁতি। কয়েক শতাব্দী প্রাচীন শান্তিপুরের এই মিষ্টি তার স্বাদের কারনে আজও মানুষের প্রিয়। শান্তিপুর তো বটেই আশপাশের বহু এলাকার মানুষ প্রিয়জনদের মিষ্টিমুখ করাতে এই নিখুঁতির উপরে ভরসা করেন। দূরদূরান্ত থেকে আসা মানুষজনও এখান থেকে নিখুঁতি কিনে নিয়ে যান। আমিও বাদ যাই কেন, নিয়ে নিলাম বাড়ির জন্য বেশ খানিকটা।

নিখুঁতি তৈরি হয় মূলত রাতের দিকে। ৫০০ গ্রাম ছানার সঙ্গে ১০০-১৫০ গ্রামের মত চিনি চটকে মিশ্রণ বানানো হয়। নিখুঁতি তৈরির জন্য আলাদা ডাইস রয়েছে। সেই মিশ্রণ ডাইসে ফেলে প্রয়োজন মত আকারে কেটে নেওয়া হয়। এরপর তা হাল্কা গরম বনস্পতি তেল দিয়ে ভাজা হয়। অল্প লালচে রং হলে সেটি তুলে নেওয়া হয়। এরপর তা রসে ডুবিয়ে রাখা হয় কিছুক্ষন। একসময় এই নিখুঁতি ভাজা হত গাওয়া ঘি দিয়ে। তার দামও ছিলো যথেষ্ট। কিন্তু বর্তমান বাজারদরের সঙ্গে তাল রাখতে গিয়ে ঘিয়ে ভাজা নিখুঁতি এখন প্রায় অবসরের পথে।

মোটামুটি নিখুঁতির আকার হয় দুই থেকে আড়াই ইঞ্চির মত। সাধারণ নিখুঁতির পাশাপাশি শান্তিপুরে এখন তৈরী হয় ড্রাই নিখুঁতিও। সেক্ষেত্রে রস থেকে তুলে আনার পরে সেটির থেকে রস ঝরিয়ে ফেলা হয়। গজা তৈরির মত হাল্কা রস তার ওপরে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। শান্তিপুরের নিখুঁতি দুরদুরান্তের মানুষ কিনে নিয়ে যান। দুরের পথে গেলে সেই নিখুঁতি যাতে নষ্ট না হয় সেজন্য ড্রাই নিখুঁতি দেওয়া হয়। পরিবেশনের আগে তাতে ছড়িয়ে দেওয়া হয় গোলমরিচের গুড়ো। যা বাড়তি স্বাদ এনে দেয়। সাধারণ মানুষের অন্যতম প্রিয় এই মিষ্টির দামও বেশী নয়। সাধারণ নিখুঁতির ক্ষেত্রে ১৮০ টাকা কেজি। ড্রাই নিখুঁতির ক্ষেত্রে তার সাথে যোগ হয় আরো ৫০ টাকা।

শুধু যে স্থাপত্য বা ইতিহাসের সাক্ষী হতেই এই শহরে মানুষ আসবেন তাই নয়। এই শহর তাঁতের কাপড়ের জন্য বিখ্যাত। সংরক্ষণের অভাবে ভগ্নপ্রায় সাহিত্য পরিষদ ও পুরাণ পরিষদে নষ্ট হতে বসেছে বহু মূল্যবান পুঁথি। একই ভাবে এই শহরের অন্যতম কৃতী সন্তান, সাহিত্যিক দামোদর মুখোপাধ্যায়, কবি করুণানিধান বন্দ্যোপাধ্যায়, বীর আশানন্দ, নাট্যকার অহীন্দ্র চৌধুরী, যোগাচার্য শ্যামসুন্দর গোস্বামী আর কাছেই হরিপুরে যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের বাড়ি সংস্কারের অভাবে আজ জীর্ণ।

কিন্তু এত কিছু উপকরণ থাকা সত্ত্বেও শান্তিপুর যেন থেকে গিয়েছে দুয়োরানি হয়েই। আর সেই কারণেই শহরে থাকার মতো ভাল হোটেল আজও গড়ে ওঠেনি। পুরসভার নিজস্ব দুটি লজ আছে। সবেধন নীলমণি বলতে ওইটুকুই। দিনভর ঘোরাঘুরি শেষ, আমার খাওয়া দাওয়ার অবশ্য কোন অসুবিধা হয়নি, মহাদেবের বাড়িতেই কবজি ডুবিয়ে খেয়েছি। আপনাদেরও অসুবিধা হবে না, কারন শান্তিপুরে খাওয়ার মোটামুটি মানের হোটেল পেয়ে যাবেন। শান্তিপুর স্টেশনে যখন এলাম তখন সন্ধে পেরিয়ে রাত নেমেছে, প্রায় সাতটা বাজে। দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেনে উঠে বসলাম বেশ গুছিয়ে। ছুটছে ট্রেন, পিছনে পড়ে রইল অনাদর এবং অবহেলায় পড়ে থাকা ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *